অভাব-অনটন দমাতে পারেনি তাদের - Southeast Asia Journal

অভাব-অনটন দমাতে পারেনি তাদের

“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

অভাব-অনটনের মধ্যেই বড় হয়েছেন সাফ নারী ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের খাগড়াছড়ির তিন ফুটবলার। এর সঙ্গে ছিল লোকজনের নানা টিটকিরি ও অবহেলা। তবে অদম্য এই তিন ফুটবলার ও এক সহকারী কোচকে নিয়ে আনন্দে ভাসছে খাগড়াছড়িবাসী।

প্রথমবারের মতো নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে বাংলাদেশ। গত সোমবার কাঠমুন্ডতে ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারায় লাল-সবুজের দল। আর এই দলে রয়েছেন খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার সাতভাইয়ার পাড়ার যমজ দুই বোন আনাই মগিনী ও আনুচিং মগিনী এবং লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার মরাচেঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা মণিকা চাকমা। তাদের কোচ খাগড়াছড়ি সদরের আপার পেরাছড়ার বাসিন্দা তৃষ্ণা চাকমা।

আনাই মগিনী ও আনুচিং মগিনীর বাবা রিপ্রু মারমাসহ সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় পুরো দেশের পাশাপাশি উচ্ছ্বাসটা একটু বেশি ধরা দিয়েছে পার্বত্য জনপদ খাগড়াছড়িতে। কারণ, তার দুই মেয়েসহ খাগড়াছড়ির তিন খেলোয়াড় ও একজন সহকারী কোচ যে এ জেলার মানুষ।

রিপ্রু মারমা বলেন, ‘পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে সেরা খেলোয়াড় হয় আমার দুই মেয়ে। তখন হাফ প্যান্ট ও গেঞ্জি পরে খেলা নিয়ে আশপাশের লোকজন অনেক টিটকিরি মেরেছে আমাদের। কিন্তু আমরা বুঝতে পারছিলাম আমার মেয়েরা কিছু করতে পারবে। আমরা অভাব-অনটনের কারণে অনেক সময় অনেক আবদার মেটাতে পারিনি। কিন্তু আমার মেয়েদের সাফল্যে সব সময় আমাদের পাশে ছিল স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাড়িতে আসার রাস্তা ছিল না, কালভার্ট ছিল না। প্রশাসন তা করে দিয়েছে। ঘর ভাঙা ছিল, তাও করে দিয়েছে। তবে এখনো পুরোপুরি অভাব দূর হয় নাই। আশা করি আমার এবং আমাদের মেয়েদের পাশে থাকবে প্রশাসন। বঙ্গমাতা ফুটবলের পরে দেশে ও বিদেশে অনেকবার খেলে দেশবাসীকে অনেকবার আনন্দ দিছে। কিন্তু এবার সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ বেশি। এই আনন্দের সীমা নেই। দোয়া করি দেশের হয়ে বিশ্বে ভালো খেলুক আমার মেয়েরা।’

মণিকা চাকমার বাবা বিন্দু চাকমাও নিপ্রু মারমার মতো একই কথা বলেন। তিনি জানান, তার মেয়ে ছোটবেলা থেকে ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতো। এ নিয়ে পাড়ার লোকজন নানা কথা বলতো।

বিন্দু চাকমা বলেন, ‘এত লাঞ্ছনার পরও দমে যায়নি আমার মেয়ে। প্রাইমারি স্কুলে বঙ্গমাতা ফুটবলে ভালো খেলার পর জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার এই মরাচেঙ্গী গ্রামে জেলা প্রশাসকসহ অনেক জনপ্রতিনিধি এসেছেন। আমাদের আর্থিক সহযোগিতা করার পাশাপাশি ঘর করে দিয়েছেন। এখনো আমাদের এলাকায় যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মান ভালো নয়।’

তিনি নিজের ও এলাকাবাসীর উন্নয়নে কাজ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

পার্বত্য ফুটবল একাডেমির ক্রীড়া সংগঠক ও কোচ ক্যাহ্লাচাই মারমা বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বঙ্গমাতা ফুটবল খেলায় দুই বোনের শট ও খেলা দেখে মুগ্ধ হই। তারপর তাদের ফুটবলের ওপর প্রশিক্ষণ দিতে থাকি। ভালো লাগছে আজ তারা বিশ্বমানের খেলোয়াড়। ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। আর সেই এক গোল করেন খাগড়াছড়ির আনাই মগিনী। তখন থেকে তাদের অভাব-অনটন দূর করার জন্য জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সাহায্য করেছে। এবারো তাদের সাফল্যে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক চার লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।’

খাগড়াছড়ি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক জুয়েল চাকমা বলেন, ‘অবহেলা, টিটকিরি, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা এখন আর নেই। এখন সবাই তাদের ভালোবাসে। তবে আনুচিং মগিনী, আনাই মগিনী ও মণিকা চাকমাকে ফুটবলে বিশ্বসেরা করার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু হওয়া বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের অবদান রয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।’

ইতোমধ্যে সাফল্যের জন্য খাগড়াছড়ির তিন ফুটবলার ও এক কোচকে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস চার লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, এসব ফুটবলার শুধু জেলার নয়, পুরো দেশের গর্ব। এভাবেই দেশকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে হবে। তিনি আরও বলেন, যারা দেশের জন্য কাজ করে, দেশের জন্য অবদান রাখে, তারা তো গরিব হতে পারে না। তাদের যারা জন্ম দিয়েছেন, তারাও গরিব হতে পারেন না। তারা ও তাদের জন্মদাতারা সম্মানের দিক থেকে ধনী।

তারপরও অতীতেও প্রশাসন এই ফুটবলারদের পরিবারের পাশে ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতে থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন জেলা প্রশাসক।