রাঙামাটিতে বর্ষবরণ উৎসবে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা দিলেন সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক
![]()
নিউজ ডেস্ক
রাঙামাটি পার্বত্য জেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে সোমবার বিকেলে আয়োজিত পাঁচ দিনব্যাপী বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান ও চাংলান এবং বাংলা নববর্ষ উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩০৫ পদাতিক ব্রিগেড ও রাঙামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক।
তিনি উক্ত অনুষ্ঠানে পাহাড়ের জনগণকে শান্তি, সম্প্রীতি এবং একতা রক্ষার আহবান জানান।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, “সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ। অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা ও প্রাণের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের এই স্বাধীনতা। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন কুচক্রি মহল আমাদের সার্বভৌমত্বে ব্যাঘাত ঘটানোর চেষ্টা করেছে। তবে আমরা শান্তি ও সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী নাগরিকরা সহাবস্থানে বসবাস করছি।”
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ে বর্ষবরণ উৎসব কোনো নির্দিষ্ট গোত্র বা জাতির উৎসব নয়। “কোনো সামরিক কর্মকর্তা নয়, রাঙামাটি বাসীর একজন হয়ে আমি বিশ্বাস করি এটি আমাদের পাহাড়ের প্রাণের অনুষ্ঠান। এটি প্রকৃতি ও নববর্ষকে বরণ করার উৎসব। নাচ-গান, পানি উৎসবের মাধ্যমে আমরা পারস্পরিক বিভেদ ও বৈষম্য ভুলে এই অনুষ্ঠান উদযাপন করি। আশা করি, এ উৎসব সকল ধর্ম, গোত্র ও বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একত্রিত করবে। আমরা একের বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়াব, একের সুখে একসাথে উদযাপন করব।”
জাতিগত ও গোত্রভিত্তিক বিভেদের প্রসঙ্গেও তিনি সতর্ক করে বলেন, “এই বিভেদের জন্য আমরা কিছুটা অনগ্রসর। অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত, শিক্ষা ও চিকিৎসার দিক থেকে আমরা বঞ্চিত। এখন সময় এসেছে, আমরা সবাই মিলিত হয়ে সব বিভেদ ভুলে একে অপরের সহায়তায় রাঙামাটি ও পার্বত্য অঞ্চলকে এগিয়ে নেব।”

বিশেষভাবে পাহাড়ে সক্রিয় আঞ্চলিক উপজাতিভিত্তিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলগুলোর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আমরা যুদ্ধ নয়, শান্তিতে বিশ্বাসী। আশা করি, আপনারা দ্রুত আপনাদের ভুল বুঝবেন, অস্ত্র জমা দিয়ে আলোচনার পথে আসবেন। আলোচনা করে দেখি কীভাবে দেশ, রাঙামাটি ও পার্বত্য অঞ্চলকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া যায়, কীভাবে অর্থনৈতিক মুক্তি পাওয়া সম্ভব এবং পরবর্তী প্রজন্মকে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত করা যায়।”
তিনি উপস্থিত সকলকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “আজকের অনুষ্ঠানে সাজানো সব ফুলের গন্ধ প্রতিটি পরিবারকে বিমোহিত করুক, প্রতিটি গোত্র ও জাতির সংকীর্ণতা দূর হোক। সাংগ্রাইয়ের পানির ছিটা পাহাড়ের সকল বিভেদ দূর করুক।”
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ চাকমা, জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, সদর জোন অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মো. একরামুল রাহাত এবং পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব।
প্রধান অতিথি বলেন, আগে শুধু তিনটি সম্প্রদায়ের অক্ষর দিয়ে বিজুটা পালিত হতো। কিন্তু বর্তমান সরকার চায় সব জনগোষ্ঠী তাদের স্ব স্ব উৎসব স্ব স্ব নামে পালন করুক। এটা তাদের অধিকার, সেই অধিকার কেড়ে নেয়া উচিত নয়। এগুলো তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়। এসব থেকে তাদের বঞ্চিত রাখা যাবে না।
প্রধান অতিথি আরো বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মেসেজ হচ্ছে কোনো জায়গায় বৈষম্য থাকবে না, সমতল হোক আর পাহাড় হোক। পার্বত্য চট্টগ্রাম পিছিয়ে থাকলে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে।’
সভাপতির বক্তব্যে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার বলেন, পার্বত্যাঞ্চলে ১৩ ভাষাভাষীর জাতিসত্তা রয়েছে, তাদের রয়েছে সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ইতিহাস। কাউকে পিছিয়ে রেখে নয়, সব জাতিসত্তাকে একত্রিত করে এগিয়ে যেতে হবে।
উৎসবের অংশ হিসেবে বিকেলে রাঙামাটি সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় পাহাড়ি বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা ঐতিহ্যবাহী পোষাক পরিধান করে অংশ নেন। ফিতা কেটে পাঁচ দিনব্যাপী মেলার উদ্বোধন করেন পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান।
উৎসবের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার থেকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে সাত দিনব্যাপী মেলার সূচনা হয়েছে। বাহারি রঙের ঐতিহ্যবাহী পোষাকে পাহাড়ের মানুষ অংশগ্রহণ করছে, যেখানে বাঙালিরাও সমন্বয় ঘটাচ্ছে। আগামী ৯ এপ্রিল থেকে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু, সাংক্রাই, চাংক্রান ও পাতা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে চার দিনব্যাপী নানান ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
মেলার সমাপনী অনুষ্ঠান ১৭ এপ্রিল মারমা সংস্কৃতি সংস্থার সাংগ্রাই জলোৎসবের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে।
উৎসব ও সেনা কর্মকর্তার বার্তা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সম্প্রীতি ও সামাজিক সংহতির মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।