পাতিল ভরা আতপ চালের ভাত খায় মাটিরাঙ্গার ১১০০ কেজির ‘সম্রাট’, দাম ১২ লাখ!
![]()
নিউজ ডেস্ক
উঠানে মধ্যবয়সী এক লোক বড় পাতিলে করে ভাত রান্না করছেন। ধোঁয়া ওঠা সেই সুগন্ধি ভাত দেখে যে কেউ হয়তো ভাববেন কোনো মেজবান বা বড় পারিবারিক অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে। কিন্তু না! এই এলাহী কান্ড কোনো মানুষের জন্য নয়, বরং রাজকীয় এক পশুর রাজভোগের প্রস্তুতি। যার জন্য এই আয়োজন, তার নাম ‘সম্রাট’।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মাটিরাঙ্গা জুড়ে এখন আলোচনার তুঙ্গে রয়েছে কালো-সাদার মিশ্রণে বিশাল আকৃতির এই ফ্রিজিয়ান জাতের ষাঁড়টি। বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব সোলায়মান শেঠের মালিকানাধীন মাটিরাঙ্গা বাজারের পাশেই অবস্থিত ‘শেঠ এগ্রো ফার্মস লিমিটেড’-এ পরম যত্ন ও প্রাকৃতিক উপায়ে বড় হচ্ছে এই সম্রাট। আসন্ন কোরবানির ঈদে সম্রাটকে বিক্রির জন্য প্রস্তত করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

খামারিরা জানান, প্রায় আড়াই বছর আগে চট্টগ্রামের একটি ডেইরি ফার্ম থেকে এই ফ্রিজিয়ান জাতের বাছুরটি কিনে আনা হয়। দীর্ঘ ৩০ মাসেরও বেশি সময় ধরে মাটিরাঙ্গার এই খামারে রাজকীয় যত্নে লালন-পালন করার পর আজ সে সত্যি সত্যিই পশুর রাজ্যে সম্রাট হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ষাঁড়টির ওজন প্রায় ১১০০ কেজি (২৭.৫ মণ)। বিশাল দেহের এই সম্রাটের কপালে রয়েছে কালো ও সাদার এক অসাধারণ মিশ্রণ, যা তার সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দানবীয় এই আকৃতি স্বচক্ষে দেখতে প্রতিদিন মাটিরাঙ্গা বাজারের সোনালী ব্যাংকের পিছনে এই ফার্মে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন।
সম্রাটের খাওয়া-দাওয়া আর পরিচর্যার গল্পটাও বেশ চমৎকার। কোনো ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা রাসায়নিক ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে বড় করা হয়েছে তাকে। তার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় থাকে খড়, কাঁচা ঘাস, দানাদার খাবার, ছিটাগুড়, খৈল, গম ও ছোলা ভুষিসহ দেশীয় খাবার, সবুজ ও পুষ্টিকর ভুট্টার ঘাস।

তবে সম্রাটের সবচেয়ে প্রিয় খাবার হলো সুগন্ধি আতপ চালের গরম গরম ভাত। প্রতিদিন শুধু তার খাবারের পেছনেই খরচ হয় প্রায় ২ হাজার টাকা। বিশাল দেহের অধিকারী হলেও সম্রাট স্বভাবের দিক থেকে অত্যন্ত শান্তশিষ্ট ও আদুরে।
সম্রাট-কে সুস্থ, সবল ও পরিচ্ছন্ন রাখতে খামারে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন তিনজন দক্ষ শ্রমিক। গরমের তীব্রতা থেকে স্বস্তি দিতে প্রতিদিন নিয়মিত তিন বেলা গোসল করানো হয় তাকে। পাশাপাশি খামারের খোলা পরিবেশে তার স্বাভাবিক হাঁটাচলা, খাদ্যাভ্যাস ও সার্বিক স্বাস্থ্যের প্রতিও রাখা হয় বিশেষ নজরদারি। খামারের অন্যান্য গবাদিপশুর সঙ্গেই স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে উঠছে “ সম্রাট” । যত্ন, পরিচর্যা ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে তাকে গড়ে তোলা হয়েছে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে।
শুধু সম্রাটই নয়, মাটিরাঙ্গার এই আধুনিক এগ্রো ফার্মে বর্তমানে রয়েছে ফ্রিজিয়ান, নেপালি ও দেশি জাতের মোট ৩২টি গবাদিপশু। এর মধ্যে রয়েছে ৩টি গয়াল ও ৩টি মহিষও। প্রাকৃতিক পরিবেশ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে পশুগুলোকে লালন-পালন করা হচ্ছে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে।

তবে এতসব গবাদিপশুর মধ্যেও এবারের কোরবানির হাটে সবার নজর কেড়েছে বিশালাকৃতির ফ্রিজিয়ান ষাঁড় “সম্রাট”। আকৃতি, সৌন্দর্য ও পরিচর্যার কারণে ইতোমধ্যেই এটি হয়ে উঠেছে ফার্মের প্রধান আকর্ষণ।
এদিকে মাটিরাঙ্গার হাট-বাজারগুলোতে জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট। আর মাত্র কয়েকদিন পরই পবিত্র ঈদুল আজহা। তাই গৃহস্থরা নিজেদের পালিত পশু বিক্রির জন্য বাজারে তুলতে শুরু করেছেন।
এবারও দেশি গরুর চাহিদা তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বরাবরের মতো উপজেলায় চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত পশু রয়েছে বলেও জানা গেছে।
খামার কর্তৃপক্ষ জানান, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে সম্রাটকে বিক্রির জন্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কাজীর দেউড়ি বড় গরুর হাটে তোলা হবে। দানব আকৃতির ও আকর্ষণীয় রূপের এই ষাঁড়টির দাম হাঁকানো হচ্ছে ১২ লাখ টাকা। উপযুক্ত দামে সম্রাটকে কোনো সৌখিন ক্রেতার হাতে তুলে দিতে পারবেন বলে আশা করছেন তারা।
সম্রাটের নামের সাথে তার স্বভাবের মিল রয়েছে মন্তব্য করে শেঠ এগ্রো ফার্মস লিমিটেডের শ্রমিক জুলহাস বলেন, সম্রাটকে ঘিরে আমরা দিন-রাত পরিশ্রম করেছি। প্রায় আড়াই বছর ধরে মাটিরাঙ্গার এই খামারে তাকে সন্তানের মতো পরম যত্নে বড় করে তুলেছি। আতপ চালের ভাত তার খুবই পছন্দের খাবার। প্রতিদিন আমি নিজ হাতে তার জন্য ভাত রান্না করি।

তাকে মোটাতাজাকরণের জন্য কোনো ধরনের কৃত্রিম ওষুধ বা ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করা হয়নি। সম্পূর্ণ দেশীয় ও প্রাকৃতিক খাবার খাইয়ে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে বড় করা হয়েছে। পশুটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো তার শান্ত স্বভাব ও কপালের মনোমুগ্ধকর রঙ। আশা করছি, এবারের কোরবানির হাটে সম্রাট সবাইকে মুগ্ধ করবে।”
একই খামারের অপর শ্রমিক রতন জানান, “সম্রাটের যত্ন নেওয়া আমাদের প্রতিদিনের আনন্দের অংশ হয়ে গেছে। ও ভাত খেতে খুব ভালোবাসে, তাই প্রতিদিন বড় পাতিলে করে ওর জন্য আতপ চালের ভাত রান্না করতে হয়। দিনে তিনবার গোসল করানো আর ওর থাকার জায়গা পরিষ্কার রাখতেই আমাদের তিন জনের পুরো সময় কেটে যায়। এত বড় গরু শান্ত ভাবে সামলানো কঠিন, কিন্তু সম্রাট আমাদের সব কথা বোঝে।”
মাটিরাঙ্গা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সুমেন চাকমা বলেন, শেঠ এগ্রো ফার্মস লিমিটেড-এর বিশাল আকৃতির ষাঁড় ‘সম্রাট’সহ মাটিরাঙ্গার সকল খামারের অন্যান্য গবাদিপশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমরা নিয়মিত তদারকি করছি। কোনো ধরনের ক্ষতিকর ওষুধ বা মোটাতাজাকরণ উপকরণ ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ দেশীয় ও প্রাকৃতিক খাবারের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পশুগুলো লালন-পালন করা হয়েছে। বড় আকারে পশু উৎপাদনে প্রাকৃতিক খাদ্য ও সঠিক পরিচর্যার বিকল্প নাই। পাহাড়ি অঞ্চলের অনুকূল আবহাওয়া, সুষম খাদ্য এবং নিবিড় পরিচর্যার কারণেই -এর শারীরিক গঠন এত সুঠাম ও আকর্ষণীয় হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করছি ‘সম্রাট’কে বিক্রি করে খামারি প্রকৃত মূল্য পাবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।