শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরার রক্তভেজা স্মৃতি: বিচারহীনতার সংস্কৃতি
![]()
নিউজ ডেস্ক
পাহাড়ের বুক জুড়ে থাকা অপরূপ প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিভীষিকাময় সন্ত্রাসের জনপদ। যেখানে উগ্রবাদী মানসিকতার চর্চা চলে অস্ত্রের জোরে, যেখানে বিঘ্নিত হয় স্বাধীন ধর্ম পালনের মৌলিক অধিকার। এমনই এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের নাম নওমুসলিম বীর শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরা। ২০২১ সালের ১৮ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে নেমে এসেছিল এক কালো রাত। আজ ২০২৬ সালের ১৮ জুন, দেখতে দেখতে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ বছর অর্থাৎ অর্ধদশক অতিবাহিত হলো। অথচ আজ অবধি রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসন কাউকেই আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে পারেনি। এই দীর্ঘস্থায়ী বিচারহীনতা পাহাড়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনের চরম উদাসীনতাকেই নগ্নভাবে উন্মোচিত করে।
আলোর পথের এক যাত্রী
শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরার পূর্ব নাম ছিল বেরণ চন্দ্র ত্রিপুরা। বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার দুর্গম তুলাছড়ি আগাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তয়ারাম ত্রিপুরার পুত্র বেরণ চন্দ্র শুরুতে পৈত্রিক ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে সত্যের সন্ধানে ২০১৪ সালে থানচি থানার আলীকদমে গিয়ে তিনি সপরিবারে পবিত্র ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘মুহাম্মাদ ওমর ফারুক’। ইসলাম গ্রহণের পর পরিবারের অন্য সদস্যরা থানচিতে বসবাস শুরু করলেও, মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে তিনি রোয়াংছড়ির নিজ এলাকায় ফিরে আসেন।
তিনি কেবল নিজে ইসলাম গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের কাছে দ্বীনের আলো পৌঁছে দিতে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। রোয়াংছড়ি বাজারে জামে মসজিদে নামাজ পড়ার পাশাপাশি তিনি নিজ বাড়ির নিকটে শ্বশুরের কাছ থেকে পাওয়া জায়গায় ‘তুলাছড়ি ত্রিপুরা মসজিদ’ নামে একটি টিনের মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি নিজেই ছিলেন সেই মসজিদের ইমাম এবং এলাকার প্রধান ইসলামিক দাঈ। তাঁর হাত ধরে শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত ৩২টি ত্রিপুরা পরিবারের প্রায় ১৫০ জন মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করে। আর এই ইসলাম প্রচার এবং আল্লাহর ঘর মসজিদ নির্মাণই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
১৮ জুনের সেই রক্তাক্ত রাত: উগ্রবাদের নারকীয় থাবা
২০২১ সালের ১৮ জুন, পবিত্র জুমাবার। এশার নামাজ শেষে রাত আনুমানিক ৮টার দিকে চারজন সশস্ত্র জেএসএস সন্তু গ্রুপের উগ্রবাদী সন্ত্রাসী ওমর ফারুকের ঘরে প্রবেশ করে। ঘরের ভেতর থেকে তাকে টেনেহিঁচড়ে উঠানে নিয়ে আসা হয়। উগ্রবাদী সন্ত্রাসীরা তাকে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে এবং দুর্গম পাহাড়ে মসজিদ নির্মাণের অপরাধে অকথ্য ভাষায় ভর্ৎসনা ও শারীরিক নির্যাতন করতে থাকে। কিন্তু ঈমানের দাবিতে অটল, অবিচল ওমর ফারুক উগ্রবাদীদের রক্তচক্ষুর সামনে মাথা নত করেননি। চরম অত্যাচারের একপর্যায়ে উগ্রবাদী নরপিশাচরা তাঁর বুক ও মাথা লক্ষ্য করে তিনটি গুলি বর্ষণ করে। মুহূর্তেই রক্তে রঞ্জিত হয় পাহাড়ের মাটি, শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন দাঈ ওমর ফারুক ত্রিপুরা।
এর আগে রোয়াংছড়ি উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ক্যাবামং মারমা ও জেএসএসের অপু চাকমা নামের এই দুইজন শহীদ ইমাম ওমর ফারুক-কে জীবিত থাকাকালীন সময় হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল বলে সূত্রে জানা যায়। এখনো সেখানকার নওমুসলিমরা নিরাপদে নেই৷ তাদেরও হত্যার জন্য হুমকি-দামকি দেওয়া হচ্ছে উগ্রবাদীদের পক্ষ হতে।
জেএসএস-এর দ্বিচারিতা ও সন্ত্রাসবাদ
এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পেছনে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসী অপু চাকমাসহ দলটির সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন জাগে, জেএসএস ১৯৯৭ সালের ২-রা ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাথে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরকারী দল হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে এখনো অবৈধ অস্ত্রের জোর খাটিয়ে পাহাড়ে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ টিকিয়ে রেখেছে?
ইতিহাস সাক্ষী, এই জেএসএস ও তাদের সৃষ্ট সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদের কবলে পড়ে চুক্তির পূর্বে এবং পরে এ যাবৎকাল পর্যন্ত প্রায় ৩৮ হাজার নিরীহ বাঙালি নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। অসাংবিধানিক পার্বত্য চুক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা পাহাড়ের বুকে এক সমান্তরাল সন্ত্রাসী রাজত্ব কায়েম করেছে। নওমুসলিম ও মুসলিমদের হত্যা, অপহরণ, খুন, চাঁদাবাজি এবং গুমের মাধ্যমে তারা মূলত পাহাড়ে ইসলাম প্রচারের গতিকে স্তব্ধ এবং মুসলিম জনবসতিকে আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখতে চায়।
ওমর ফারুকের শাহাদাতের পর পার্বত্য অঞ্চল থেকে শুরু করে সমগ্র দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। ২০ জুন তাঁর স্ত্রী রাবেয়া বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা উপজাতি উগ্রবাদীদের আসামি করে রোয়াংছড়ি থানায় মামলা দায়ের করেন। তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থার দাবি করেছিলেন।
২৫ জুন পার্বত্য চট্টগ্রাম বাঙালি ভিত্তিক সংগঠন রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এবং রাঙামাটিতে তীব্র প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধনের আয়োজন করে, যেখানে পাহাড়ে সক্রিয় খ্রিস্টান মিশনারীদের নেতিবাচক ভূমিকা নিয়েও তীব্র সমালোচনা করা হয়। দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, বিশিষ্ট আইনজীবী ড. তুহিন মালিক, জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী, কওমি শিক্ষক আ ফ ম খালিদ হোসেন, ডাচ রাজনীতিক জোরাম ভান ক্ল্যাভের এবং ব্লগার পিনাকী ভট্টাচার্য, সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নূরসহ দেশের আপামর তৌহিদী জনতা ও বিভিন্ন পেশাজীবী মহল এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজপথে তীব্র নিন্দা ও বিচারের দাবি জানিয়েছিলেন।
প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা ও বিচারহীনতার নির্মম পরিণতি
স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর অভিযোগ, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন নাগরিককে নিজ বাড়ির উঠানে ধর্ম প্রচার ও মসজিদ নির্মাণের অপরাধে গুলি করে হত্যা করা হলো, অথচ দীর্ঘ বছরেও প্রশাসন অপরাধীদের স্পর্শ করতে পারল না; এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কী হতে পারে?
প্রশাসনের এই রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা, উদাসীনতা এবং উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অনীহাই আজ পাহাড়কে আরও বেশি অশান্ত করে তুলেছে। একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ার কারণে অপরাধীরা আশকারা পেয়ে গেছে। যার ফলশ্রুতিতে বিগত বছরগুলোতে পাহাড়ে নওমুসলিম এবং সাধারণ মুসলিমদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্র ও প্রশাসন কি তবে পাহাড়ের নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ? নাকি অদৃশ্য কোনো শক্তির ইশারায় সন্তু লারমার জেএসএস-এর এই সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অধরাই রেখে দেওয়া হচ্ছে?
স্মৃতির মণিকোঠায় শহীদ ওমর ফারুক
জেএসএস প্রকাশ শান্তিবাহিনীর হত্যাকারীরা ওমর ফারুককে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তারা সফল হয়নি। তাঁর শাহাদাত পাহাড় ও সমতলের মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করেছে। শহীদ ওমর ফারুককে স্মরণ রাখার জন্য এবং তাঁর অসমাপ্ত দাওয়াতী কাজ এগিয়ে নিতে গঠিত হয়েছে ‘শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরা স্মৃতি সংসদ’ নামক সামাজিক সংগঠন। এছাড়া পাহাড় ও সমতলের ধর্মপ্রাণ মানুষের যৌথ সহযোগিতায় তাঁর শাহাদাত স্থলের সেই জীর্ণ টিনের মসজিদের স্থানে নির্মিত হয়েছে একটি সুদৃশ্য স্থায়ী মসজিদ। শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরা আজ পাহাড়ের বুকে ধর্মীয় স্বাধীনতার এক অবিনাশী প্রতীক। তবে তাঁর আত্মা তখনই শান্তি পাবে, যখন জেএসএস-এর সন্ত্রাসী অপু চাকমাসহ এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা সকল উগ্রবাদীদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হবে। স্থানীয় মুসলিমরা মনে করেন, প্রশাসনকে অবিলম্বে এই দীর্ঘস্থায়ী ঘুম থেকে জেগে উঠতে হবে; অন্যথায় পাহাড়ের এই ক্ষোভের আগুন একদিন সমগ্র দেশের স্থিতিশীলতাকে গ্রাস করতে পারে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।