পার্বত্য চট্টগ্রামে জেএসএসের সশস্ত্র তৎপরতা: ভারতের ইন্ধন ও ভূ-কৌশলগত ষড়যন্ত্রের অকাট্য দলিল
![]()
নিউজ ডেস্ক
স্বাধীনতার উত্তরকাল থেকেই বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূ-কৌশলগত কারণে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক জটিল আবর্তে নিমজ্জিত। ১৯৭২ সালের পর থেকে পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর একটি উগ্র অংশকে অস্ত্র, অর্থ, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং কূটনৈতিক আশ্রয় প্রদানের মাধ্যমে এই জনপদে কৃত্রিম সংকট জিইয়ে রাখার ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সমসাময়িক অনুসন্ধান এবং মাঠপর্যায়ের সেনাবাহিনীর অভিযানে প্রাপ্ত নানাবিধ তথ্য-উপাত্ত ইঙ্গিত করে যে, ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পরও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-সন্তু লারমা গ্রুপ) এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক দলগুলো অবৈধ অস্ত্রের রাজনীতি ত্যাগ করেনি। গত ২০২৫ সালের প্রথম দিকে উদ্ধারকৃত রসদ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র এবং সামরিক সরঞ্জামাদি একটি গভীর ও সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের চিত্র উন্মোচন করে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
পোশাক, সামরিক সরঞ্জাম ও চিকিৎসা সহায়তার অকাট্য প্রমাণ সম্পর্কে: গত ২০২৫ সালে রাঙামাটি পার্বত্য জেলার দুর্গম যমচুগ ও মারিচুগ মৌন এলাকায় সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযানে পার্বত্য বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আন্তর্জাতিক সংযোগের সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। অভিযানে জব্দকৃত জেএসএস সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত সামরিক পোশাকের কলারের অভ্যন্তরে ভারতের বিখ্যাত ‘কাঞ্চন ইন্ডিয়া লিমিটেড’ দ্বারা উৎপাদিত প্রিমিয়াম স্কুল ইউনিফর্মের কাপড়ের ব্র্যান্ড “স্কুল টাইম” (School Time KANCHAN) এর লেবেল পাওয়া গেছে। ত্রিদেশীয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর পোশাকে ভারতীয় মূলধারার বাণিজ্যিক টেক্সটাইল ব্র্যান্ডের কাপড়ের উপস্থিতি কোনো আকস্মিক ঘটনা হতে পারে না। ত্রিমুখী অরক্ষিত সীমান্ত এবং কাঁটাতারের বেড়ার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে এই সমস্ত লজিস্টিক বা রসদ সামগ্রী নির্বিঘ্নে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
তদপরি, উক্ত সংঘাতস্থল থেকে উদ্ধারকৃত চিকিৎসাসামগ্রী ও ব্যবস্থাপত্র এই সংশয়কে আরও ঘনীভূত করে। উদ্ধারকৃত একটি আনুষ্ঠানিক প্রেসক্রিপশনে স্পষ্ট অক্ষরে মুদ্রিত রয়েছে: “PLEASE DO NOT FOLD (THLEP SUH), HOPE HOSPITAL: CHANMARI, LUNGLEI: MIZORAM”। এই অকাট্য দালিলিক প্রমাণটি নিশ্চিত করে যে, স্থানীয় প্রতিপক্ষ ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূলদল) এর সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর আহত জেএসএস ক্যাডাররা ভারতের মিজোরাম রাজ্যে নিরাপদ আশ্রয় ও উন্নত চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণ করছে। প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরে এই ধরনের নির্বিঘ্ন চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি তাদের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক আনুকূল্যেরই বহিঃপ্রকাশ।

রাঙামাটি যমচুগ ও মারিচুগ মৌন অভিযান
গত ২ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত রাঙামাটির বন্দুকভাঙা রেঞ্জের মারিচুগ মৌন ও যমচুগ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় ৫০-৬০ রাউন্ড গুলি বিনিময়ের পর ২৩ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনীর বিশেষ টহল দল উক্ত দুর্গম অঞ্চলে প্রবেশ করে। সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা গভীর অরণ্যে পালিয়ে গেলেও ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক আলামত জব্দ করা হয়।
