মেঘ-পাহাড় পেরিয়ে পূর্ব লঙ্কাছড়ার দুর্গম চূড়ায় একদল নির্ভীক প্রহরীর অদম্য জীবনসংগ্রাম

মেঘ-পাহাড় পেরিয়ে পূর্ব লঙ্কাছড়ার দুর্গম চূড়ায় একদল নির্ভীক প্রহরীর অদম্য জীবনসংগ্রাম

মেঘ-পাহাড় পেরিয়ে পূর্ব লঙ্কাছড়ার দুর্গম চূড়ায় একদল নির্ভীক প্রহরীর অদম্য জীবনসংগ্রাম
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম পূর্ব লঙ্কাছড়া সীমান্ত অঞ্চল—যেখানে পৌঁছানোই যেন এক অসম্ভব অভিযাত্রা। এক পাশে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, অন্য পাশে বুক চিরে বয়ে চলা মাইনি নদী। সেই নদীর উল্টো স্রোত অতিক্রম করে, ঘন জঙ্গল আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদস্যরা। তাদের গন্তব্য সীমান্তের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্গম পূর্ব লঙ্কাছড়া বিওপি—যেখানে দায়িত্ব মানেই প্রতিনিয়ত জীবনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া।

দীঘিনালা উপজেলার ৫নং বাবুছড়া ইউনিয়নের নির্মাণাধীন সড়ক ধরে ধনপাতাছড়া ঘাট থেকে শুরু হয় এই দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রা। এরপর মাইনি নদীর নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে শুন্যরেখা ঘেঁষে আড়ান্দিছড়া, টেক্কাছড়া, শীলছড়া, উত্তর শীলছড়া এবং লঙ্কাছড়া হয়ে পৌঁছাতে হয় পূর্ব লঙ্কাছড়ায়। পুরো পথ অতিক্রম করতে সময় লাগে প্রায় পাঁচ দিন।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার ফুট উঁচু পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত এই সীমান্ত এলাকা যেন প্রকৃতির এক রহস্যময় রাজ্য। সেখানে পৌঁছাতে কখনো ১০ ঘণ্টার নৌভ্রমণ, আবার কখনো টানা ৩০ থেকে ৩২ ঘণ্টা দুর্গম পাহাড়ি পথ হেঁটে চলতে হয়। অধিকাংশ পথেই নেই কোনো সড়ক, নেই জনবসতি। শুধুমাত্র বিজিবি সদস্যরাই নিজেদের প্রয়োজনে পাহাড় কেটে, ঝিরি পার হয়ে তৈরি করেছেন সরু চলাচলের পথ।

খাড়া পাহাড়, গভীর পিচ্ছিল ঝিরি আর বিপজ্জনক ঢাল বেয়ে চলার একমাত্র ভরসা হাতে থাকা একটি লাঠি। কয়েক ঘণ্টা টানা হাঁটার পর কোনো একটি মিড পয়েন্টে সামান্য বিশ্রাম, তারপর আবার শুরু হয় নতুন পথচলা। পাহাড় পেরিয়ে, ছড়া অতিক্রম করে পৌঁছাতে হয় লঙ্কাছড়া বিওপিতে। সেখান থেকেই দেখা মেলে বহু প্রতীক্ষিত পূর্ব লঙ্কাছড়ার। কিন্তু যাত্রা সেখানেই শেষ নয়। আরও কয়েক ঘণ্টা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় চূড়ান্ত গন্তব্যে। ততক্ষণে পশ্চিম আকাশে ডুবে যায় সূর্য, চারদিকে নেমে আসে পাহাড়ি অন্ধকার। তবুও থেমে থাকে না সীমান্তরক্ষীদের পদচারণা।

এই দুর্গম অঞ্চলের বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। খাবার পানির জন্য প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার ফুট নিচে নামতে হয় বিজিবি সদস্যদের। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা স্বজন হারানোর খবর এলেও অনেক সময় কাউকে দ্রুত নিচে নামানো সম্ভব হয় না। যোগাযোগ ব্যবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল—কখনো নেটওয়ার্ক থাকে, কখনো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এলাকা।

রেশন, জ্বালানি, নির্মাণসামগ্রী কিংবা বিওপি রক্ষণাবেক্ষণ—সবকিছুতেই রয়েছে সীমাহীন কষ্ট আর দুর্ভোগ। তারপরও দায়িত্ব থেকে একচুলও সরে দাঁড়ান না সীমান্তের প্রহরীরা। কারণ তাদের বিশ্বাস একটাই—দেশের এক ইঞ্চি মাটিও কখনো ছেড়ে দেওয়া হবে না।

ঘুটঘুটে অন্ধকার পাহাড়ের রাতেও সতর্ক চোখে জেগে থাকেন তারা। শুধু সীমান্ত পাহারাই নয়, মানবতার সেবাতেও নিজেদের উৎসর্গ করেছেন এই সদস্যরা। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ।

দীঘিনালা উপজেলা থেকে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের আড়ান্দিছড়া, টেক্কাছড়া ও শীলছড়া এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে স্কুল নির্মাণ, চেয়ার-টেবিল ও বেঞ্চ বিতরণ, শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ প্রদান এবং চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার মতো নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিজিবি।

পথহীন পাহাড়ের আঁধারে তাই বিজিবি শুধু সীমান্তের প্রহরী নয়, তারা দুর্গম জনপদের মানুষের আস্থা, নিরাপত্তা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *