পাহাড়ে চাঁদাবাজির মচ্ছব, মুখ খোলার সাহস পান না ভুক্তভোগীরা

পাহাড়ে চাঁদাবাজির মচ্ছব, মুখ খোলার সাহস পান না ভুক্তভোগীরা

পাহাড়ে চাঁদাবাজির মচ্ছব, মুখ খোলার সাহস পান না ভুক্তভোগীরা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—পার্বত্য চট্টগ্রামের এই তিন জেলায় চলছে চাঁদাবাজির মচ্ছব। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির আগে যেখানে কেবল একটি পাহাড়ি সশস্ত্র গ্রুপকে চাঁদা দিতে হতো, সেখানে বর্তমানে অন্তত পাঁচটি গোষ্ঠী এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত। মাসিক, ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে আদায় করা এই চাঁদা এখন রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি স্লিপ বা টোকেন দিয়ে আদায় করা চাঁদার হারও বেড়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার ২৬টি উপজেলায় পথে পথে চাঁদাবাজির দাপট চলছে। প্রত্যন্ত দুর্গম গ্রাম থেকে শহরতলি পর্যন্ত সর্বত্র যেন চাঁদার রাজত্ব। ব্যবসায়ী, বাগানমালিক, ঠিকাদার, পরিবহন, বোট-ট্রলার, কৃষিপণ্য এমনকি জায়গা বেচাকেনাও এ থেকে বাদ পড়ছে না। ভুক্তভোগীরাও এ নিয়ে মুখ খোলার সাহস পান না। পাহাড়জুড়ে যেন চলছে একধরনের ‘বোবা চাঁদাবাজি’।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী চাঁদা দিতে না পারলে আমাদের ওপর নানা খড়্গ নেমে আসে। ঠিকাদার হলে শ্রমিক অপহরণ, বাগানমালিক হলে বাগান ধ্বংস করা, পরিবহন হলে রাস্তায় গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া বা কাগজপত্র নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বাধ্য হয়ে চাঁদা দিতে হয়। এসব কিছু আমরা প্রশাসনকে জানাই না। কেননা তখন হিতে বিপরীত হতে পারে।’

পাহাড়ে বর্তমানে মূলত চারটি আঞ্চলিক গ্রুপ সক্রিয়। এগুলো হচ্ছে জেএসএসের সশস্ত্র গ্রুপ, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), জেএসএস (সংস্কার) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। এর বাইরে বান্দরবানে কেএনএফ ও মগ বাহিনীর নামেও কিছু এলাকায় চাঁদাবাজি চলে। এসব সশস্ত্র গ্রুপ তাদের কর্তৃত্বাধীন এলাকায় নিজস্ব কালেকটর ও সাবকালেকটর বসিয়ে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

খাগড়াছড়ি জেলা ও দায়রা জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মঞ্জুর মোর্শেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ চাঁদাবাজি থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ব্যবসায়ী, কৃষক, চাকরিজীবী—সবাইকে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা পরিশোধ করতে হয়। নিয়মিত স্পট, মাসিক, ষাণ্মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে চাঁদা দিতে হয়।’

সরকারি একটি সংস্থার সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শান্তিচুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত তিন জেলায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে বন্দুকযুদ্ধে ১২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। একই সময়ে অপহরণের শিকার হয়েছে ২ হাজার ১১৮ জন।

প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বছরে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বাইরে সরকারি পর্যায়ে অন্তত চারটি প্রতিষ্ঠানকে টোল হিসেবে টাকা দিতে হয়। জেলা পরিষদের বাজার ফান্ড, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও জেলা পরিষদের নামে এসব টোল আদায় করা হয়। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ভুঁইফোড় সংগঠনের নামেও অর্থ আদায় করা হয়।

খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, ‘পাহাড়ে চাঁদাবাজি এত বেশি যে এগুলো রুখে দেওয়া দায়।’ সরকারি একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে প্রান্তিক চাষিদের থেকে বারবার টোল আদায়ের বিষয়ে খোঁজ নেবেন বলে জানান তিনি।

পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও প্রকট। খাগড়াছড়ির একজন কাঠ ব্যবসায়ী জানান, দীঘিনালা থেকে এক ট্রাক কাঠ নিয়ে ঢাকায় রওনা হলে ৫০ হাজার টাকা ট্রাক ভাড়ার বিপরীতে পথে পথে ১ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়। একই চিত্র রাঙামাটির নানিয়ারচর ও লংগদু সড়কে। চাঁদার দাপটে গত বছর খাগড়াছড়ির পাঁচটি উপজেলায় সরকারি খাদ্য সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশ খাদ্য পরিবহন সমিতির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সদস্য ধনা বাবু বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের চাঁদাবাজ গ্রুপগুলো এত বেশি বাড়াবাড়ি করছে, যা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে চাঁদা আদায়, ইনভয়েসসহ কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া, চালকদের মারধর করার কারণে খাদ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে।’

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

চাঁদার থাবায় ব্যাহত হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্পও। গত ফেব্রুয়ারিতে রাঙামাটির নানিয়ারচর-লংগদু সড়ক নির্মাণকাজে চাঁদা না পেয়ে সন্ত্রাসীরা এক্সকাভেটরের ইঞ্জিনে বালু ও চিনি মিশিয়ে সেটি নষ্ট করে দেয়। তাদের দৌরাত্ম্যে কাউখালী ও লামায় কয়েকটি জনগুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজ বন্ধ রয়েছে। গত বছর বর্ধিত চাঁদা দিতে না পারায় কাপ্তাই লেকে মাছ শিকার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় জেলেরা।

রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য মো. হাবিব আজম বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে চার-পাঁচটি গ্রুপের চাঁদাবাজি বেপরোয়া। কোনোভাবেই এগুলো থামানো যাচ্ছে না। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না, সবাইকে চাঁদা দিতে হয়।’

অভিযোগের বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মুখপাত্র ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার দাবি করেন, তাঁর দল এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নেই। টেলিফোনে এ নিয়ে এর বেশি কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে রাঙামাটির পুলিশ সুপার মো. আবদুর রকিব বলেন, ‘আমরা পাহাড়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করি। তবে চাঁদাবাজদের ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই। যদিও পাহাড়ের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন।’

-আজকের পত্রিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *