রাঙামাটিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে, হাসপাতালে মশারি ছাড়াই চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত জেলায় ৩৩২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ২০৮ জন, যা মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি। এদিকে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের অনেককে মশারি ছাড়াই চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। এতে অন্য রোগীদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে থাকায় মশক নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, পৌরসভার পক্ষ থেকে মশা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে নালা, নিচু এলাকা ও জমে থাকা পানিতে মশার বিস্তার রোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। তবে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়ি জেলা রাঙামাটি মশাবাহিত রোগের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতি বছর এখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। এর সঙ্গে এবার ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জেলার কাপ্তাই, রাজস্থলী ও নানিয়ারচর উপজেলা এবং রাঙামাটি শহরের টিএন্ডটি, কলেজ গেট, হ্যাপির মোড় ও ফিসারি ঘাট এলাকাকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। শহরের বিভিন্ন নিচু এলাকা ও জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা দেখা যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপও বাড়ছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে কেউ কেউ অন্য এলাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে এসেছেন, আবার অনেকে স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মশারি ছাড়া থাকতে দেখা যাওয়ায় সাধারণ রোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রোগীর স্বজনেরা। তাঁদের আশঙ্কা, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা না গেলে হাসপাতালেই অন্যদের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অমল বিকাশ চাকমা বলেন, তিনি চট্টগ্রাম থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বাড়িতে ফেরেন। পরে শারীরিক অবস্থার কিছুটা অবনতি হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি আগের তুলনায় কিছুটা সুস্থ বোধ করছেন।
শহরের কলেজ গেট এলাকার বাসিন্দা মো. কাউসার আহম্মদও বেশ কিছুদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তিনি বলেন, তাঁদের এলাকায় নালা থাকায় সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। তাঁর অভিযোগ, এলাকায় মশক নিধনে পৌরসভার কার্যক্রম তেমন চোখে পড়ে না। ওই এলাকা থেকে অনেক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মশারি ব্যবহার না করার বিষয়ে রোগীর স্বজন নয়ন খীসা বলেন, রোগীর জ্বর কমে গেলে শরীরে প্রচণ্ড গরম অনুভূত হয়। এ কারণে মশারি খুলে রাখা হয়েছে। তবে রাতে মশারি দিয়ে রাখা হয় বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, রোগীর স্বজন মো. ইয়াছিন আলী বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা মশারি ছাড়া থাকলে সাধারণ রোগীদেরও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ নিয়ে তিনি আতঙ্কিত বলে জানান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পৌরসভার মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। যেসব এলাকায় মশা মারার ওষুধ ছিটানো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে, তা মশার বিস্তার রোধে পর্যাপ্ত নয় বলে তাঁদের দাবি। তবে পৌরসভার পক্ষ থেকে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানানো হয়েছে।
রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক প্রধান চিকিৎসক মো. শওকত আকবর খান বলেন, হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসাসেবায় কোনো ঘাটতি নেই। ডেঙ্গু শনাক্তের পরীক্ষার সময় নিয়েও অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। জ্বর শুরুর তৃতীয় দিনে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো উচিত বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, অনেকেই এর আগেই পরীক্ষা করানোর কারণে পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত নাও হতে পারে। হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা রয়েছে।

হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ইউনিট চালু করা সম্ভব না হওয়ায় একটি ডেঙ্গু কর্নার করা হয়েছে জানিয়ে চিকিৎসক শওকত আকবর খান বলেন, রোগীদের সব সময় মশারির ভেতরে থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়। তবে কিছু রোগী সেই নির্দেশনা মানতে চান না। তাঁদের বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
রাঙামাটির সিভিল সার্জন চিকিৎসক নূয়েন খীসা বলেন, রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে চিকিৎসা দেওয়ার প্রস্তুতি থাকায় জেলায় এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। প্রাণহানি এড়াতে স্বাস্থ্য বিভাগ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সিভিল সার্জন। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, মশারি ব্যবহার এবং আক্রান্ত রোগীদের মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা ডেঙ্গুর বিস্তার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হাসপাতাল ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।