শান্তিচুক্তি, সশস্ত্র তৎপরতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন: পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী কেন যাবে?

শান্তিচুক্তি, সশস্ত্র তৎপরতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন: পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী কেন যাবে?

শান্তিচুক্তি, সশস্ত্র তৎপরতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন: পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী কেন যাবে?
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

মেজর নাসিম হোসেন (অব.)

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে তীব্র আপত্তি রয়েছে। তাদের দাবি শুনলে মনে হয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যেন কোনো বিদেশি দখলদার বাহিনী! রাশিয়া যেমন ইউক্রেনে এবং ইসরায়েল যেমন গাজা ও পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযান ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও বুঝি তেমন কিছু করছে।

এ কথা বললেই সশস্ত্র গোষ্ঠী ও তাদের সমর্থকেরা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৭ নম্বর ধারা সামনে নিয়ে আসেন।

কিন্তু ওই ধারায় আসলে কী বলা হয়েছে?

চুক্তির সংশ্লিষ্ট ধারার মর্মার্থ হলো, জনসংহতি সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু স্থায়ী স্থাপনা ছাড়া অস্থায়ী সামরিক, আনসার ও ভিডিপি ক্যাম্প পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হবে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য সেনাবাহিনী নিয়োজিত থাকতে পারবে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর যখন এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন এর সম্ভাব্য নিরাপত্তাগত প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। আমার মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি চুক্তি প্রণয়নের সময় যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়নি।

বলা হয়, সন্তু লারমার চাপের মুখে ১১ সদস্যের কমিটিতে সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। সন্তু লারমার রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত বামপন্থী রাজনীতিক রাশেদ খান মেননের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা থাকা উচিত।

এসব আক্ষেপ আপাতত পাশে রেখে চুক্তির সংশ্লিষ্ট ধারাটি একটু গভীরভাবে দেখা যাক। এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শব্দ ও শব্দগুচ্ছ হলো—‘স্বাভাবিক জীবন’, ‘স্থায়ী ও অস্থায়ী ক্যাম্প’ এবং ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’।

স্বাভাবিক জীবন কি ফিরে এসেছে?

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে?

শান্তিবাহিনীর সদস্যদের অস্ত্র জমা দেওয়ার কথা ছিল। তাঁরা কি তাঁদের সব অস্ত্র জমা দিয়েছেন? পার্বত্য চট্টগ্রামে কি সত্যিই স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে এসেছে? সন্তু লারমা কি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতি বৈরী মনোভাব পরিত্যাগ করেছেন? তাঁর নেতৃত্বাধীন সংগঠন কি সশস্ত্র রাজনীতির পথ সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করেছে? বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি তাঁদের অবস্থান কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে শুধু সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবি তোলা কতটা যৌক্তিক?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার প্রচার– এসব গোষ্ঠীর প্রকাশ্য তৎপরতা এবং অস্ত্রধারীদের উপস্থিতি যে নিরাপত্তাগত উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, তা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।

একসময় যে সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনী নামে পরিচিত ছিল, তার উত্তরাধিকার, বর্তমান জনসংহতি সমিতির ও ‘জেএলএ’—অর্থাৎ ‘জুম্মা লিবারেশন আর্মি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। পর্যটকদের চলাচলে বাধা, সশস্ত্র হামলা, চাঁদাবাজি, অপহরণ, গুমের অভিযোগ এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর পারস্পরিক সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড—সেখানে স্বাভাবিক জনজীবন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করা কঠিন।

হাজার হাজার পর্যটককে পথে আটকে রাখা, নারী-পুরুষ ও শিশুসহ মানুষের ওপর গুলিবর্ষণের অভিযোগ এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পর্যটকদের চলাচল করতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে কি?

যদি স্বাভাবিক পরিস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাহলে দূরদূরান্ত থেকে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কেন নিরাপত্তার উদ্বেগ নিয়ে ফিরতে হবে?

