বর্গা শিক্ষক নিয়ে প্রশ্ন তোলায় পাহাড়ি শিক্ষার্থীকে মারধর ও পরিবারকে উচ্ছেদের হুমকি জেএসএসের
![]()
নিউজ ডেস্ক
পার্বত্য জেলা রাঙামাটির দুর্গম সাজেক অঞ্চলে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও বর্গা শিক্ষক প্রথার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করায় রিজাংসি চাকমা (রি জাং সি চাকমা) নামে এক পাহাড়ি তরুণী, নারী উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, মারধর এবং পরিবারসহ এলাকাছাড়া করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও জেএসএস সন্ত্রাসীরা তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং রিজাংসি চাকমার বক্তব্য থেকে জানা যায়, বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব ছয়নালছড়া পাড়ার বাসিন্দা রিজাংসি চাকমা সম্প্রতি সাজেক ইউনিয়নের ছয়নালছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি দীর্ঘ পাঁচ দশক পার হলেও এখনো জরাজীর্ণ টিনশেড ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক সংকট, দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়ম এবং তথাকথিত ‘বর্গা শিক্ষক’ দিয়ে পাঠদান পরিচালনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
রিজাংসি চাকমা সম্প্রতি একটি বেসরকারি দাতা সংস্থার পক্ষ থেকে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের মাঝে বই, খাতা ও স্কুলব্যাগ বিতরণ করতে গিয়ে বিদ্যালয়ের ভয়াবহ বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা অনুপস্থিত এবং স্থানীয় অল্পশিক্ষিত বা প্রশিক্ষণহীন ব্যক্তিদের স্বল্প বেতনে দিয়ে পাঠদান চালানো হচ্ছে। এমনকি বিদ্যালয়ে নিয়মিত জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন ও শারীরিক কসরতও হয় না বলে অভিযোগ ওঠে।
এসব বিষয় তুলে ধরে গত ১৫ মে ২০২৬ তারিখে তিনি নিজের ফেসবুক আইডি “Ri GaNg Ci” থেকে “সাজেকের শিক্ষা ব্যাবস্থা অনুন্নয়নের কারণ কি!!” শিরোনামে ৫ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভিডিওটি ৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি মানুষ দেখেছেন, এক হাজারের বেশি শেয়ার হয়েছে এবং শত শত মন্তব্য পড়েছে।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই রিজাংসি চাকমার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি আরেকটি ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, বিদ্যালয়ের অনিয়ম ও বর্গা শিক্ষক প্রথা প্রকাশ্যে আনায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটি, হেডম্যান, কার্বারী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ক্ষুব্ধ হন। একপর্যায়ে তাকে ডেকে নিয়ে মানসিক ও সামাজিকভাবে অপদস্ত করার পাশাপাশি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধর করা হয়। একইসঙ্গে তার পরিবারকে গ্রাম ছাড়া করার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।
গত ১৬ মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ভিডিও বার্তায় রিজাংসি চাকমা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি দুর্গম এলাকার অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে বর্গা শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হয়। দুর্গমতার কারণে উপজেলা প্রশাসন বা শিক্ষা কর্মকর্তারা সবসময় ঠিকমতো তদারকি করতে পারেন না। আমি ভিডিও প্রকাশ করার পর আশপাশের আরও অনেক গ্রাম থেকে একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসছে।”
তিনি আরও জানান, বর্তমানে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলছে। তবে তিনি ও তার পরিবার এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এদিকে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর রিজাংসি চাকমা একাধিক আবেগঘন পোস্ট ও ভিডিও প্রকাশ করেন। ১৯ মে তিনি “আমার ফ্যামিলি নিরাপত্তা আমি চাই” ক্যাপশনে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। ২০ মে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস (সংস্কার), স্থানীয় হেডম্যান ও কার্বারীদের হুমকির ভিডিও সংযুক্ত করে তিনি লেখেন, “কি বলি। কিছু কথা না বলায় ভালো।” একই দিনে আরেক পোস্টে লেখেন, “আমি আসলে সমাজের জন্য এক কলঙ্কিত অধ্যায়।” পরে তিনি “সাজেক নিয়ে, সমাজের কথা নিয়ে, স্কুল নিয়ে আমি ইতি টেনে দিলাম” উল্লেখ করে আর কোনো কথা বলবেন না বলেও জানান।
তবে পরদিন ২১ মে আবারও ছয়নালছড়া স্কুলের পরীক্ষা কেন্দ্রের একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো শিক্ষক নেই; শুধু বর্গা শিক্ষক দিয়েই চলছে পরীক্ষা। একটা স্কুলের পরীক্ষা কেন্দ্রের পরিবেশ কি এমন হওয়া উচিত?”
একইদিন বর্গা শিক্ষক প্রথা নিয়ে নির্মিত একটি চাকমা প্যারোডি গানও তিনি শেয়ার করেন। ২২ মে প্রকাশিত আরেক ভিডিওতে তিনি অভিমানী কণ্ঠে বলেন, পাহাড়ের এই বর্গা শিক্ষক প্রথা এত সহজে বন্ধ হবে না, কারণ সমাজের প্রভাবশালী অংশ ও বিভিন্ন গোষ্ঠী এ প্রথার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।
এ বিষয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলা শিক্ষা অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সঞ্চয়ন চাকমা বলেন, সাজেক ইউনিয়নের অনেক বিদ্যালয় অত্যন্ত দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। বর্গা শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে আগে কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে অনুমোদিত চারজন শিক্ষকের মধ্যে একজন রাঙামাটিতে সংযুক্ত রয়েছেন এবং আরেকজন ২০১৯ সাল থেকে একটি মামলার কারণে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় আছেন। বর্তমানে বাকি দুইজন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালের পর থেকে নতুন শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় পুরো উপজেলাজুড়ে শিক্ষক সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া অভিযোগকারী তরুণীর সঙ্গে স্থানীয় কিছু মানুষের ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে বলেও শুনেছি।
এদিকে ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকার বর্গা শিক্ষক প্রথা, শিক্ষক অনুপস্থিতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম বিদ্যালয়গুলোতে প্রকৃত শিক্ষক উপস্থিতি নিশ্চিত করা, বর্গা শিক্ষক প্রথা বন্ধ করা এবং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করেও এক শ্রেণির শিক্ষক বিদ্যালয়ে না গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা ব্যক্তিগত জীবনযাপনে ব্যস্ত থাকছেন। তাদের পরিবর্তে নামমাত্র বেতনে স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের দিয়ে পাঠদান পরিচালনা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, পার্বত্য এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে তদারকির অভাব, শিক্ষক বদলি ও নিয়োগে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে আঞ্চলিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর ছত্রছায়ায় অনেক অনিয়ম টিকে আছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পর প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে হস্তান্তর করা হলেও দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব উন্নয়ন এখনো দৃশ্যমান হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।