পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে আলোচনা সভা
![]()
নিউজ ডেস্ক
পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি উদ্ভূত বিভিন্ন হুমকি এবং চলমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক বিশদ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (১১ মে) চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস স্টুডেন্ট পলিসি ফোরাম-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সমন্বয়ক রাসেল মাহমুদ এবং সঞ্চালনা করেন মুখপাত্র রিয়াজুল হাসান।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পাহাড়ে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে নিয়ে অপপ্রচার এবং বিদেশি শক্তির সংশ্লিষ্টতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
প্রধান অতিথি বিচারপতি (অব.) মো. ফারুক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন ১৯০০ এবং বিদ্যমান কিছু বিতর্কিত আইনি কাঠামোর কারণে সেখানে বসবাসরত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাঙালি জনগোষ্ঠী তাদের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, শান্তিচুক্তির আগে ও পরে হাজার হাজার নিরীহ বাঙালি এবং সেনাবাহিনীর সদস্য আত্মত্যাগ করেছেন। পাশাপাশি আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বার্ষিক প্রায় ৭০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে কিছু সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত অপপ্রচার পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষ অতিথি বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. আব্দুল্লাহ আল ইউসুফ বলেন, সরকার পার্বত্য অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান এবং পর্যটন খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এত উন্নয়নের পরও একটি গোষ্ঠীর দেশবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
বক্তারা বলেন, বর্তমান বিশ্বে শুধু তথ্য নয়, “ন্যারেটিভ যুদ্ধ”ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে বিভিন্ন পক্ষ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভিন্ন ভিন্নভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। মানবাধিকার, নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি, আদিবাসী পরিচয় এবং আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয়গুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করছে।
তারা আরও বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। ভূমি বিরোধ, প্রশাসনিক জটিলতা, আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং উন্নয়ন কার্যক্রম—সব মিলিয়ে একটি বহুস্তরীয় বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু অনেক সময় এসব বিষয় একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। এজন্য দায়িত্বশীল গণমাধ্যম, তথ্যনির্ভর গবেষণা এবং ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—
১. পার্বত্য শান্তিচুক্তির পুনর্মূল্যায়ন
২. ১৯০০ সালের শাসনবিধি আইন পুনর্বিবেচনা
৩. স্বায়ত্তশাসনের নামে অস্থিতিশীলতা প্রতিহত করা
৪. জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফের চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
৫. একচেটিয়া ভূমি আইন বাতিল
৬. এনজিও ও বিদেশি দাতা সংস্থার কার্যক্রমে নজরদারি বৃদ্ধি
৭. বিদেশে অপপ্রচার প্রতিরোধে আইনানুগ ব্যবস্থা
৮. আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন নিশ্চিত করা
৯. সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি ও অপপ্রচার প্রতিরোধ
১০. ১৩টি জাতিগোষ্ঠীর সকল মানুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করা
অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাছুম, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী, কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন, পার্বত্য নিউজ সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ, মেজর (অব.) জাকির হোসাইন, সাংবাদিক ও গবেষক এইচ এম ফারুক, সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক মো. মোস্তফা আল ইহযায, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শেখ আদনান ফাহাদ, কর্নেল (অব.) মো. আইয়ুব, এস এম জহিরুল ইসলাম, শাহ সুফি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল হান্নান আল হাদী, শেখ আহম্মদ রাজু, ইঞ্জিনিয়ার শাহাদাৎ ফরাজী সাকিব, জিয়াউল হক, সাংবাদিক নেতা তাইজুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন রেদওয়ান সিকদার, মিলন মল্লিক ও সেলিম রেজা বাচ্চুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিবৃন্দ।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের আলোচনা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করবে এবং একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমঅধিকারভিত্তিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।