সম্প্রতি প্রায় তিন হাজার পর্যটকের আটকে পড়ার যে ঘটনা আলোচনায় এসেছে, সেটিও পর্যটন, জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবি এবং বাস্তবতা

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অস্থায়ী সামরিক, আনসার ও ভিডিপি ক্যাম্প পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই প্রত্যাহারকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।

সেনাবাহিনীর বিকল্প অন্যান্য বাহিনীর দায়িত্ব, প্রশিক্ষণ, জনবল ও সক্ষমতা সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক নয়।

তাই প্রশ্ন হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা মোকাবিলা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিকল্প বাহিনীর পর্যাপ্ত সক্ষমতা রয়েছে কি না।

আমার আশঙ্কা, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে তাদের শুধু নির্দিষ্ট স্থাপনা বা ব্যারাকে সীমাবদ্ধ রাখা হলে কোনো কোনো এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে।

তবে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি কতটা প্রয়োজন, কোথায় প্রয়োজন এবং কী ধরনের দায়িত্বে প্রয়োজন—এসব সিদ্ধান্ত আবেগের ভিত্তিতে নয়, বরং গোয়েন্দা তথ্য, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, স্থানীয় জনগণের অভিজ্ঞতা ও আইনগত বাধ্যবাধকতার ভিত্তিতে নেওয়া উচিত।

পাহাড়ের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেবল স্থানীয় সমস্যা নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত, প্রতিবেশী ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমারের পরিস্থিতিও জড়িত।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সশস্ত্র আন্দোলন, মিয়ানমারের সংঘাত এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর চলাচল বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। অতীতেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থানকে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা হয়েছে।

এ অঞ্চলে কুকি, লুসাই এবং অন্যান্য সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত ও যোগাযোগের ইতিহাস রয়েছে। পূর্ব বাংলার বিভিন্ন বামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রমের সঙ্গেও কোনো কোনো সময়ে পার্বত্য অঞ্চলের যোগসূত্রের কথা আলোচিত হয়েছে।

এই ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়: পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় বাস্তবতার পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

ঐতিহাসিকভাবে ১৮৬৬ সালের কুকি আক্রমণ, যা অনেক লেখায় ‘গ্রেট কুকি ইনভেশন’ নামে উল্লেখ করা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের অতীত সংঘাতের একটি আলোচিত অধ্যায়। এ আক্রমণে চাকমা ও ত্রিপুরাসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রাণহানি ও বসতিতে ধ্বংসযজ্ঞের বিবরণ পাওয়া যায়।

পরবর্তী সময়ে ১৮৭১–৭২ সালে ক্যাপ্টেন টি. এইচ. লুইনের নেতৃত্বে লুসাই অভিযানের কথাও ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

ব্রিটিশ শাসনামলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ও বিদ্রোহ দমনের জন্য বিশেষ বাহিনী গঠনের ইতিহাসও রয়েছে।

অতীতের এসব ঘটনা থেকে অন্তত একটি শিক্ষা পাওয়া যায়: পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমান্তবর্তী বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে নিরাপত্তানীতি প্রণয়ন করা যায় না।

১৯৭৬ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় ১৯৭৬ সালের ঘটনাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময়ে শান্তিবাহিনীর তৎপরতা এবং বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলার বিবরণ পাওয়া যায়। পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, বন বিভাগ ও সরকারি কোষাগার-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন সেনা মোতায়েন ছিলো না।

বৃহত্তর শিক্ষা হলো, কোনো অঞ্চলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

যাঁরা যুদ্ধ করেছেন, তাঁরা জানেন—কোনো ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালে তা পুনরুদ্ধার করতে কত মূল্য দিতে হয়। পাহাড়ি ও দুর্গম ভূখণ্ডে এ চ্যালেঞ্জ আরও জটিল।

বর্তমান সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র, যোগাযোগব্যবস্থা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন প্রয়োজন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।

আমার মতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া সেনাবাহিনীর ব্যাপক প্রত্যাহার করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর বিকল্প কি আছে?

আমার দৃষ্টিতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ভূখণ্ডে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা মোকাবিলা, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচ্য:

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা অন্য কোনো বাহিনীর আছে কি না;

সেনাবাহিনীর বিকল্প কোনো বাহিনীকে দায়িত্ব দিতে হলে তার প্রশিক্ষণ, জনবল, সরঞ্জাম ও সমন্বয়ব্যবস্থা যথেষ্ট কি না;

বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্ব ও স্থানীয় জনগণের অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখা যায়।

আমার বিশ্বাস, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা অব্যাহত থাকলে সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।
গত কয়েক দশকে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে এ ভূমিকার মূল্যায়ন করতে হলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা দমন, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় অর্জন ও সীমাবদ্ধতা—সবই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সেনাবাহিনীকে শুধু একটি বাহিনী হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে হবে। একই সঙ্গে তার কার্যক্রমকে আইন, জবাবদিহি ও বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের আওতায় রাখতে হবে।

শান্তিচুক্তির শর্ত কি একতরফাভাবে বাস্তবায়ন করা যায়?

