পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম ধাপে ভোট কাল
![]()
নিউজ ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ আগামীকাল বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল শুরু হবে। নির্বাচন কমিশন শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ ভোট নিশ্চিত করতে রাজ্যজুড়ে বেশ কিছু কঠোর বিধিনিষেধ জারি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মদের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা, মোটরসাইকেল চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যটন শহর দিঘা থেকে পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ। প্রথম ধাপে মোট ১৫২টি আসনে ভোট হবে। দ্বিতীয় ও শেষ ধাপে ভোট ২৯ এপ্রিল। ৪ মে ভোট গণনা ও ফল প্রকাশ হবে। এর মধ্যেই প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি এবং অন্যান্য দলগুলো নানা ইস্যুতে প্রচার চালিয়ে গেছে।
নির্বাচনে কী হবে?
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন হলো রাজ্যের ২৯৪টি আসনের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এই নির্বাচনের মাধ্যমে রাজ্যটির নতুন সরকার গঠিত হবে। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে দুই প্রধান শক্তি, বর্তমান শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এবং প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর মধ্যে। কোনও দল বা জোট যদি ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৪৮টি বা তার বেশি আসনে জয়লাভ করে, তাহলে তারাই সরকার গঠন করবে।
বিজয়ী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা বা নেত্রী পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টানা চতুর্থ বারের জন্য জয়লাভের লক্ষ্যে প্রচারণা চালাচ্ছেন
যদি বিজেপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়, তবে এটি হবে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম হিন্দুত্ববাদী আদর্শের সরকার। এমনটি হলে তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হবে । অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস পুনরায় জয়ী হলে তাদের শাসন অব্যাহত থাকবে।
দুই ধাপের ভোটের সূচি
পশ্চিমবঙ্গে মোট ২৯৪টি বিধানসভা আসন। নির্বাচন হবে দুই ধাপে।
প্রথম ধাপ: ২৩ এপ্রিল ১৫২টি আসনে ভোট হবে। এই ধাপে ভোট হবে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে: কুচবিহার, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, মালদা, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর। এছাড়া দক্ষিণবঙ্গের বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া ও হুগলি জেলার কয়েকটি আসনে ভোট হবে। মোট ভোটার প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ।
দ্বিতীয় ধাপ: ২৯ এপ্রিল ১৪২টি আসনে ভোট হবে। এর মধ্যে রয়েছে কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া।
ভোট গণনা ও ফল প্রকাশ: ৪ মে
আলোচনায় যেসব আসন
নন্দীগ্রাম: এখানে তৃণমূলের পবিত্র কর লড়ছেন বিজেপির শুভেন্দু অধিকারের বিরুদ্ধে। ২০২১ সালে শুভেন্দু এখানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, শুভেন্দু এবার ভবানীপুর থেকেও প্রার্থী হয়েছেন, যা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহ্যবাহী আসন।
খড়গপুর সদর: বিজেপির দিলীপ ঘোষ লড়ছেন তৃণমূলের প্রদীপ সরকারের বিরুদ্ধে।
আসানসোল দক্ষিণ: তৃণমূলের তাপস ব্যানার্জির প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির আগ্নিমিত্রা পাল।
বহরমপুর: কংগ্রেসের অধীর রঞ্জন চৌধুরী এমএলএ হয়ে ফিরতে চান। তার বিপক্ষে বিজেপির প্রার্থী সুব্রত মৈত্র।
মালদহ: তৃণমূলের কৃষ্ণা কল্যাণীর মুখোমুখি হচ্ছেন বিজেপির কৌশিক চৌধুরী।
এছাড়া সাগর, রায়গঞ্জ, বলরামপুর, পানিহাটি, জয়নগর, বরানগর, রানাঘাট উত্তর ও দক্ষিণ, চাঁপদানি, জঙ্গলমহল ও দুর্গাপুর পশ্চিম আসনে লড়াই হতে পারে হাড্ডাহাড্ডি।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক
রাজ্যে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৭ কোটি হলেও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় প্রায় ৬৩.৬৬ লাখ নাম বাদ পড়েছে। আরও প্রায় ৬০ লাখ নাম যাচাইাধীন, যার মধ্যে ৩২.৬৮ লাখ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৮৯ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। উত্তর ২৪ পরগনা, মালদা ও মুর্শিদাবাদে এই সংখ্যা সর্বাধিক।
গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু
প্রচারের শেষ দিনগুলোতে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি নির্দিষ্ট কয়েকটি ইস্যুতে জোর দিয়েছে।
নারী ইস্যু: বিজেপি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার তৃণমূলকে নারী বিশ্বাসঘাতক বলে আখ্যা দিয়েছেন, কারণ তারা সংসদে নারী সংরক্ষণ বিলের বিরোধিতা করেছিল। তিনি বলেছেন, বাংলার নারীরা তৃণমূলকে শাস্তি দেবেন। বিজেপি ক্ষমতায় এলে ‘মাতৃ শক্তি ভরসা কার্ড’ চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার অধীনে নারী পাবেন বছরে ৩৬ হাজার টাকা। অন্যদিকে তৃণমূলের ‘লক্ষ্মী ভাণ্ডার’ প্রকল্পে সাধারণ নারী পাচ্ছেন ১৫০০ ও এসসি-এসটি নারীরা ১৭০০ টাকা মাসে।
অনুপ্রবেশ ও পরিচয়: প্রধানমন্ত্রী মোদি অভিযোগ করেছেন, তৃণমূল অনুপ্রবেশকারীদের সরকার গড়তে চায় এবং বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতি বদলে দিতে চায়। জবাবে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ‘কাটমানি’ নিয়েছে এবং দুর্নীতি করেছে। তিনি সব বিরোধী দলকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে হটানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
দুর্নীতি ও শাসন: তৃণমূলের বিরুদ্ধে স্কুল চাকরির জালিয়াতি, সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে বিজেপি। অন্যদিকে তৃণমূল বিজেপির শাসন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যবহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, এত কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পর্যবেক্ষক তিনি আগে কখনও দেখেননি।
ভোটের জরিপ কী বলছে?
বিভিন্ন জনমত জরিপে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা যে তীব্র হবে, তা স্পষ্ট। কিছু জরিপে তৃণমূলের ভোট হতে পারে প্রায় ৪১-৪৩ শতাংশ এবং বিজেপির ৩৪-৪১ শতাংশের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আসন পূর্বাভাস অনুযায়ী তৃণমূল ১৮৪ থেকে ১৯৪টি আসন পেতে পারে, যেখানে বিজেপি পেতে পারে ৯৮ থেকে ১০৮টি আসন। ফলে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তৃণমূলের সামনে।
মুখ্যমন্ত্রী পদে পছন্দের নিরিখেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এগিয়ে। জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪৬-৪৮ শতাংশ মানুষ তাকেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান, যেখানে শুভেন্দু অধিকারীর সমর্থন ৩৩-৩৫ শতাংশের মধ্যে।
ভোটের দিনে বিধিনিষেধ
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদার করতে একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০ এপ্রিল থেকে প্রথম দফার এলাকায় মদ বিক্রি ও সেবন বন্ধ, যা চলবে ২৩ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত। দ্বিতীয় দফার জন্য ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত একই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
ভোট গণনার দিন ৪ মে-তেও মদের দোকান বন্ধ থাকবে। রাতের বেলায় বাইক চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া দিনে চালকের পিছনে যাত্রী বহনে নিষেধাজ্ঞা। ভোটের দিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আংশিক ছাড় থাকবে। পূর্ব মেদিনীপুর প্রশাসন দিঘার হোটেলগুলোকে বাইরের পর্যটকদের বুকিং বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। ইতোমধ্যে পর্যটকদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে অপ্রয়োজনীয় ভিড় ও সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এড়ানো যায়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।