পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্বাচনী নীরবতা: শান্তির অভিনয়, না কি রাষ্ট্রের জন্য এক নীরব সতর্কবার্তা?

পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্বাচনী নীরবতা: শান্তির অভিনয়, না কি রাষ্ট্রের জন্য এক নীরব সতর্কবার্তা?

পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্বাচনী নীরবতা: শান্তির অভিনয়, না কি রাষ্ট্রের জন্য এক নীরব সতর্কবার্তা?
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

মোঃ সাইফুল ইসলাম

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এবার এক অস্বাভাবিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বহু বছর ধরে যেখানে নির্বাচন মানেই ছিল আতঙ্ক, হুমকি, সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর দাপট ও সহিংসতার আশঙ্কা, সেখানে এবার দেখা যাচ্ছে এক ধরনের রহস্যজনক নীরবতা। এই নীরবতাকে আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তিকর মনে হলেও, পাহাড়ের ইতিহাস ও বাস্তবতা বলছে, এই শান্তি স্বাভাবিক নয়, বরং গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়।

সাবেক গেরিলা নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) রাঙামাটি ও বান্দরবানে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী প্রচারণামূলক তৎপরতা চালালেও শেষ পর্যন্ত কোনো প্রার্থী দেয়নি। একইভাবে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ খাগড়াছড়িতে সরাসরি কোনো প্রার্থী দেয়নি এবার , এমনকি স্বতন্ত্র পাহাড়ি প্রার্থীদের মধ্য থেকেও কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দেয়নি। নির্বাচনের একেবারে শেষ সময়ে এসেও এই অবস্থান অপরিবর্তিত।

এটি কি রাজনৈতিক ব্যর্থতা, নাকি সচেতন কৌশল? পাহাড়ের বাস্তবতায় সাধারণত এমন সিদ্ধান্ত দুর্বলতা থেকে আসে না। বরং এখানে প্রশ্ন উঠছে, এই সংগঠনগুলো কি ইচ্ছাকৃতভাবেই নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে?

এরই মধ্যে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি শ্যামল চাকমা ওরফে তরুর নেতৃত্বে অন্তত ২০–২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল জেএসএস-এ যোগ দেওয়ার খবর পাহাড়ের সশস্ত্র রাজনীতির ভেতরে বড় ধরনের শক্তি পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর আরেকটি অংশ নতুন কমিটি ঘোষণা করে সংগঠন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে। অর্থাৎ বিভাজন থাকলেও অস্ত্রধারী কাঠামো ভেঙে পড়েনি; বরং নীরবে পুনর্গঠিত হচ্ছে।

আরেকদিকে জেএসএস (এমএন লারমা)সহ চারটি আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী মিলে পাহাড়ে ‘নির্বাচনী ঐক্য’ গঠনের যে আলোচনা ছিল, সেটিও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। প্রকাশ্যে ঐক্য না হলেও, এই ব্যর্থতা কি প্রকৃত বিভক্তির প্রতিফলন-নাকি কেবল প্রকাশ্য রাজনীতির স্তরে একটি পর্দা?

এই সব প্রশ্নের চেয়েও বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো সহিংসতার অস্বাভাবিক অনুপস্থিতি। অতীতের নির্বাচনগুলোতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরা আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হুমকির কারণে প্রচারণা চালাতে পারেননি। কোথাও কোথাও প্রার্থীদের ওপর হামলা, গুলিবর্ষণ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে। পাহাড়ের মানুষ জানে, এসব ছিল প্রায় নিয়মিত দৃশ্য।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রায় দুই মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামের কোথাও আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃঘাতি সংঘর্ষ, গোলাগুলি বা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। অতীতে যেখানে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সংঘর্ষ ছিল নিয়মিত ঘটনা, সেখানে এই হঠাৎ নীরবতা স্বাভাবিক প্রশ্ন তৈরি করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্বাচনী নীরবতা: শান্তির অভিনয়, না কি রাষ্ট্রের জন্য এক নীরব সতর্কবার্তা?

একই সঙ্গে রাঙামাটি ও বান্দরবানের একাংশে গত কয়েকবছর ধরে সন্ত্রাস, অপতৎপরতা ও নৈরাজ্যের জন্য পরিচিত কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)-এর তৎপরতাও হঠাৎ করে কেন যেন চোখে পড়ছে না। এই ‘অদৃশ্য হয়ে যাওয়া’ কি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, নাকি কৌশলগত বিরতি—সেটিও স্পষ্ট নয়।

এই নীরবতা কি কাকতালীয়? নাকি এটি একটি হিসাবি কৌশল?

এখানেই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্নগুলো সামনে আসে। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো রাষ্ট্রীয় ফোকাস। দেশ যখন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে ব্যস্ত, প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর মনোযোগ যখন প্রধানত নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর ওপর গোয়েন্দা ও কৌশলগত নজর কি ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে পড়ছে না?