এবার আসা যাক চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নের প্রশ্নে।

শান্তিচুক্তির উদ্দেশ্য ছিল সংঘাতের অবসান, অস্ত্র সমর্পণ, স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের মূল্যায়ন করতে হলে উভয় পক্ষের দায়িত্ব ও অঙ্গীকার বিবেচনায় নিতে হবে।

আমার অভিযোগ, শান্তিবাহিনীর সব অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি এবং পুরোনো বা অকেজো অস্ত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্য ব্যাহত হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী জনসাধারণের চলাচল নির্বিঘ্ন হওয়ার কথা, স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা না থাকার কথা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করার কথা। কিন্তু চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যাকাণ্ড, সশস্ত্র সংঘর্ষ ও চলাচলে বাধার মতো ঘটনা অব্যাহত আছে।

চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক বছরের মধ্যেই সন্তু লারমার বক্তব্যে পুনরায় আন্দোলনের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুগান্তর পত্রিকায় ৮ নভেম্বর ২০০০ সালে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তাঁর নামে যে বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়, তা হলো: “জেএসএস তার জন্মলগ্ন থেকে এ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এটার কোনো রদবদল হয়নি, হতে পারে না।”
একই বছরের ১০ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়:

“চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত হয়ে উঠবে।”

চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও হুমকিমূলক বক্তব্যের বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না। শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে দাবি থাকতেই পারে; কিন্তু তা যেন সহিংসতা বা সশস্ত্র সংঘাতের হুমকিতে পরিণত না হয়।

বিবিসি বাংলার সাংবাদিক আকবর হোসেনের একটি সাম্প্রতিক পডকাস্টে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ১৯০টি নিরাপত্তা ক্যাম্প প্রত্যাহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে আমার জানা আছে। এ সংখ্যাটির মূল সূত্র, সময়কাল এবং ক্যাম্পগুলোর ধরন যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ নিরাপত্তা ক্যাম্প

প্রত্যাহারের সংখ্যা একা দিয়ে বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির পূর্ণ মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

আমার মতে, চুক্তির আওতায় সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে, সেগুলোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে।

সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক সংঘাত

পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তির পেছনে কেবল রাষ্ট্র ও কোনো একটি রাজনৈতিক সংগঠনের বিরোধ কাজ করছে না। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর পারস্পরিক দ্বন্দ্বও স্থানীয় জনগণের জীবনকে বিপর্যস্ত করছে।

জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত সংঘর্ষ, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এ বাস্তবতার অংশ।

এসব সংঘর্ষে কতজন নিহত বা আহত হয়েছেন, কতজন অপহৃত হয়েছেন এবং কত পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য হিসাব প্রয়োজন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ২৩ জন নিহত ও ৫০ জন অপহৃত হওয়ার মতো যেসব পরিসংখ্যান আলোচনায় আসে, সেগুলোর সময়সীমা, উৎস ও প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা উচিত।

তবে পরিসংখ্যানের ঘাটতি থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক সংঘাত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে এ ধরনের গোষ্ঠীগত সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু শান্তিচুক্তির ভাষা নয়, বাস্তব নিরাপত্তা পরিস্থিতিও বিবেচনা করতে হবে।

সন্তু লারমার রাজনৈতিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক নথি

সন্তু লারমার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। ১৯৭২ সালের বিভিন্ন গোয়েন্দা ও পুলিশি প্রতিবেদনে@ তাঁর এবং অন্য কয়েকজনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণার অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে বলে জানা যায়।

২৭ জুন ১৯৭২ তারিখের খাগড়াছড়ির একটি সিআই প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়, সন্তু লারমা ও অন্যরা দীঘিনালা বাজার, বাবুছড়া বাজার ও নরাইছড়িতে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। সেখানে যেসব স্লোগানের কথা উল্লেখ করা হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:

“বাঙালীর রক্ত নিবা / পাহাড়িরা স্বাধীন হবা।”

“পাহাড়ি অস্ত্র ধরো / বাঙালী পাহাড় ছাড়ো।”

এ ছাড়া দীঘিনালা থানার ১০ জুলাই ১৯৭২ তারিখের একটি প্রতিবেদনের বরাতে সন্তু লারমার নামে একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়:

“Without communism no nation can achieve freedom. Burma is a communist state and will be able to fulfil our aim within a short time and China will help us.”

