দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেনাবাহিনীর সহায়তায় নিজ পাড়ায় ফিরল রুমার বম পরিবারের সদস্যরা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সার্বিক সহায়তায় দীর্ঘদিন ভারতের মিজোরামে অবস্থানের পর নিজ পাড়া ও বসতভিটায় ফিরেছে বান্দরবানের রুমা উপজেলার বম সম্প্রদায়ের একটি পরিবার। একই পাড়ার আরও একজন ব্যক্তিও সম্প্রতি মুননাম পাড়ায় ফিরে এসে নতুন করে বসতি স্থাপন করেছেন। নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি ঘরবাড়ি মেরামত, খাদ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো এবং প্রাথমিক আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ফিরে আসা পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
২০২৪ সালের ৫ মার্চ নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে মুননাম পাড়ার একটি বম পরিবার এবং অন্য একটি পরিবারের একজন সদস্য ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নেন। দীর্ঘ সময় নিজ এলাকা ও বসতভিটার বাইরে অবস্থানের পর রুমার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় সেনাবাহিনীর আশ্বাসে তারা নিজ পাড়ায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।
দীর্ঘদিন পর নিজ বাড়ি ও পরিচিত পরিবেশে ফিরে আসা পরিবারটির জন্য শুরুতেই প্রয়োজনীয় খাদ্য ও গৃহস্থালি সামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের হাতে ৫০ কেজি চাল, ৭ কেজি ডাল, ৭ কেজি তেল, ৫ কেজি লবণ, ৫ কেজি আলু ও ৫ কেজি পেঁয়াজসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। ফলে নতুন করে বসতি স্থাপনের শুরুতেই পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের একটি বড় অংশের সংকট দূর হয়েছে।
শুধু খাদ্য সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি পুনর্বাসনের উদ্যোগ। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় বসতঘরটি মেরামত ও পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ জন্য পরিবারটিকে তিন বান্ডিল ঢেউটিন এবং একটি সোলার প্যানেল দেওয়া হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুতের সীমিত সুবিধার মধ্যে সোলার প্যানেলটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পুনর্বাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতেও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের ১৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। একই পাড়ায় ফিরে আসা অন্য পরিবারের সদস্যকেও ১৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিনি নিজ পাড়ায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের পর তার প্রয়োজন অনুযায়ী আরও সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দীর্ঘদিন নিজ ভূমির বাইরে থাকার পর ফিরে আসা মানুষের জন্য পুনর্বাসন শুধু একটি ঘর তৈরি করে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্য, বাসস্থান, বিদ্যুৎ, জীবিকা এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুননাম পাড়ায় ফিরে আসা পরিবারটির ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এসব মৌলিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।
মুননাম পাড়ার এই প্রত্যাবর্তন রুমায় চলমান পুনর্বাসন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতার অংশ। এর আগে ভারতের মিজোরাম থেকে দার্জিলিং পাড়ায় একটি পরিবার, নাজেরাত পাড়ায় একটি পরিবার এবং মুলফি পাড়ায় একটি পরিবার নিজ নিজ পাড়ায় ফিরে এসে পুনর্বাসিত হয়েছে। এ নিয়ে রুমার বিভিন্ন পাড়ায় এ পর্যন্ত ৬৮টি পরিবার নিজ ভূমিতে ফিরে এসে পুনর্বাসিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন পাড়ার বাইরে অবস্থানের কারণে ফিরে আসা অনেক পরিবারের বসতঘর জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও ঘর মেরামতের প্রয়োজন, কোথাও খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট, আবার কোথাও জীবিকা পুনরায় শুরু করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যাবর্তনকারী পরিবারগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে এ ধরনের সহায়তার গুরুত্ব আরও বেশি। রুমার প্রত্যন্ত পাহাড়ি পাড়াগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থা দুর্গম হওয়ায় নির্মাণসামগ্রী পরিবহন, ঘর মেরামত কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করাও অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন পর ফিরে আসা পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই সংকট আরও প্রকট হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে খাদ্যসামগ্রী, নির্মাণসামগ্রী, সোলার প্যানেল ও আর্থিক সহায়তা তাদের পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বাস্তব সহায়তা দিচ্ছে।
নিজ বাড়িতে ফিরে আসার পর পরিবারগুলোর মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দও লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘদিন অন্যত্র অবস্থানের পর নিজেদের বসতভিটা, প্রতিবেশী ও পরিচিত পরিবেশে ফিরে তারা নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পাচ্ছেন। জরাজীর্ণ বসতঘর মেরামতের উপকরণ এবং প্রাথমিক খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা পাওয়ায় প্রত্যাবর্তনকারীদের জন্য নতুন করে সংসার গোছানোর প্রক্রিয়াটিও সহজ হচ্ছে।
রুমার মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি ফিরে আসা পরিবারগুলোকে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনে সহায়তা করা পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। শুধু নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে আনা নয়, তারা যাতে সেখানে নিরাপদে বসবাস করতে পারেন এবং ধীরে ধীরে নিজেদের জীবিকা পুনর্গঠন করতে পারেন, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা প্রদানকে স্থানীয়দের জন্য কার্যকর সহযোগিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকার পর নিজ ভূমিতে ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবন শুরু করার সুযোগ পাওয়া একটি পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুনর্বাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে খাদ্য, বাসস্থান ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে প্রত্যাবর্তনকারীদের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমে আসে। একই সঙ্গে তারা নিজেদের পাড়ায় থেকেই ধীরে ধীরে জীবিকা ও সামাজিক জীবন পুনর্গঠনের সুযোগ পান।
ভারতের মিজোরাম থেকে নিজ পাড়া ও বসতভিটায় ফিরে আসতে ইচ্ছুক পরিবারগুলোর নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং পুনর্বাসনেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। প্রত্যাবর্তনকারী পরিবারগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য, বাসস্থান, জীবিকা ও অন্যান্য মৌলিক বিষয়ে সহায়তা দেওয়ার এ উদ্যোগ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছে।
নিজ ভূমিতে ফিরে আসা একটি পরিবারকে ঘর মেরামতের উপকরণ থেকে শুরু করে খাদ্য, বিদ্যুৎ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে পুনর্বাসনের যে বাস্তব চিত্র তৈরি হয়েছে, মুননাম পাড়ার ঘটনাটি তারই একটি উদাহরণ। স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়িয়ে এ ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকলে দুর্গম পাহাড়ের প্রত্যন্ত পাড়াগুলোতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুনর্গঠন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।