স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ করল আজারবাইজান, দেশজুড়ে বিরল বিক্ষোভ
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
নেভি ব্লু রঙের হিজাব পরা এক কিশোরী মেয়েকে ভিডিওতে তার স্কুলের গেটে এক স্টাফকে বলতে দেখা গেছে ‘আপনি আমাকে বলছেন, আমি স্কুলে আসতে পারব না?’
ফুটেজটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, তার পেছনে হিজাব পরা একদল ছাত্রী দাঁড়িয়ে তালি দিচ্ছে আর ওই কিশোরী বলছে, ‘কেন আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করব?’
গত সোমবার আজারবাইজানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন ইউনিফর্ম নিয়ম কার্যকর করতে শুরু করে এবং হিজাব পরিহিত ছাত্রীদের স্কুল থেকে ফিরিয়ে দেয়। রাজধানী বাকু এবং মাসালি ও জাল্লিলাবাদের মতো বেশ কয়েকটি দক্ষিণের জেলায় সরকারি স্কুলগুলোর বাইরে বিক্ষোভ শুরু হয়।
দেড় কোটি জনসংখ্যার এই তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশটিতে বিক্ষোভ বিরল ঘটনা। আজারবাইজান একটি সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং সরকার এটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে।
প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ ২০০৩ সাল থেকেই ক্ষমতায় আছেন এবং ভিন্নমতের প্রতি তার কোনো সহনশীলতা নেই। বিরোধী রাজনীতিবিদ ও অনেক স্বাধীন সাংবাদিক এখন কারাগারে বন্দি।
আজারবাইজান তার দুই প্রতিবেশী—তুরস্ক এবং ইরানের মাঝখানে অবস্থিত। আজারবাইজানিরা একটি তুর্কি গোত্রভুক্ত জাতি এবং তাদের ভাষা তুর্কি ভাষার খুব কাছাকাছি। তুরস্ক দেশটির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র।
তবে দক্ষিণের প্রতিবেশী ইরানের মতো আজারবাইজানও প্রধানত শিয়া অধ্যুষিত—এখানকার অর্ধেকের বেশির (৬০ শতাংশের বেশি) মানুষ নিজেদের শিয়া মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেন, অন্যদিকে অধিকাংশ তুর্কি নাগরিক সুন্নি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিয়ম মানতে বাধা দেওয়া এবং ‘জনশৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করার’ অভিযোগে তারা সোমবার ৩৭ জনকে আটক করেছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর অনুমোদিত এই নিয়মগুলোতে সরকারি স্কুলগুলোতে ‘শিক্ষায় ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির’ সাথে সাংঘর্ষিক পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে এতে সরাসরি হিজাবের কোনো উল্লেখ নেই। গত ৬ অক্টোবর শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নির্দেশিকা সম্প্রসারিত করা হয়।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বাকুর উপকণ্ঠে বালাখানি এলাকার ৬৯ নম্বর স্কুলের বাইরে শিক্ষার্থীরা একটি ব্যানার ধরে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে লেখা রয়েছে, ‘হিজাব কারো শিক্ষা অর্জনে বাধা নয়।’
রাজধানীর মাসতাগা এলাকার একটি স্কুলের বাইরে বিক্ষোভ করার সময় শাহিজা হুসেইনোভা নামের এক মাকে মঙ্গলবার আটক করা হয়।
জার্মানিভিত্তিক স্বাধীন আজারবাইজানি ভাষার চ্যানেল ‘মেইদান টিভি’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হুসেইনোভা স্বামী আগা জানান, তাকে একটি সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, ‘হয় আপনার সন্তানের হিজাব খুলে স্কুলে পাঠান, নয়তো জেলে যান।’
মঙ্গলবার “লেইলিকে স্কুলে যেতে দাও” নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করা ইলকিন হুসেইনোভ নামে এক অ্যাক্টিভিস্টের সাথেও তার বন্ধুরা যোগাযোগ করতে পারছেন না। এই প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে ক্লাসে ঢুকতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষকদের মাধ্যমে বিনামূল্যে পাঠদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এক বন্ধুর বরাতে জানা গেছে, বুধবার বিকেল চারটার দিকে বাকুর বাসা থেকে কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তির সাথে বের হয়ে যান হুসেইনোভ, আর তারপর থেকেই তার ফোন বন্ধ রয়েছে। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে বন্ধুদের ধারণা তাকে আটক করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্ল্যাটফর্মটির ইনস্টাগ্রাম পেজটিতেও আর প্রবেশ করা যাচ্ছিল না।
বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে গ্রাহকেরা ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার ছাড়া ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে প্রবেশে সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
