আসামের বন্দিশালার স্মৃতি এবার ফিরতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গেও

আসামের বন্দিশালার স্মৃতি এবার ফিরতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গেও

আসামের বন্দিশালার স্মৃতি এবার ফিরতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গেও
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

আসামের কুখ্যাত ডিটেনশন ক্যাম্প বা বন্দিশালার স্মৃতি এবার ফিরতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গেও। রাজ্যে নবনির্বাচিত উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই কথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

গত শুক্রবার রাজ্যটির স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দপ্তরের পক্ষ থেকে রাজ্যের প্রতিটি জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটক কেন্দ্র স্থাপনের এক নজিরবিহীন নির্দেশ জারি করা হয়েছে। আর এই নির্দেশ ঘিরেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক। প্রশ্ন উঠছে—আসামের মতো এখানেও কি তবে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া বাঙালি মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হচ্ছে?

রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিবের পক্ষ থেকে পুলিশ প্রধান, কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং সমস্ত জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে পাঠানো এক জরুরি চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা মেনে প্রতিটি জেলায় এই হোল্ডিং সেন্টারগুলো গড়ে তুলতে হবে।

ভারতীয় গণমাধ্যম ‘দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, পত্রিকাটির হাতে আসা এই নির্দেশিকায়, ভারতে অবৈধভাবে বসবাসের দায়ে আটক হওয়া কথিত বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্টেশন) প্রক্রিয়া রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। যেখানে অবৈধভাবে বসবাসের অভিযোগে আটক হওয়া বাংলাদেশি, রোহিঙ্গা এবং সাজা শেষ হওয়া বিদেশি বন্দিদের দেশে ফেরত (ডিপোর্টেশন) না পাঠানো পর্যন্ত আটকে রাখা হবে।

সূত্রের বরাত দিয়ে এতে আরও বলা হয়, আটক হওয়া ‘বাংলাদেশিদের’ সাজামুক্ত বিদেশী বন্দিদের সাথে হোল্ডিং সেন্টার বা ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হবে। পরবর্তীতে বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ বা ফেরত পাঠানোর জন্য তাদের বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়া হবে।

গত ২০ মে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তার সরকার ‘ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট’ (চিহ্নিতকরণ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং বহিষ্কার) নীতিতে কাজ করবে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘যারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) আওতাভুক্ত, তারা এখানে নিরাপদ। কিন্তু যারা এর বাইরে, তাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করে বিএসএফ-এর মাধ্যমে পুশ ব্যাক করবে।’’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। তাদের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সকে (বিএসএফ) জমি বরাদ্দ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই কাজ শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যই আসল উদ্দেশ্যকে সামনে এনে দিয়েছে। সিএএ আইন অনুযায়ী মূলত অমুসলিম শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে শুভেন্দু অধিকারীর এই ‘ডিলিট’ (নাম বাদ দেওয়া) ফর্মুলা সরাসরি মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেছে।

আসামের জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (এনআরসি) এবং ডিটেনশন ক্যাম্পের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বহু বৈধ ভারতীয় নাগরিকও সামান্য কাগজের ত্রুটির কারণে বন্দিশালায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন, যার বড় অংশই ছিলেন বাঙালি মুসলমান। পশ্চিমবঙ্গেও জেলায় জেলায় বন্দিশালা তৈরির এই সরকারি নির্দেশ সেই পুরনো আতঙ্ককেই উস্কে দিয়েছে।

বিরোধী দল এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের দাবি, ‘‘ডিলিট’ শব্দের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার যে কথা মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, তা আদতে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অধিকার বা ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার কৌশল হতে পারে। নাম বা পদবীতে মিল থাকার অজুহাতে সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোর বহু বৈধ ভারতীয় বাঙালি মুসলমানকে ‘বাংলাদেশি’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে হেনস্তা করার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কোনো বিচার প্রক্রিয়া ছাড়া বা দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সুযোগ না দিয়ে ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ আটকে রাখা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।

অবশ্য বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে এই আশঙ্কাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শাসক দলের দাবি, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষিত করতেই এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ। যারা বৈধ নাগরিক, তাদের ভয়ের কোনো কারণ নেই; আইন কেবল অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের জন্যই প্রযোজ্য হবে।

সরকার যাই দাবি করুক না কেন, জেলায় জেলায় বন্দিশালা নির্মাণের এই নির্দেশিকা জারির পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত জেলাগুলো, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা এবং নদীয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ চরমে পৌঁছেছে। ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’-এর এই খেলায় শেষ পর্যন্ত কত লক্ষ বৈধ নাগরিকের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে যাবে, তা নিয়েই এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed