পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সেনাবাহিনীর রুমা জোনের অনন্য দৃষ্টান্ত

পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সেনাবাহিনীর রুমা জোনের অনন্য দৃষ্টান্ত

পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সেনাবাহিনীর রুমা জোনের অনন্য দৃষ্টান্ত
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে বসবাসরত মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, মৌলিক প্রয়োজন পূরণ এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা আরও সুদৃঢ় করতে ধারাবাহিকভাবে মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রুমা জোন। এরই ধারাবাহিকতায় রুমা উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম পাড়ায় বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, সামাজিক কার্যক্রম ও খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও উপকরণ বিতরণ করেছে রুমা জোন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব প্রয়োজনকে সামনে রেখে নেওয়া এসব উদ্যোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা, সহযোগিতা ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করছে।

রুমা উপজেলার আরথাহ পাড়ায় বিদ্যুৎ ও পানির সমস্যা মোকাবিলায় একটি ২০ কেভিএ জেনারেটর, একটি ১০ কেভিএ ডায়নামো এবং ৩ হর্সপাওয়ারের একটি সাবমার্সিবল পাম্প দেওয়া হয়েছে। একই পাড়ার কমিউনিটি সেন্টারের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে একটি সৌরবিদ্যুৎ প্যানেলও প্রদান করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেখানে জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিরাপদ পানির সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত, সেখানে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পানি সরবরাহের এই সরঞ্জামগুলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং সামাজিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সালেম পাড়ায় সুপেয় পানি সংরক্ষণের জন্য ১ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি পানির ট্যাংক প্রদান করা হয়েছে। চায়রাগ্রা পাড়ায় দেওয়া হয়েছে ৩ হর্সপাওয়ারের একটি সাবমার্সিবল পাম্প এবং ৫ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার পানির ট্যাংক। হ্যাপীলহিল পাড়ায় ২ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি পানির ট্যাংকের পাশাপাশি একটি সাউন্ড সিস্টেম দেওয়া হয়েছে। শুক্রমনি পাড়ায়ও ২ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার পানির ট্যাংক, ৭০০ ফুট পানির পাইপ, একটি সাউন্ড সিস্টেম এবং একটি সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল প্রদান করা হয়েছে।

পাহাড়ের প্রত্যন্ত পাড়াগুলোতে নিরাপদ পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক এলাকায় দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পানি সরবরাহের অবকাঠামো গড়ে তোলা কঠিন। এমন বাস্তবতায় সাবমার্সিবল পাম্প, পানির ট্যাংক ও পাইপ সরবরাহের মাধ্যমে রুমা জোনের নেওয়া উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা লাঘবে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল ও অন্যান্য সরঞ্জাম দুর্গম এলাকাগুলোর সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করার সুযোগ সৃষ্টি করবে।

শুধু মৌলিক প্রয়োজন পূরণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি রুমা জোনের এই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ। স্থানীয় তরুণ সমাজকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করা এবং তাদের সুস্থ, স্বাভাবিক ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যেও বিভিন্ন পাড়ায় ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। বাসাত্লং পাড়ায় একটি ভলিবল ও একটি ভলিবল নেট, পার্বা পাড়ায় একটি ভলিবল ও দুটি ফুটবল এবং নিয়াংখিয়াং পাড়ায় একটি ফুটবল প্রদান করা হয়েছে। পাহাড়ি জনপদের তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি এবং ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রও তৈরি হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এসব সামগ্রী বিতরণ শেষে রুমা জোন অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী হাসান সরকার বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের পাশে রয়েছে এবং তাদের প্রয়োজন ও সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানির সংকট নিরসন, ক্রীড়া এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে মানবিক সহায়তা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, যা এ এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

এ সময় জোন অধিনায়ক বিভিন্ন পাড়ার কারবারি, সাধারণ জনগণ ও স্থানীয় যুবসমাজের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সরাসরি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের প্রয়োজন, সমস্যা ও প্রত্যাশা সম্পর্কে জানার এই উদ্যোগ সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের বাস্তব চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করায় এসব উদ্যোগকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করে তুলছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

রুমা জোনের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মিজোরামে অবস্থানরত বম জনগোষ্ঠীর সদস্যদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন এবং নিজ নিজ পাড়ায় নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করার উদ্যোগ। এ ক্ষেত্রে রুমা জোন ইতোমধ্যে দেশে ফিরে আসা পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফেরার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়ে আসছে।

দেশে ফিরে আসা পরিবারগুলোর জন্য নগদ অর্থ ও খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার পাশাপাশি ঘর নির্মাণের জন্য ঢেউটিন, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল ও সেলাই মেশিন প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে যৌথ খামার নির্মাণের মাধ্যমে তাদের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর ফলে শুধু তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা নয়, বরং প্রত্যাবর্তনকারী পরিবারগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করে তোলার পথও তৈরি হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাহাড়ের মানুষের উন্নয়নে টেকসই পরিবর্তন আনতে শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ বা সহায়তা যথেষ্ট নয়; পানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া এবং কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দিতে হয়। রুমা জোনের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে এসব বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিশেষ করে দুর্গম পাড়াগুলোতে স্থানীয় জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী সরঞ্জাম সরবরাহ, তরুণদের ক্রীড়ামুখী করা এবং প্রত্যাবর্তনকারী পরিবারগুলোর জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করার উদ্যোগকে জনকল্যাণের একটি সমন্বিত মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রুমা জোনের এ ধরনের উদ্যোগ কেবল মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন পূরণ করছে না, বরং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সেনাবাহিনীর পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সম্পর্ককে আরও গভীর করছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সাধারণ মানুষের পাশে থেকে তাদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে ধারাবাহিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ফলে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে এসব মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক আস্থা এবং সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে রুমা জোনের একটি প্রশংসনীয় ও অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *