মিয়ানমারে জোরপূর্বক সৈন্যভর্তিকে ঘিরে ‘মানবপাচারের বাজার’ গড়ে উঠার অভিযোগ

মিয়ানমারে জোরপূর্বক সৈন্যভর্তিকে ঘিরে ‘মানবপাচারের বাজার’ গড়ে উঠার অভিযোগ

মিয়ানমারে জোরপূর্বক সৈন্যভর্তিকে ঘিরে ‘মানবপাচারের বাজার’ গড়ে উঠার অভিযোগ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমারের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইন এখন কার্যত একটি “মানবপাচার বাজারে” পরিণত হয়েছে, যেখানে তরুণদের অপহরণ করে সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, পরিবারগুলো সেনাসমর্থিত ভিক্ষুদের কাছে গিয়ে আটক স্বজনদের মুক্তির জন্য আকুতি জানাচ্ছে।

সাম্প্রতিক এক ঘটনায়, ইয়াঙ্গুন অঞ্চলের নর্থ ডাগন টাউনশিপের তিন সন্তানের জনক কো কিয়াও কিয়াও অংকে গত সপ্তাহে স্থানীয় প্রশাসনের সদস্যরা তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তার পরিবার সামরিকপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদী সংগঠন মা বা থা’র সাবেক নেতা ভিক্ষু ইউ পারমাউক্কার দ্বারস্থ হয়। ভিক্ষুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে দাবি করা হয়, ওয়ার্ড-৫০ প্রশাসক ইউ হ্লা সেইন ওই ব্যক্তিকে ৮০ লাখ কিয়াত (প্রায় ৩,৮০০ মার্কিন ডলার) এর বিনিময়ে সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করেছেন।

ইউ পারমাউক্কা বলেন, জোরপূর্বক সৈন্যভর্তি এখন আইনি বৈধতা পেলেও স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক অবিচার চলছে। তিনি ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তার আশ্বাস দেন।

এর একদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে “পিস মঙ্ক এনসিওয়াই” নামে পরিচিত আরেক মা বা থা ভিক্ষুকে মান্দালয়ের সেইন পান ওয়ার্ডের এক কিশোরকে সামরিক বাহিনীতে বিক্রির ঘটনায় হস্তক্ষেপ করতে দেখা যায়। ভিডিওতে ওই ভিক্ষু প্রশাসককে তিরস্কার করে বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বয়স জালিয়াতি করে পরিচয়পত্র বানিয়ে সেনাবাহিনীতে পাঠানো সামরিক বাহিনীর মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করছে। শেষ পর্যন্ত ওই কিশোরকে মুক্ত করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে জোরপূর্বক সৈন্যভর্তির শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলো ক্রমেই মা বা থা ভিক্ষুদের সহায়তা চাইছে। তাদের হস্তক্ষেপে অন্তত চার শিশু ও এক প্রাপ্তবয়স্ককে মুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুক্তিপ্রাপ্তরা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু, আর অধিকাংশ আটক ব্যক্তিকেই এখনও সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াঙ্গুন, মান্দালয়সহ সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে জোরপূর্বক সৈন্যভর্তি নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। রাতের অতিথি নিবন্ধন যাচাইয়ের অজুহাতে বাড়িতে অভিযান, plainclothes কর্মকর্তাদের রাস্তাঘাট থেকে মানুষ তুলে নেওয়া এবং জোরপূর্বক অপহরণের ঘটনা বাড়ছে।

ইয়াঙ্গুনের তামওয়ে টাউনশিপের কিয়াউক মিয়াউং ওয়ার্ডে ধারণ করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, দুই ব্যক্তি এক তরুণকে জোর করে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করলে স্থানীয় বাসিন্দারা বাধা দেয়। জনতা প্রশ্ন করলে অভিযুক্তরা নিজেদের পুলিশ সদস্য বলে দাবি করে।

স্থানীয় সূত্র বলছে, এসব অপহরণে ওয়ার্ড ও গ্রাম প্রশাসকদের পাশাপাশি পিউ স’ হতি মিলিশিয়া এবং সরকারপন্থী “জননিরাপত্তা দল” জড়িত রয়েছে।

এদিকে, সৈন্যভর্তির তালিকায় থাকা বিত্তশালী ব্যক্তিরা নিজেদের বদলে অন্য কাউকে পাঠানোর জন্য ১ কোটি থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ কিয়াত পর্যন্ত অর্থ দিয়ে বিকল্প ব্যক্তি সংগ্রহ করছে। এতে একটি কালোবাজার গড়ে উঠেছে।

মান্দালয়ের এক বাসিন্দা বলেন, “এখন বাধ্যতামূলক সৈন্যভর্তি আইনকে ব্যবহার করে বিশাল মানবপাচার বাণিজ্য চালানো হচ্ছে। শ্রমজীবী মানুষকে প্রতিদিন কাজের পথে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। তরুণদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। বেশিরভাগকে রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে, আবার অনেককে বাড়ি থেকেও টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই মানবপাচার এখন জান্তা-সমর্থিত পিউ স’ হতি মিলিশিয়া ও স্থানীয় প্রশাসকদের অন্যতম বড় ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

পিস মঙ্ক এনসিওয়াই আরও একটি ভিডিওতে জানান, মান্দালয়ের সাউথ চানমিয়াথাজি ওয়ার্ডের কান গ্রামের এক ১৮ বছর বয়সী মুসলিম তরুণ মাছ ধরতে গিয়ে ফেরার পথে সাদা গাড়িতে করে অপহৃত হয়। পরে তিনি পরিবারকে জানান, ওই তরুণকে ইতোমধ্যে সামরিক ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে।

মান্দালয়ের এক মা বা থা সদস্য বলেন, “এখন গ্রেপ্তার হলে টাকা দিলে ছাড়া পাওয়া যায়, না হলে সেনাবাহিনীতে যেতে হয়। কাউকে জোরপূর্বক সৈন্যভর্তিতে বিক্রি করার রেট অন্তত ১ কোটি কিয়াত। অধিকাংশ ভুক্তভোগী দরিদ্র হওয়ায় জনগণ এটিকে আইনের আড়ালে জোরপূর্বক শ্রম হিসেবে দেখছে। সামরিক বাহিনী কার্যত মানবপাচার চক্রের মতো আচরণ করছে।”

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৈন্যভর্তির বিকল্প ব্যক্তি সরবরাহের চাহিদা বাড়ায় দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রগুলো ছোটখাটো অপরাধে আটক শ্রমজীবী মানুষ, বস্তিবাসী, কিশোর, সাবেক কয়েদি এবং দরিদ্র যুবকদের টার্গেট করছে। তাদের প্রায় ৫০ লাখ কিয়াতে “কেনা” হয় এবং পরে কোটা পূরণে ব্যর্থ বিভিন্ন টাউনশিপে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ কিয়াতে বিক্রি করা হয়।

এছাড়া, স্থানীয় প্রশাসকরা যোগ্য পরিবারের সদস্যদের সৈন্যভর্তি এড়িয়ে যেতে প্রতি মাসে ১৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার কিয়াত পর্যন্ত “সৈন্যভর্তি ফি” আদায় করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

মান্দালয়ের এক প্রশাসক দ্য ইরাবতীকে বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ড বা গ্রাম প্রশাসনকে টাউনশিপ পর্যায়ে অন্তত ২ কোটি কিয়াত জমা দিতে হয়। তিনি বলেন, “সৈন্যভর্তি বোর্ড প্রতিটি টাউনশিপকে নির্দিষ্ট কোটা ও সময়সীমা বেঁধে দেয়। যদি তিনজন পাঠানোর নির্দেশ আসে, তাহলে অন্তত পাঁচজনকে ধরতে হয়, যাতে শারীরিকভাবে উপযুক্ত তিনজন পাওয়া যায়। লোক দিতে না পারলে টাকা দিতে হয়। এভাবেই মানববাণিজ্যের এই ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।”

র্যাঙ্গুন স্কাউট নেটওয়ার্ক (আরএসএন) এবং সরকার অনুমোদিত ভয়েস অব মান্দালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসেই ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ে অন্তত ৭০ জন ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পুরুষকে নির্বিচারে আটক করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশকেই সামরিক বাহিনীতে পাঠানো হয়েছে।

মান্দালয়ের এক সাবেক রাজনৈতিক বন্দি বলেন, “বাধ্যতামূলক সৈন্যভর্তি আইন পাশের পর যা হচ্ছে, সবই পুরোপুরি বেআইনি। ধনী ও ক্ষমতাবানদের কিছুই হচ্ছে না, কারণ তারা টাকা দিয়ে রেহাই পাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসকরা এই আইনকে অজুহাত বানিয়ে গরিবদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে।”

তবে সামরিক বাহিনী বারবার জোরপূর্বক সৈন্যভর্তির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গত ৪ মে এক বৈঠকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সৈন্যভর্তি কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল তুন অং বলেন, সৈন্যভর্তিযোগ্য ব্যক্তিদের “সুশৃঙ্খলভাবে পর্যায়ক্রমে” নিয়োগ দেওয়া হবে।

তিনি স্থানীয় প্রশাসনকে জনসংখ্যা ও অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে গৃহ নিবন্ধন তথ্য ব্যবহার করে সৈন্যভর্তির উপযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দেন।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাধ্যতামূলক সামরিক আইন কার্যকরের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৪টি ব্যাচে প্রতিটিতে ৫ হাজার করে মোট প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার নতুন সদস্য নিয়োগ দিয়েছে সামরিক বাহিনী। কেবল প্রথম দুই ব্যাচের সদস্যরাই দুই বছরের বাধ্যতামূলক মেয়াদ পূরণের পর অব্যাহতির যোগ্য হয়েছে।

সামরিক বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন সদস্যদের গঠিত গবেষণা সংস্থা মিয়ানমার ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট (এমডিএসআই) জানিয়েছে, সামরিক ক্যাম্পে থাকা প্রায় ৭০ শতাংশ সৈন্যকে হুমকি, গ্রেপ্তার বা রাতের অপহরণের মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়েছে।

এমডিএসআই আরও জানিয়েছে, সামনের সারিতে পাঠানো নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে হতাহত, নিখোঁজ, আটক বা প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণের ঘটনা ব্যাপক। বিভিন্ন প্রতিরোধ গোষ্ঠীও বলছে, জান্তার হারানো এলাকা পুনর্দখলের অভিযানে নিহতদের বড় অংশই নতুন জোরপূর্বক নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্য।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *