বান্দরবানে সাংগ্রাই উৎসব ঘিরে দ্বন্দ্ব: দুই কমিটির পাল্টাপাল্টি অবস্থানে বাড়ছে শঙ্কা
![]()
নিউজ ডেস্ক
পার্বত্য অঞ্চলের মারমা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান সামাজিক উৎসব সাংগ্রাই উদযাপনকে ঘিরে বান্দরবানে এবার তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। প্রতিবছর বর্ণাঢ্য আয়োজন ও ব্যাপক অংশগ্রহণে উৎসবটি উদযাপিত হলেও এ বছর একই স্থান ও সময়ে পৃথক দুটি কমিটির কর্মসূচি ঘোষণায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
জানা গেছে, সাংগ্রাই উদযাপনকে কেন্দ্র করে ‘উৎসব উদযাপন পরিষদ’ ও ‘উৎসব উদযাপন কমিটি’—এই দুই পক্ষ আলাদা আলাদা কমিটি গঠন করে শহরের রাজার মাঠে উৎসব আয়োজনের ঘোষণা দেয়। এতে করে মারমা সমাজের অভ্যন্তরে বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও ‘উৎসব উদযাপন পরিষদ’ গত ১৮ মার্চ রাজার মাঠে সাংগ্রাই উদযাপনের ঘোষণা দেয়। তবে এর পরদিন ১৯ মার্চ ‘উৎসব উদযাপন কমিটি’ নামের আরেকটি পক্ষ একই স্থানে উৎসব আয়োজনের ঘোষণা দিলে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। উভয় পক্ষই নিজেদের বৈধ দাবি করে মাঠ ব্যবহারের অধিকার দাবি করছে।

সূত্র জানায়, মাঠ ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে আবেদন করলে বোমাং সার্কেল চিফ ‘উৎসব উদযাপন কমিটি’কে রাজার মাঠ ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করেন। তবে এ সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ ‘উৎসব উদযাপন পরিষদ’। এতে করে দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গত ৩ এপ্রিল। সকালে ‘উৎসব উদযাপন পরিষদ’-এর সভাপতি চনু মং মারমা ও তার অনুসারীরা রাজার মাঠ পরিদর্শন করে প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। একইদিন সন্ধ্যায় ‘উৎসব উদযাপন কমিটি’-এর সভাপতি চথুই ফ্রু-এর নেতৃত্বে অপর পক্ষ মাঠ পরিদর্শনে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বান্দরবানের স্থানীয় সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী।
উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এড়াতে দ্রুত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উভয় পক্ষকে মাঠ ত্যাগের নির্দেশ দেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

‘উৎসব উদযাপন পরিষদ’-এর সভাপতি চনু মং মারমা অভিযোগ করেন, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে হঠাৎ অপর পক্ষ মাঠে গিয়ে অবস্থান নেয় এবং তাদের কয়েকটি পতাকা সরিয়ে ফেলে। তিনি বলেন, “আমরা কোনো সংঘাতে জড়াইনি, কারণ এতে বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারত।”
তিনি আরও দাবি করেন, কমিটির মেয়াদ চলমান থাকা অবস্থায় নতুন কমিটি গঠন সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি একটি ‘মনগড়া উদ্যোগ’। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর আশঙ্কাও প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে ‘উৎসব উদযাপন কমিটি’-এর সভাপতি চথুই ফ্রু বলেন, তারা বৈধভাবে মাঠ ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছেন এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ৮ এপ্রিল থেকে বর্ণাঢ্য আয়োজনে সাংগ্রাই উদযাপন করবেন। তিনি দাবি করেন, তাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক এবং সব জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
এদিকে মারমা সমাজের জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা পরিস্থিতি সমাধানে উদ্যোগ নিলেও এখনো পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি।

‘উৎসব উদযাপন পরিষদ’-এর সাবেক সভাপতি ও জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অংচ মং মারমা বলেন, “দুটি কমিটি হওয়ায় সমাজে বিভেদ তৈরি হয়েছে। আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি, তবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে বৈঠক না হওয়ায় অগ্রগতি হচ্ছে না।”
সাংগ্রাই উৎসব মারমা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী উৎসব, যেখানে জলকেলি (মৈত্রী পানি বর্ষণ), বুদ্ধমূর্তি স্নান, পিঠা তৈরি এবং নানা সামাজিক-ধর্মীয় আচার পালিত হয়। প্রতিবছর এ উৎসব পার্বত্য অঞ্চলে সম্প্রীতি ও মিলনের বার্তা নিয়ে আসে।
তবে চলমান এই দ্বন্দ্বের কারণে উৎসবের স্বাভাবিক আয়োজন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত সমঝোতা না হলে এটি মারমা সমাজে দীর্ঘমেয়াদি বিভেদের কারণ হতে পারে এবং সামগ্রিক সামাজিক সম্প্রীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।