অপরাধের অর্থে চলছে মিয়ানমারের যুদ্ধ, জান্তার হামলায় নিহত ৮৩৮৪- জাতিসংঘ
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি ‘বিপর্যয়কর’ বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। এ সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, দেশটিতে চলমান যুদ্ধের অবসানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মিয়ানমারের ক্রমবর্ধমান অবৈধ অর্থনীতি এখন শুধু সংঘাতের পরিণতি নয় বরং সংঘাত টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও জান্তা বাহিনীর হামলায় ৮ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে এ সতর্কবার্তা দেন মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার পর থেকে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে। এর ফলে দেশজুড়ে ব্যাপক সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি কেলি অ্যান একেলস-কারির নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর হাতে অন্তত ৮ হাজার ৩৮৪ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
বেসামরিক মানুষের ওপর পরিকল্পিত হামলা
বিশেষজ্ঞের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত জান্তা সরকার তথাকথিত ‘১০০ দিনের শান্তি পরিকল্পনা’ চালু করলেও দেশটির পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ১০০ দিনের ওই সময়ে প্রায় ৭৫৩ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এসব মৃত্যুর ৮৯ শতাংশের জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগী আধাসামরিক বাহিনী দায়ী।
সামরিক বাহিনী এখনো বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণসহ যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করে বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করছে। এসব হামলায় স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ধর্মীয় স্থাপনা, বাজার ও বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবির ধ্বংস করা হচ্ছে।
বিশেষ প্রতিনিধি একেলস-কারি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এসব কোনো দুর্ঘটনা নয়। বেসামরিক জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ক্ষতিসাধন করা হচ্ছে।’
মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে বাধা
জাতিসংঘ সংবাদের তথ্য মতে, সামরিক বাহিনীর কৌশলের ভিত্তি হলো ‘ফোর কাটস’ বা ‘চারটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার’ নীতি। এর মাধ্যমে জান্তাবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে ওঠা এলাকাগুলো থেকে খাদ্য, সম্পদ, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ এবং সামাজিক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনী টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ, চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ এবং বিভিন্ন স্থানে তল্লাশিচৌকি বসিয়ে পরিকল্পিতভাবে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে বাধা দিচ্ছে। এর ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও অন্যান্য জরুরি সরবরাহ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া ত্রাণকর্মীরাও হয়রানি, নির্বিচার আটক, নির্যাতন ও হত্যার শিকার হচ্ছেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাওয়েইতে তিনজন মানবিক সহায়তাকর্মীকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
যুদ্ধের অর্থনীতিতে অপরাধজগতের ভূমিকা
মিয়ানমারের ক্রমবর্ধমান অবৈধ অর্থনীতি এখন শুধু সংঘাতের পরিণতি নয় বরং সংঘাত টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে দেশটির আনুষ্ঠানিক অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছে। এর ফলে অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্র, অবৈধ খনন, মানব পাচার ও জোরপূর্বক শ্রমের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অর্থনীতির শূন্যস্থান দখল করছে।
জাতিসংঘ প্রতিনিধি একেলস-কারি ব্যাখ্যা করেন, কালোবাজারের মুনাফা সামরিক বাহিনীর অস্ত্র কেনার অর্থ জোগাচ্ছে। চীন ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ত্র কেনার পাশাপাশি এসব অর্থ জান্তা বাহিনীর সদস্যদের আনুগত্য ধরে রাখতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের অধিকাংশ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে চীনা আন্তদেশীয় অপরাধী নেটওয়ার্ক। এসব চক্র তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় টেথারের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম এবং টিকটক, মেটা ও এক্সের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর দুর্নীতিও সীমান্ত পেরিয়ে এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সহায়তা করছে। এর পাশাপাশি এসব অপরাধী নেটওয়ার্কের কার্যক্রম বন্ধ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকির কথাও তুলে ধরেছেন জাতিসংঘের এই বিশেষজ্ঞ।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রতারণাকেন্দ্রগুলোতে স্টারলিংকের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধের উদ্যোগের ফলে মানবিক সহায়তা সংস্থা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীও জরুরি যোগাযোগসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।