মাতামুহুরীর বুকে কল্পজাহাজ, তীরে সম্প্রীতির ঢেউ—আলীকদমে ওয়াগ্যাই পোয়েঃ উৎসব

মাতামুহুরীর বুকে কল্পজাহাজ, তীরে সম্প্রীতির ঢেউ—আলীকদমে ওয়াগ্যাই পোয়েঃ উৎসব

মাতামুহুরীর বুকে কল্পজাহাজ, তীরে সম্প্রীতির ঢেউ—আলীকদমে ওয়াগ্যাই পোয়েঃ উৎসব
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

মাতামুহুরী নদীর বুকে ভাসছে রঙিন কল্পজাহাজ, তীরে উপচে পড়া মানুষের ভিড়। ঢাক-ঢোলের বাদ্য, নাচ-গান আর উৎসবের উচ্ছ্বাসে একাকার পাহাড়ের নানা সম্প্রদায়ের মানুষ। ধর্মীয় আচারকে কেন্দ্র করে এমন মিলনমেলায় বান্দরবানের আলীকদমে তৈরি হয়েছে সম্প্রীতির অনন্য আবহ। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা বা ‘মাহাঃ ওয়াগ্যাই পোয়েঃ’ উৎসবের শেষ পর্বে কল্পজাহাজ ভাসানোর মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এবারের আয়োজন।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে আলীকদম কেন্দ্রীয় বৌদ্ধবিহারের ক্যাং ঘাট থেকে দুটি দৃষ্টিনন্দন কল্পজাহাজ নিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। রঙ-বেরঙের পোশাকে সজ্জিত হাজারো মারমাসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এতে অংশ নেন। কল্পজাহাজ ঘিরে ঢাক-ঢোল ও নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে নাচ-গানে মেতে ওঠেন উৎসবে অংশ নেওয়া মানুষ। ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি এ আয়োজন হয়ে ওঠে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলা।

কল্পজাহাজ ভাসানো দেখতে সকাল থেকেই মাতামুহুরী নদীর তীরে ভিড় জমাতে থাকেন উৎসুক মানুষ। প্রায় দুই ঘণ্টার উৎসবমুখর আয়োজন শেষে নদীতে ভাসানো হয় কাঙ্ক্ষিত কল্পজাহাজ। বাঁশ, বেত ও কাঠের সঙ্গে রঙিন কাগজ ব্যবহার করে নিপুণ কারুকাজে তৈরি জাহাজ দুটি ঢেউয়ের তালে নদীর বুকে ভেসে চলে। দৃষ্টিনন্দন এই দৃশ্য উপস্থিত দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করেও পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে জাহাজ ভাসানোর পর্ব সম্পন্ন করা হয়।

উৎসবের আনন্দে শুধু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষই নন, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণও ছিল চোখে পড়ার মতো। ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে এই সম্মিলন আলীকদমের বহুত্ববাদী সামাজিক জীবনের একটি উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরে। ভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের পাশাপাশি অংশগ্রহণে নদীর তীর যেন হয়ে ওঠে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের প্রতীক।

কল্পজাহাজ ভাসানো আয়োজক কমিটির সদস্যরা জানান, প্রায় দুইশ বছর আগে মিয়ানমারের মুরহন ঘা নামক স্থানের একটি নদীতে মংরাজ ম্রাজংব্রান প্রথম এ উৎসবের আয়োজন করেন বলে প্রচলিত রয়েছে। প্রবারণা পূর্ণিমায় সবাইকে একত্রিত করার উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া এই আয়োজন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ঐতিহ্য ধরে আজও উৎসবটি উদযাপিত হচ্ছে। এবারও প্রবারণা পূর্ণিমায় পৃথিবীর মানুষের সুখ, শান্তি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ প্রার্থনা করা হয়েছে বলে জানান আয়োজকেরা।

আলীকদম আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আপ্রুমং মারমা বলেন, আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বর্ষাব্রত পালন করেন। এ সময় বৌদ্ধ দায়ক-দায়িকারা প্রতি অমাবস্যা, পূর্ণিমা ও অষ্টমী তিথিতে অষ্টশীল পালন করেন। বর্ষাব্রত চলাকালে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সদ্ধর্মবিষয়ক অধ্যয়ন, গবেষণা ও জ্ঞান আহরণে সময় দেন। বর্ষাব্রত পালনের শেষ দিন আশ্বিনী পূর্ণিমাকে প্রবারণা পূর্ণিমা বা ‘ওয়াগ্যাই পোয়েঃ’ বলা হয়।

প্রবারণা পূর্ণিমার মধ্য দিয়ে বর্ষাব্রত শেষ হলেও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আয়োজন এখানেই শেষ হচ্ছে না। পূর্ণিমার পরদিন থেকে এক মাসব্যাপী বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান পালিত হবে।

মাতামুহুরী নদীতে কল্পজাহাজ ভাসানোর এই আয়োজন ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করার বার্তাও দিয়েছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed