শুকিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি জীবনের জলধারা: বাঘাইছড়ির শতাধিক গ্রামে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট
![]()
নিউজ ডেস্ক
রাঙামাটি পার্বত্য জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। ঝিরি, ঝর্না ও ছড়া শুকিয়ে যাওয়ায় উপজেলার শতাধিক গ্রামের প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ বর্তমানে পানির জন্য চরম ভোগান্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক উৎসের ওপর নির্ভরশীল এসব এলাকার বাসিন্দারা এখন কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েও প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কাচালং বাজার, মোস্তফা কলোনী, টিএনটি কলোনি, মডেল টাউন, জীবতলী, কচুছড়ি, ৪ কিলো নোয়া আদাম, মুসলিম ব্লক, প্রশিক্ষণ টিলা বাঙালী পাড়া এবং সাজেকসহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় এই সংকট সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে। এসব অঞ্চলের অধিকাংশ গ্রাম সমতল এলাকা থেকে এক থেকে দুই হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় এখানে নলকূপ বা রিংওয়েল স্থাপন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয়রা ঝিরি, ঝরনা ও ছড়ার পানির ওপরই নির্ভরশীল ছিলেন।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপরিকল্পিত জুম চাষ এবং নির্বিচারে বন উজাড়ের কারণে পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বনভূমি ধ্বংস হওয়ায় বৃষ্টিপাত কমে গেছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলোতে, যার ফলে অধিকাংশ ঝিরি-ঝরনা ইতোমধ্যেই শুকিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে সাজেক ইউনিয়নের ৯ নম্বর পাড়া, ৮ নম্বর পাড়া শিয়ালদাই, হাচ্ছেপাড়া, অরুনপাড়া ও লংকরসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পানির জন্য চরম হাহাকার বিরাজ করছে। ৩০ থেকে ৫০টি পরিবার নিয়ে গঠিত এসব গ্রামে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পানিও জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারকে দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করেও পানি না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।

স্থানীয় কারবারি ভুজন ত্রিপুরা ও বাসিন্দা লক্ষ্মীবালা চাকমা জানান, কয়েক বছর আগেও সারা বছর ঝরনায় পানি পাওয়া যেত। কিন্তু গত ৮-১০ বছরে জুম চাষের বিস্তার এবং গাছপালা উজাড় হওয়ার ফলে পানির সংকট ক্রমাগত বাড়ছে। চলতি বছরের মার্চের শেষ দিক থেকেই পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে শুরু করেছে।
সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা বলেন, “আগে পাহাড়ি ঝরনাগুলোতে সারা বছর পানি থাকত, এখন আর সে অবস্থা নেই। বন উজাড় হওয়ায় পানি ধরে রাখার সক্ষমতা কমে গেছে, ফলে সংকট বেড়েছে।”

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে এসব এলাকায় প্রচলিত পানির সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী রুশো খিশা মুঠোফোনে বলেন, “এসব এলাকায় টেকসই পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দাতা সংস্থার সহায়তা প্রয়োজন। আগে ঘন বন থাকায় পানি ধরে রাখা সম্ভব হতো, কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে।”
এ বিষয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান বলেন, “অবাধ জুম চাষ ও বন উজাড়ের ফলে পানির স্তর কমে গেছে। বৃষ্টিপাত কম হওয়াও একটি বড় কারণ। বৃষ্টি শুরু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।”

এদিকে পানির তীব্র সংকটের কারণে অনেক পরিবার এখন বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার কথাও ভাবছে, যা এই অঞ্চলের সামাজিক ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা এবং বন সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।