অর্থাৎ, উদ্ধৃত বক্তব্যের মর্মার্থ হলো—কমিউনিজম ছাড়া কোনো জাতি স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না; বার্মা একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাদের লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করতে পারে; চীনও সাহায্য করবে।

এসব নথির আলোকে সন্তু লারমার রাজনৈতিক অবস্থান, তাঁর সংগঠনের লক্ষ্য এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সেই লক্ষ্য কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে।

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এসব রাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন যোগসূত্র বা বাংলাদেশের ভূখণ্ড বিচ্ছিন্ন করে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনার মতো গুরুতর অভিযোগের পক্ষে অতীতে প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছিলো।

জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য, কৌশল ও অবস্থান এক।

১৭ আগস্ট ও জাতীয় পতাকার প্রশ্ন

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে ১৭ আগস্টকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও স্মৃতিচারণ রয়েছে, সেটিও আলোচনার দাবি রাখে। রাঙামাটিতে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর ভারতীয় পতাকা নামানো বা উত্তোলন-সংক্রান্ত ঘটনার বিবরণ নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্র থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকতে পারে। তাই কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বর্তমান উদ্দেশ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বা প্রতীকী স্মৃতিচারণের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়।

তবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপসের সুযোগ নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো সংগঠন যদি বাংলাদেশের ভূখণ্ডের বিচ্ছিন্নতা বা অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে তা অবশ্যই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক কাঠামোর আলোকে পর্যালোচনা করতে হবে।

আমার মতে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ ভূমিকা পালনের পদ্ধতি হতে হবে আইনসম্মত, কার্যকর ও জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শান্তিচুক্তির পুনর্মূল্যায়ন কি প্রয়োজন?

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতায় ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন, সীমাবদ্ধতা ও ফলাফল নিয়ে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি।

চুক্তির কোনো শর্ত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব বা নাগরিকদের সমান অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে থাকলে, তা প্রমাণ ও আইনগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে চুক্তির সংশোধন বা বাস্তবায়নব্যবস্থায় পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে চুক্তি বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুতর। এ ক্ষেত্রে আইনগত বাধ্যবাধকতা, সাংবিধানিক কাঠামো, স্থানীয় জনগণের অধিকার এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তাগত পরিণতি বিবেচনা করা আবশ্যক।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অভিজ্ঞতা থেকে তুলনামূলক শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। নাগা বিদ্রোহীদের সঙ্গে ১৯৭৫ সালের শিলং চুক্তির পরও সেখানে সংঘাতের অবসান ঘটেনি। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ডের (আইজাক-মুইভা) সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

নাগাল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি এবং বিশেষ নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগও বিতর্কের বিষয়। সশস্ত্র সংঘাত মোকাবিলায় ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব, তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে ভারতের পরিস্থিতির পার্থক্যও বিবেচনায় রাখতে হবে।

শুধু সামরিক উপস্থিতি দিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। একইভাবে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনা না করে সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে দিলেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই।

অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সমাধান, স্থানীয় জনগণের অধিকার এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব—এই চারটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।

উপসংহার

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবি তোলার আগে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

প্রথমত, সেখানে কি সত্যিই স্বাভাবিক জীবন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?

দ্বিতীয়ত, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কি অস্ত্র ত্যাগ করেছে এবং সহিংসতার পথ পরিহার করেছে?

তৃতীয়ত, সেনাবাহিনীর পরিবর্তে দায়িত্ব পালন করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা অন্য কোনো বাহিনীর রয়েছে কি?

চতুর্থত, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি কমানো হলে দুর্গম সীমান্তবর্তী এলাকায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

আমার অবস্থান স্পষ্ট: পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র, সশস্ত্র তৎপরতা, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সহিংসতা অব্যাহত থাকলে সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি বাস্তবসম্মত নয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বেসামরিক প্রশাসনের সক্ষমতা এবং বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তুতি বিবেচনা করেই সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার বা পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সব নাগরিকের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও জরুরি। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি যেন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখে, সেটিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের শাসন এবং সব নাগরিকের সমান অধিকার। এসব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক স্লোগানের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা উচিত নয়।

-সাবেক সেনা কর্মকর্তা। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *