ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য ঝেড়ে ফেলছে ভারতীয় সেনাবাহিনী, পোশাকবিধিতে বড় পরিবর্তন
![]()
নিউজ ডেস্ক
ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের পোশাকবিধিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। নতুন নির্দেশনায় ঔপনিবেশিক আমলের বিভিন্ন প্রতীক ও রীতি বাদ দিয়ে দেশীয় উপাদান সংযোজন করা হয়েছে। এর মধ্যে আনুষ্ঠানিক পোশাকের অংশ হিসেবে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী ‘বান্দি জ্যাকেট’ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘আর্মি ইউনিফর্মস প্যামফলেট-২০২৬’-এ এসব সংস্কারের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর পোশাকবিধি ও আনুষ্ঠানিক রীতিনীতিকে একীভূত করার পাশাপাশি ভারতের পরিবর্তিত জাতীয় পরিচয় ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক বেসামরিক পোশাকের অংশ হিসেবে ক্লোজড-নেক ‘বান্দি জ্যাকেট’ ব্যবহার করা হবে। এটি ফুলহাতা শার্ট, মানানসই ফরমাল ট্রাউজার ও বন্ধ জুতার সঙ্গে পরিধান করা হবে। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক পোশাকে একটি স্বতন্ত্র ভারতীয় উপাদান যুক্ত হলো।
এছাড়া সেনাবাহিনী মেস ড্রেস নম্বর ৫ ও ৬ থেকে ‘পাউচ বেল্ট’ ব্যবহার বাতিল করেছে। একই সঙ্গে প্যারেডে পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাদের (Reviewing Officers) জন্য তলোয়ার বহন বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি। পাশাপাশি ‘রয়্যাল’সহ ঔপনিবেশিক আমলের বিভিন্ন পরিভাষার ব্যবহারও বন্ধ করা হয়েছে।
নতুন ম্যানুয়ালে বলা হয়েছে, সামরিক ঐতিহ্য, পেশাদারিত্ব ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে সমসাময়িক ভারতীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আনুষ্ঠানিক তলোয়ার বহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে শুধুমাত্র প্যারেড কমান্ডার, কন্টিনজেন্ট কমান্ডার এবং নির্ধারিত কিছু সদস্য গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে তলোয়ার বহন করবেন। এর মধ্যে প্রজাতন্ত্র দিবস, স্বাধীনতা দিবস, সেনা দিবসের প্যারেড এবং গার্ড অব অনার অনুষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে পরিদর্শনকারী কর্মকর্তারা আর প্যারেডে তলোয়ার বহন করবেন না।
ভারতীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে অবশিষ্ট ঔপনিবেশিক রীতিনীতির পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে, তবে বাহিনীর মর্যাদা ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে।
আনুষ্ঠানিক পরিবর্তনের পাশাপাশি নতুন পোশাকবিধিতে সব পর্যায়ের সদস্যদের জন্য ‘ব্যাটল জ্যাকেট’কে শীতকালীন মানসম্মত বাহ্যিক পোশাক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগামী তিন বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে এটি বিদ্যমান জার্সিভিত্তিক শীতকালীন ইউনিফর্মের পরিবর্তে চালু করা হবে। এই রূপান্তর প্রক্রিয়া ২০২৯ সালের জুন মাসে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন বিধিমালায় ইউনিফর্ম পরিধানকালে ব্যক্তিগত সাজসজ্জা ও আচরণ সম্পর্কেও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উগ্র বা অস্বাভাবিক চুলের স্টাইল, অনুমোদনহীন দাড়ি, দৃশ্যমান ইলেকট্রনিক গ্যাজেট, উল্কি (ট্যাটু), শরীরে ছিদ্র করে অলংকার পরা এবং প্রসাধনী ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা বিক্ষোভ সমাবেশ, বিয়ে, ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান কিংবা অনুমোদন ছাড়া অর্থের বিনিময়ে কোনো গণমাধ্যম অনুষ্ঠানে ইউনিফর্ম পরে অংশগ্রহণও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ বৃহত্তর একটি সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ। চলতি বছরের শুরুতে বাহিনীটি বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় থাকা ২৪৬টি সড়ক, ভবন ও স্থাপনার নাম পরিবর্তন করে ভারতীয় যুদ্ধবীর, বীরত্ব পদকপ্রাপ্ত সদস্য এবং বিশিষ্ট সামরিক নেতাদের নামে নামকরণ করে।
এর মধ্যে দিল্লি ক্যান্টনমেন্টের ‘কিরবি প্লেস’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘কেনুগুরুসে বিহার’ এবং ‘মল রোড’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘অরুণ ক্ষেত্রপাল মার্গ’ রাখা হয়েছে। একইভাবে দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট ও সামরিক স্টেশনে ব্রিটিশ আমলের নাম পরিবর্তন করে ভারতীয় সেনাসদস্য ও কমান্ডারদের নামে নতুন নামকরণ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালেও ভারতীয় সেনাবাহিনী বেশ কয়েকটি ঔপনিবেশিক রীতি বাতিল করেছিল। এর মধ্যে সরকারি অনুষ্ঠানে ঘোড়ায় টানা বগি ব্যবহার, অবসরের সময় ‘সেরিমোনিয়াল পুল-আউট’ অনুষ্ঠান এবং নৈশভোজে পাইপ ব্যান্ড ব্যবহারের মতো প্রথা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলমান এই সংস্কারের উদ্দেশ্য হলো সামরিক ঐতিহ্য, প্রতিষ্ঠান ও জনপরিসরকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে সেগুলো ক্রমশ ভারতের নিজস্ব ইতিহাস, সামরিক অর্জন এবং জাতীয় চেতনার প্রতিফলন ঘটায়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।