বেশিরভাগ বিক্ষোভই হয়েছে বাকুর দূরবর্তী এলাকার ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল লোকালয়গুলোতে এবং ইরানের সাথে ৭৬৫ কিলোমিটার (৪৭৫ মাইল) সীমান্ত সংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে।
ইরানের ধর্মীয় প্রভাব নিয়ে কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কেননা খোদ আজারবাইজানের চেয়েও বেশি সংখ্যক আজারবাইজানি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ইরানে বসবাস করে।
১৩ অক্টোবর রাতে আজারবাইজানের স্পেশাল কমিউনিকেশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সিকিউরিটি সার্ভিস জানায়, একটি “বিদেশি হ্যাকার গোষ্ঠী” ১০০টিরও বেশি সরকারি ওয়েবসাইটে হামলা চালিয়েছে।
‘৩১৩ টিম (সাইবার ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স)’ নামে একটি ইরানপন্থি গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। আজারবাইজানি কর্মকর্তারা এসব নিয়মের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। দেশটির সংসদ সদস্য নিগার আরপাদরাই ১নিউজ.এজেড ওয়েবসাইটকে বলেন, শিশুরা নিজেরা হিজাব পরার সিদ্ধান্ত নেয় না, বরং পরিবারের প্রভাবের কারণেই তা পরে থাকে।
তিনি বলেন, ‘একটি শিশুর ধর্ম বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকে না। এটি কেবল প্রাপ্তবয়স্কদেরই একটি সচেতন অধিকার। এই বিবাদ এখন বাকুর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কেও ছড়িয়ে পড়েছে—যে দেশটি নাগর্নো-কারাবাখ নিয়ে আর্মেনিয়ার সাথে ২০২০ সালের যুদ্ধে আজারবাইজানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা দিয়েছিল।
দেশ দুটি নিজেদের “এক জাতি, দুই রাষ্ট্র” বলে অভিহিত করে থাকে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেসেপ তায়িপ এরদোয়ান একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম এবং তিনি একটি “ধার্মিক প্রজন্ম” গড়ে তোলার কথা বলে আসছেন।
তার প্রধান উপদেষ্টা ওকতাই সারাল আজারবাইজানের এই বিধিনিষেধকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং এই “ভুল সিদ্ধান্তের পথ থেকে সরে আসার” জন্য বাকুর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এক্স-এ সারাল লেখেন, ‘হিজাব কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়; এটি একজন মানুষের বিশ্বাসের তাগিদ!’ তুরস্কের ক্ষমতাসীন এক পার্টির কয়েকজন সংসদ সদস্যও এই সুরে সুর মিলিয়েছেন।
হিজবুত তাহরীরের সাথে সম্পৃক্ত একটি ইসলামপন্থী সংগঠন ‘কোকলু দেগিসিম’ আঙ্কারায় আজারবাইজানের দূতাবাসের সামনে এবং রক্ষণশীল ইসলামপন্থী গোষ্ঠী ‘অজগুর-দের’ ইস্তাম্বুলে আজারবাইজানের কনস্যুলেটের সামনে ছোট আকারের বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
প্রেসিডেন্ট আলিয়েভের ‘নিউ আজারবাইজান পার্টি’ তুর্কি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে “প্রকাশ্যে মানহানিকর” তথ্য প্রচার এবং “ভিত্তিহীন অভিযোগ”-এর তোপ দাগার দায় চাপিয়েছে। ওকতাই সারালের মন্তব্য দুদেশের সম্পর্কে ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করছে বলে সতর্ক করে দিয়ে দলটি আজারবাইজানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে হুশিয়ারি দিয়েছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইলহাম আলিয়েভ নিজেই বলেছিলেন, ‘কারো উচিত নয় আমাদের জীবনযাত্রার ওপর নাক গলানো।’
এই বিরোধের পেছনে টানাপোড়েনের অন্য কোনো কারণও লুকিয়ে থাকতে পারে। তুর্কি বিক্ষোভকারীরা হিজাব বিধিনিষেধের সাথে ইসরায়েলের সাথে আজারবাইজানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। উল্লেখ্য, ইসরায়েল বাকুর কাছে অস্ত্র বিক্রি করে এবং তাদের কাছ থেকে তেল কিনে থাকে।
গাজা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি হলেও আজারবাইজান উভয় দেশের সাথেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে।
তবে এই ভারসাম্য রক্ষা করা বেশ কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। বৃহস্পতিবার আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সম্মেলনে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজোগ বক্তব্য দেয়ার সময় তুরস্ক, ইরান ও অন্যান্য দেশের প্রতিনিধি দল হল ত্যাগ করে বেরিয়ে যায়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।