ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে, খাগড়াছড়ির অজপাড়াগাঁয়ে গোপন সার্ভার বসাচ্ছিল চীনা নাগরিকরা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে হঠাৎই পাহাড়ের প্রত্যন্ত এক গ্রামে ভাড়া বাসা নিলেন দুই বিদেশি। প্রশ্ন উঠতে দেরি হয়নি—শহর ছেড়ে অজপাড়াগাঁয়ে কেন এই আয়োজন? পরে জানা গেল, সীমান্ত থেকে মাত্র একশ গজ দূরত্বে বসানো হচ্ছিল আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের গোপন সরঞ্জাম, যার সূত্র ধরে বেরিয়ে এল চট্টগ্রাম অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত এক সাইবার অপরাধী চক্রের জাল।
গত প্রায় দুই বছর ধরে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন প্রান্তে থাবা বিস্তারের চেষ্টা করে চলেছে একটি আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্র। পাহাড় থেকে শুরু করে সমতল—খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম শহরে পৃথক তিনটি অভিযানে এই চক্রের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে পুলিশের জালে। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন ৭১ জন বিদেশি নাগরিক, যাদের মধ্যে ১৩ জনই চীনের। তিনটি ঘটনার প্রতিটিতেই চীনা নাগরিকদের উপস্থিতি মিলেছে, যা থেকে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে—এই নেটওয়ার্ক পরিচালনায় মূল ভূমিকায় রয়েছে চীনারাই।
পুলিশের ধারণা, দেশজুড়ে এমন আরও নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে। অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা বা জাল ই-কমার্সের ছদ্মবেশে এই চক্র কেবল আর্থিক প্রতারণায় ব্যস্ত, নাকি এর পেছনে বড় কোনো উদ্দেশ্য কাজ করছে—সে প্রশ্নের জবাব খুঁজছে তদন্তকারীরা। তিনটি ঘটনার মধ্যে সংযোগ কতটা গভীর, চক্রের আরও কোনো গোপন আস্তানা আছে কি না এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি চক্রের সঙ্গে এর যোগসূত্র কতদূর বিস্তৃত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কাজ করছে পুলিশের একাধিক বিশেষায়িত ইউনিট।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনার মোহাম্মদ শামীম হোসেন আগামীর সময়কে বলেন, বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে উদ্ধার করা মোবাইল-ল্যাপটপ ও উচ্চক্ষমতার ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক রিপোর্ট খুব গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার বিদেশিদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, যাতে তাদের গোপন পরিকল্পনার বিষয়টি উদঘাটন করা যায় বলে জানান তিনি।
খাগড়াছড়ির রামগড়েই প্রথম ঘাঁটি
তদন্তকারীদের ভাষ্যে, এই আন্তর্জাতিক চক্রের প্রথম গোপন আস্তানা গড়ে ওঠে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে। গত বছরের ১৪ নভেম্বর পুলিশ ও বিটিআরসির যৌথ অভিযানে খাগড়াছড়ির রামগড় পৌরসভার একটি বাসা থেকে ধরা পড়েন দুই চীনা নাগরিক। সেখান থেকে জব্দ করা হয় অত্যাধুনিক ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম।
খাগড়াছড়ির রামগড় সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওবাইন জানান, ধৃত দুই চীনা নাগরিক এর আগে প্রায় এক বছর চট্টগ্রাম শহরের উত্তর খুলশী এলাকায় একটি ফ্ল্যাটে অবস্থান করেছিলেন। সেখান থেকে আসিফ নামের এক বাংলাদেশির সহায়তায় তাঁরা রামগড়ে বাসা ভাড়া নেন এবং সেখানেই বসানো হচ্ছিল সার্ভার স্টেশন, যেখানে ভারতীয় মোবাইল নেটওয়ার্কও পুরোদমে কাজ করত। তাঁর বিশ্লেষণ, বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশের নেটওয়ার্ককেই লক্ষ্য করে কাজ শুরুর পরিকল্পনা ছিল চক্রটির, নয়তো শহুরে সুবিধা ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে এমন সরঞ্জাম বসানোর যুক্তি নেই। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন জালিয়াতিতেও জড়ানো সম্ভব ছিল বলে মত তাঁর।
সীমান্ত থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরত্ব
সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় এমন নেটওয়ার্ক বসানোর চেষ্টা টের পেয়েই তৎপর হয় পুলিশ। রামগড় থানার তৎকালীন ওসি ও বর্তমানে রাঙামাটির জুরাইছড়ি থানায় কর্মরত মুহাম্মদ মঈন উদ্দীন জানান, যে বাসায় ভিওআইপি সার্ভার বসানো হচ্ছিল, সেখান থেকে ভারত সীমান্তের দূরত্ব ছিল মাত্র ১০০ গজ। বিষয়টি স্পর্শকাতর মনে হওয়ায় ঢাকা থেকে বিশেষ শাখার (এসবি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসে থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করেন চীনা নাগরিকদের। এমনকি চীনা দূতাবাসের একটি প্রতিনিধিদলও থানায় আসে।
তিনি আরও জানান, দূতাবাসের কর্মকর্তারা সে সময় পুলিশকে জানিয়েছিলেন—গ্রেপ্তার হওয়া দুই চীনা নাগরিক এর আগেও অন্য একটি দেশে একই ধরনের অপরাধে জড়িত ছিলেন, পরে বাংলাদেশে চলে আসেন। তবে পুরোদমে জাল বিস্তারের আগেই তাঁদের পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
টেলিকম ও সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করেন, সিমবক্সের মাধ্যমে চালানো অবৈধ আন্তর্জাতিক কল দেশের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করে। কারণ, এমন অবৈধ চ্যানেল দিয়ে আসা কলের প্রকৃত তথ্য—ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর)—জাতীয় গেটওয়েতে সংরক্ষিত থাকে না। ফলে সীমান্তবর্তী কোনো এলাকা থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র যোগাযোগ চালিয়ে গেলে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
কক্সবাজার ও চট্টগ্রামেও একই চক্রের সন্ধান
খাগড়াছড়ির পর একই চক্রের দ্বিতীয় ঘাঁটির খোঁজ মেলে কক্সবাজারে। গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে শহরের কলাতলী এলাকার হোটেল সি-প্যালেসে অভিযান চালিয়ে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ছয় চীনা নাগরিককে। উদ্ধার করা হয় এক হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপ এবং বিদেশি পুলিশ বাহিনীর ব্যবহৃত যোগাযোগ সরঞ্জাম। এ ঘটনায় রামু থানায় মামলা হয়েছে।
রামু থানার ওসি এ কে ফজলুল হক জানান, প্রায় আড়াই মাস ধরে ওই হোটেলে অবস্থান করছিলেন গ্রেপ্তার হওয়া ছয় চীনা নাগরিক, যাঁরা কক্সবাজারে সার্ভার স্টেশন গড়ার চেষ্টায় ছিলেন। তাঁর মতে, চট্টগ্রামের খুলশীতে ধরা পড়া ৬৩ জন বিদেশির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই ছয়জনের কার্যকলাপের মিল রয়েছে—দুটোই একই চক্রের অংশ। মামলাটি এখন তদন্ত করছে সিআইডি।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
সবশেষ গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার জালালাবাদ কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার একটি সাততলা ভবন থেকে একসঙ্গে গ্রেপ্তার হন ৬৩ বিদেশি নাগরিক। এর মধ্যে পাঁচজন চীনের, বাকিরা পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের নাগরিক। এই ঘটনার মামলা তদন্ত করছে সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিট।
খুলশীর দোকানই ছিল যোগাযোগের কেন্দ্র
তদন্তকারীরা জানান, গ্রেপ্তার হওয়া চীনা নাগরিকদের প্রত্যেকেই প্রথমে চট্টগ্রামে পা রেখে খুলশী এলাকায় অবস্থান নিয়েছিলেন। খুলশীর জাকির হোসেন রোডে চীনা পণ্যের একটি দোকান তাঁদের মধ্যে যোগাযোগের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। এই দোকান থেকেই চীনা নাগরিকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো স্থানীয় দোভাষী বা দালালদের। খাগড়াছড়িতে গ্রেপ্তার আসিফও এভাবেই ওই দোকানের সূত্রে চীনা নাগরিকদের সংস্পর্শে আসেন।
খুলশীর ঘটনায় জড়িত ছিলেন মহসিন ও রাকিব নামের দুজন—মহসিন খুলশীর বাসাটি ভাড়া দিয়েছিলেন, আর রাকিব বাড়ির মালিকের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছিলেন। মহসিন অবশ্য ইতিমধ্যে একটি কোকেন উদ্ধার মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে খুলশী থানার মাধ্যমে কারাগারে গেছেন।
তথ্যসূত্র: আগামীর সময়