স্বীকৃতি না পেয়ে ‘রুবি প্রচারণায়’ ঝুঁকেছেন মিন অং হ্লাইং, সমালোচকদের তোপে জান্তা সরকার
![]()
নিউজ ডেস্ক
ব্যাপক সমালোচিত নির্বাচনের মাধ্যমে এপ্রিলের শুরুতে নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে ব্যর্থ হয়ে অভ্যন্তরীণ সমর্থন জোগাড়ে মরিয়া হয়ে উঠেছেন মিয়ানমারের জান্তা নেতা মিন অং হ্লাইং। তবে বাস্তব সংস্কার বা সংকট নিরসনের পরিবর্তে তার শাসনের প্রথম ১০০ দিনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে একটি প্রচারণা—বিশাল আকৃতির একটি রুবি (পদ্মরাগ মণি) ঘিরে।
শুক্রবার জান্তা নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, মান্দালয় অঞ্চলের মোগোকে একটি বিশাল রুবি আবিষ্কৃত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত ছবিতে মিন অং হ্লাইং, দুই ভাইস-প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্টের স্পিকার, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং নতুন সেনাপ্রধান ইয়ে উইন ওও-কে পাথরটির দিকে গম্ভীরভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়—যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত দেশে এটি তাৎক্ষণিক কোনো অলৌকিক পরিবর্তন আনবে।
ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমারে রুবিকে সৌভাগ্যবান শাসকের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অতীতে সামরিক শাসক স মং, থান শে, মং আয়ে এবং খিন নিয়ুন্ট এই ধরনের কুসংস্কারকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের শাসন বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মিন অং হ্লাইংও এর ব্যতিক্রম নন। ২০২২ সালে অভ্যুত্থানের এক বছর পর তিনি আরেকটি বিরল রুবি প্রদর্শন করেন, যা নিয়ে জান্তা-ঘনিষ্ঠ প্রচারমাধ্যম দাবি করে এটি তার “মহত্ত্বের প্রমাণ” এবং তাকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করে।
জান্তা গণমাধ্যম এবার দাবি করছে, ১১ হাজার ক্যারেটের এই রুবিটি মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী নববর্ষের পর এবং তথাকথিত “স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন”-এর পর আবিষ্কৃত হয়েছে, যেখানে “গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত” জেনারেলরা ক্ষমতায় এসেছে। তারা এটিকে অতীতের সব রুবির চেয়ে মূল্যবান বলে প্রচার করছে—বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে থান শুয়ের সময় পাওয়া রুবির চেয়েও—এর রং ও স্বচ্ছতার কারণে। জান্তা বয়ানে এটি শুধু একটি রত্ন নয়, বরং মিন অং হ্লাইং তার পূর্বসূরিদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ—এরই প্রমাণ।
জান্তা-ঘনিষ্ঠ লবিস্টরা আরও দাবি করছে, যখন মোগোক এলাকা জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন Ta’ang National Liberation Army-এর নিয়ন্ত্রণে ছিল, তখন রুবিটি মাটির নিচেই ছিল। পরে এক রাজা ক্ষমতায় আসার পরই এটি আবিষ্কৃত হয়। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি অপারেশন ১০২৭-এর দ্বিতীয় ধাপে টিএনএলএ মোগোক দখল করলেও চীনের চাপে গত বছরের শেষ দিকে তারা এলাকা ছেড়ে দেয়।
সমালোচকদের মতে, এই রুবি প্রচারণা মূলত মিন অং হ্লাইংয়ের ব্যক্তিগত অহংকারের প্রতিফলন। পূর্বসূরিদের মতো তিনিও নিজেকে একটি সাদা হাতির মালিক ঘোষণা করেছেন—যা দেশটিতে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বসা বুদ্ধ মূর্তি নির্মাণ এবং জাঁকজমকপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজনের মাধ্যমে নিজেকে ধর্মের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। কয়েকদিন আগেই তিনি ইয়াঙ্গুনে ষষ্ঠ বৌদ্ধ সম্মেলনের ৭০তম বার্ষিকী উদযাপন করেছেন।
মোগোকের রুবিকে ঘিরে প্রচারণার পাশাপাশি জান্তা সমর্থকরা আরেকটি “শুভ লক্ষণ” সামনে এনেছে—শ্বেডাগন প্যাগোডা-এর কাছে একটি বটগাছ। মারাভিজয়া প্যাগোডা প্রাঙ্গণে থাকা গাছটির পাতা প্রায় সম্পূর্ণ হলুদ হয়ে গেছে। যদিও শুষ্ক মৌসুমে এমন ঘটনা স্বাভাবিক, তবুও জান্তা-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম এটিকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও “সোনালি ভবিষ্যৎ”-এর পূর্বাভাস হিসেবে প্রচার করছে।
এ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সাক্ষাৎকার সাজিয়ে প্রচার করা হচ্ছে যে এটি মিন অং হ্লাইংয়ের শাসনের জন্য এক ধরনের ‘দৈব সমর্থন’।
জান্তা সরকার যখন তাদের শাসনের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য মরিয়া, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি রসিকতাও ছড়িয়ে পড়েছে—আরেকটি সাদা হাতি শিগগিরই দেখা দেবে, তবে তা কোনো পুণ্যের ফল নয়, বরং শাসকের অহংকারের প্রতিফলন।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।