পাহাড়ের ইতিহাস বলে, রাষ্ট্র যখন অন্যদিকে ব্যস্ত থাকে, ঠিক তখনই সেখানে বড় ধরনের অস্থিরতার বীজ বপন হয়। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনের সময় সহিংসতা থেকে বিরত থেকে কি এসব সশস্ত্র সংগঠন সরকারকে একটি অঘোষিত বার্তা দিচ্ছে? বার্তাটি কি এই যে, পাহাড়ের স্থিতিশীলতা তাদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল?

আরও গভীরভাবে দেখলে এটি এক ধরনের নন-স্টেট পাওয়ার ডেমোনস্ট্রেশন বলেও মনে হতে পারে—যেখানে সহিংসতা না করেই দেখানো হচ্ছে যে, চাইলে পাহাড় শান্ত রাখা যায়, আবার চাইলে অশান্তও করা যায়। এই ধারণা যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বিপজ্জনক ইঙ্গিত।

এই পরিস্থিতিতে সহিংসতা আপাতত না বাড়লেও, বাস্তবে এটি হবে একটি ডি-ফ্যাক্টো স্ট্যাটাস কো। সশস্ত্র সংগঠনগুলো প্রকাশ্যে সক্রিয় না থাকলেও পাহাড়ের ভেতরে তাদের নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি কাঠামো, অস্ত্রধারী নেটওয়ার্ক ও প্রভাব অক্ষুণ্ন থাকবে। রাষ্ট্র হয়তো স্বস্তি পাবে যে বড় ধরনের সহিংসতা হয়নি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি হবে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি—কারণ এতে পাহাড়ে একটি নন-স্টেট পাওয়ার ব্যালান্স নীরবে বৈধতা পাবে। এই দৃশ্যপটে শান্তি থাকবে, তবে তা রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের ফল নয়, বরং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।

নির্বাচন শেষ হওয়ার পর, যখন রাজনৈতিক মনোযোগ রাজধানী ও জাতীয় রাজনীতিতে সরে যাবে, তখন পাহাড়ে নতুন করে আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ পুনর্বিন্যাস ও শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে। প্রকাশ্যে বিভক্ত থাকা সংগঠনগুলো নিজেদের অবস্থান পুনঃনির্ধারণে সহিংস পথ বেছে নিতে পারে।

আরেকটি শঙ্কা আরও গুরুতর। প্রকাশ্যে বিভক্ত থাকলেও, নির্বাচনের সময় সংঘাত এড়িয়ে চলা কি একটি নীরব সমঝোতার ফল? নির্বাচনোত্তর বা নির্বাচন-পরবর্তী নাজুক সময়ে, যখন রাজনৈতিক মনোযোগ সরে যাবে, তখন কি এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পাহাড়ে কোনো অঘোষিত আঞ্চলিক শক্তি কাঠামো বা জোটের দিকে এগিয়ে যাবে?

এই আশঙ্কাকে আরও বাস্তব করে তোলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত বাস্তবতা। ভারত ও মিয়ানমারঘেঁষা এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর গতিবিধির সঙ্গে সংযুক্ত। অতীতে এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে পাহাড়ের কিছু সংগঠনের যোগাযোগের অভিযোগ উঠেছে বারবার। নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক শূন্যতা ও প্রশাসনিক ব্যস্ততাকে কাজে লাগিয়ে কোনো সমন্বিত সহিংস ছক কষা হচ্ছে কি না; এই প্রশ্ন এখন আর অবান্তর নয়।

নির্বাচনী নীরবতাকে তাই সরলভাবে শান্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নির্বাচনে অংশ না নেওয়া মানেই রাজনীতি থেকে সরে যাওয়া নয়। বরং পাহাড়ি বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা গেছে, নির্বাচনী নীরবতার আড়ালেই সশস্ত্র রাজনীতি তার সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ ধারণ করেছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘শান্ত’ ভেবে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। কারণ এই নীরবতা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং অস্ত্রধারীদের কৌশলে নিয়ন্ত্রিত।

প্রসঙ্গত, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকৃত ও টেকসই শান্তি আসে রাষ্ট্রের কার্যকর কর্তৃত্ব, আইনের শাসন এবং সশস্ত্র রাজনীতির স্পষ্ট অবসানের মাধ্যমে। নির্বাচনকালীন স্বস্তিকর পরিবেশ যদি ভবিষ্যতের বড় অস্থিরতার মূল্য চুকিয়ে কেনা হয়, তবে সেটি কোনো সাফল্য নয়, বরং একটি মারাত্মক কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবেই ইতিহাসে লেখা থাকবে। নির্বাচনকালীন ও নির্বাচনোত্তর সময়ে এই অঞ্চলে গোয়েন্দা নজরদারি, নিরাপত্তা সমন্বয় এবং রাষ্ট্রীয় মনোযোগ শিথিল হলে তার মূল্য দিতে হতে পারে গোটা দেশকেই।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *