পাহাড়ে শুরু হলো বর্ষবরণ উৎসব বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা
![]()
নিউজ ডেস্ক
রাঙামাটি পার্বত্য জেলার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে পাঁচ দিনব্যাপী বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান ও চাংলান এবং বাংলা নববর্ষ উৎসবের উদ্বোধন সোমবার বিকেলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, পাহাড়ে ১৩টি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী বর্ষবরণের জন্য এই উৎসব পালন করে। “সবার অধিকার রক্ষায় সরকার কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন—সমতল বা পাহাড় কোথাও বৈষম্য থাকবে না,” তিনি বলেন।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পিছিয়ে থাকলে সমগ্র বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে। প্রতি বছর পাহাড়ের মানুষ এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে। বিজু উৎসবের মাধ্যমে সকল সম্প্রদায়ের মিলনমেলা গড়ে ওঠে, যা পাহাড়ের ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে পরিগণিত।

তিনি অনুরোধ জানান, প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব নাম ব্যবহার করা হোক—চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই, ত্রিপুরাদের বৈসু, তংচংঙ্গাদের বিষু, ম্রো ও চাকদের চাংক্রান। বাঙালির নববর্ষও মিলেমিশে পাহাড়ের এই প্রাণবন্ত উৎসবকে এক মহোৎসবে পরিণত করেছে।
বাংলা বছরকে বিদায় ও বরণকে কেন্দ্র করে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি এখন উৎসবমুখর। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম এই সামাজিক অনুষ্ঠান ঘিরে ব্যস্ত এখন শহর, নগর আর পাহাড়ি পল্লীগুলো।

উৎসবকে কেন্দ্র করে বিকেলে রাঙামাটি সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোষাক পরে অংশগ্রহণ করেন।
পরে সেখানে ফিতা কেটে পাঁচ দিনব্যাপি আয়োজিত মেলার উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান এমপি। এরপর উপস্থিত অতিথিরা বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে মেলার আনুষ্ঠানিকতা উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সম্প্রীতি নৃত্য পরিবেশন করা হয়।

উৎসবের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার বিকেলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গনে সূচনা হয়েছে সাত দিনব্যাপি মেলার। যেখানে বাহারি রঙের ঐতিহ্যবাহি পোষাকে উপস্থিত হয় পাহাড়ের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ। বাদ যায়নি বাঙালিরাও। যা পরিণত হয় এক সম্প্রীতির মিলন মেলায়।
মেলায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোষাক, হাতে বোনা কাপড়, ব্যাগ ও নানান হস্তশিল্পের স্টল বসানো হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার সভাপতিত্ব করেন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ চাকমা, রাঙামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক, জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, সদর জোন অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মো. একরামুল রাহাত এবং পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব।
এসময় রাঙামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, পাহাড়ের সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রেখে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি সন্ত্রাসী দলের উদ্দেশে বলেন, “আমরা যুদ্ধ নয়, শান্তিতে বিশ্বাসী। আসুন অস্ত্র জমা দিয়ে আলোচনায় ফিরে আসি। আলোচনা করে দেখি দেশ ও পার্বত্য অঞ্চলকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, কীভাবে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করা সম্ভব।”

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার বলেন, পার্বত্যাঞ্চলে ১৩ ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারী। কাউকে পিছিয়ে রেখে নয়, সব সম্প্রদায়কে একত্রিত করে এগিয়ে যেতে হবে। মেলার মাধ্যমে ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়াই প্রধান লক্ষ্য।
পাঁচ দিনব্যাপী মেলায় আরও ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, পিঠা উৎসব, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মঞ্চ নাটক অনুষ্ঠিত হবে। মেলা আগামী ১০ এপ্রিল শেষ হবে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন।

এরপর ৯ এপ্রিল থেকে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু, সাংক্রাই, চাংক্রান এবং পাতা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে চার দিনব্যাপী নানান ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান শুরু হবে। মেলার সমাপনী হবে ১৭ এপ্রিল মারমা সংস্কৃতি সংস্থার সাংগ্রাই জলোৎসবের মাধ্যমে।
এই উৎসব পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও একতা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মাইলফলক হিসেবে পরিগণিত।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।