তল্লাশি অভিযানে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ক্যালিবারের মোট ২৪৭টি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ৭.৬২ মিলিমিটারের ১২৯টি, ৫.৫৬ মিলিমিটারের ১২৫টি এবং ভারী অস্ত্রের ৭.৬২×৫৪ মিলিমিটারের ৩টি খোসা। এছাড়া ফায়ার না হওয়া তাজা বুলেটও উদ্ধার করা হয়। এই বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক গোলাবারুদ এবং সামরিক সরঞ্জামাদির উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের মিজোরামের মামিত জেলায় অবস্থিত জেএসএস-এর গোপন প্রশিক্ষণ ঘাঁটিগুলো থেকে কথিত সরলমনা উপজাতি পাহাড়ি যুবকদের মগজ ধোলাই করে রাষ্ট্রবিরোধী নাশকতায় লিপ্ত করা হচ্ছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে আটককৃত অস্ত্রের চালান এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক আটককৃত জেএসএস ও ইউপিডিএফ সদস্যদের জবানবন্দিতে ভারতের মাটিতে সক্রিয় এই প্রশিক্ষণ শিবিরের কথা বারবার উঠে এসেছে। আইএসপিআর তৎকালীন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গোলাবারুদ ও সরঞ্জামাদি উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
বিদেশী ইন্ধন ও বিচ্ছিন্নতাবাদের তাত্ত্বিক সূত্র: পার্বত্য চট্টগ্রামের এই সংকট কেবলই একটি অভ্যন্তরীণ জাতিগত সমস্যা নাকি ভারতের সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক চাল, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বহু গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলোকপাত করেছেন। দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি গবেষকদের মতে, ভারত এই অঞ্চলে তার আধিপত্য বজায় রাখতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে ব্যবহার করে থাকে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (যেমন মিজোরাম, ত্রিপুরা) কৌশলগত ‘বাফার জোন’ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত রাখার একটি প্রচ্ছন্ন প্রয়াস দৃশ্যমান।
বিভিন্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক জার্নালের সূত্রমতে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (যেমন ‘র’ – RAW) ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনের বিনিময়ে বাংলাদেশের পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীদের একধরণের মৌন বা প্রকাশ্য স্বাচ্ছন্দ্য দিয়ে থাকে। আঞ্চলিক দলগুলো কর্তৃক সীমান্ত সড়ক নির্মাণে ক্রমাগত বাধা প্রদান এবং সীমান্ত এলাকায় বিজিবি-র পর্যাপ্ত বিওপি স্থাপনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মূল কারণ হলো: এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে তাদের সীমান্তপার চোরাচালান, অস্ত্র ও চিকিৎসা পারাপারের গোপন পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
পরিশেষে বলা যায়, পার্বত্য চুক্তির আড়ালে জেএসএস মূলত নিজস্ব ক্ষুদ্র স্বার্থ এবং বিদেশী শক্তির ভূ-রাজনৈতিক ক্রীড়ানক হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসবাদ টিকিয়ে রেখেছে। আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠার চটকদার স্লোগান মূলত ভারতের ইন্ধনে হচ্ছে; তাদের অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার মাত্র। সীমান্ত অববাহিকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে বিলম্ব এবং দ্বিপাক্ষিক স্তরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ না হলে পার্বত্য জনপদে স্থায়ী শান্তি আনয়ন অসম্ভব। বাংলাদেশের অখণ্ডতা রক্ষার্থে এই ত্রিদেশীয় সীমান্তে কঠোর নজরদারি এবং সাঁড়াশি অভিযানের কোনো বিকল্প নেই।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।