বান্দরবানের শ্রমবাজারে রোহিঙ্গাদের থাবা, কাজ হারাচ্ছে স্থানীয়রা

বান্দরবানের শ্রমবাজারে রোহিঙ্গাদের থাবা, কাজ হারাচ্ছে স্থানীয়রা

বান্দরবানের শ্রমবাজারে রোহিঙ্গাদের থাবা, কাজ হারাচ্ছে স্থানীয়রা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

বান্দরবান জেলার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা নির্ভর করে শ্রমবাজারের ওপর। এখন শ্রমবাজারের বেশিরভাগই দখল করে নিচ্ছে মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে এসে প্রশাসনের চোখ ও বিভিন্ন চেক পোস্ট ফাঁকি দিয়ে কম টাকায় শ্রম দেওয়ার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন স্থানীয় শ্রমিকরা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, স্থানীয় শ্রমিকদের পাশাপাশি হাজার হাজার রোহিঙ্গা শ্রমিকদের জন্য অন্যতম শ্রমবাজার যেন জেলার ৭টি উপজেলা। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ার কারন, তাদের চেহারা ও ভাষাগত তেমন পার্থক্য না থাকায় কাজের সন্ধানে চলে আসে রোহিঙ্গারা। আর স্থানীয়রাও কমদামে রোহিঙ্গা শ্রমিকদের নিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন কাজের জন্য। অনেক রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে এসে এখন জেলার বিভিন্ন পাহাড়ী এলাকার বাগানে বসবাস করছে। এতে শুধু শ্রমবাজার নয়, অপরাধে তারা জড়িয়ে পড়ছে।

বান্দরবানের সুয়ালক এলাকায় কর্মরত ভাসমান শ্রমিক রোহিঙ্গা হোসেন আলী বলেন, আমরা যেকোন ভারি কাজ করে থাকি, যা এখানকার বাঙালীরা পারেনা, আমরা বেতনও কম নিয়ে থাকি।

যেসব কাজ করে রোহিঙ্গারা:

বেশিরভাগ রোহিঙ্গা নির্মাণকাজ, কৃষিকাজ, ইটভাটায় শ্রমিক, পাথর উত্তোলন, মাটি কাটা, অটোরিকশা, খাবার হোটেল, আবাসিক হোটেল, গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ, কাঠ কাটা ও বহন, আম বাগান, রাবার বাগান, কৃষি কাজ, তামাক ক্ষেত, মৎস প্রজেক্ট এর কাজে নিয়োজিত। তাছাড়া বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য দখল করে নিচ্ছে রোহিঙ্গারা।

সরজমিনে সদরের রেইছা এলাকা পরিদর্শনে দেখা যায়, রেইছা বাজার, ভান্ডারি পাড়া ও গোয়ালিয়া খোলা এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ে রোহিঙ্গাদের পাহাড়ের গাছ কাটতে দেখা যায়, তাদের একজন দীল মোহাম্মদ বলেন, আমাদেরকে গাছ কাটার জন্য মাঝি নিয়ে এসেছে, আমরা কাজ করে চলে যায়, অনেকে এখানের বিভিন্ন পাহাড়ে বসবাস করে।

গোয়ালিয়া খোলা এলাকার শ্রমিক মো: কামাল জানান, বান্দরবানে মাত্র একটি গার্মেন্টস আছে, তাই স্থানীয়রা শ্রমিক হিসাবে বিভিন্ন কাজ করে কিন্তু রোহিঙ্গারা কাজ করার ফলে স্থানীয়রা সপ্তাহে ৩দিন কাজ পেলে ৪দিন কাজ না পেয়ে ঘরে বসে থাকে।

রেইছা এলাকার বাসিন্দা মো: হানিফ বলেন, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় শ্রমিকদের মধ্যে দৈনিক বেতনের পার্থক্য অন্তত ২শ টাকা, আর ভারি কাজ স্থানীয়রা করেনা, তাই অনেকে রোহিঙ্গা শ্রমিক দিয়ে কাজ করে।

এই বিষয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের বাসিন্দা রুপলা ধর জানান, ঘুমধুমে স্থানীয় কোন শ্রমিক পাওয়া যায় না, মূলত রোহিঙ্গা শ্রমিকরাই কম বেতনে কাজ করে।

যে কারনে তাদের কাজে নেওয়া হয়:

সাহসী ও শারীরিক ভাবে শক্তিশালী হওয়ার কারনে স্থানীয় শ্রমিকদের তুলনায় অনেক কম মজুরিতে রোহিঙ্গারা ভারি কাজ করতে পারে। চেহারা ও ভাষাগত মিল থাকায় অনাসয়ে তারা বাঙালীদের সাথে মিশে যেতে পারে। এর ফলে দূর্গম এলাকা থেকে নির্জন খামার, এমনকি বন্য হাতির আবাসস্থল এলাকায়ও তারা কাজ করতে ভয় পায়না। ফলে স্থানীয় মালিক ও ঠিকাদাররা তাদের কাজে নিতে আগ্রহী হচ্ছেন, যার কারণে স্থানীয় বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ছে। দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আয়ের উৎস সংকুচিত হচ্ছে।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার রাবার বাগানে কর্মরত সাইদ হোসেন বলেন, স্থানীয়দের দৈনিক কাজের মজুরী কমপক্ষে ৭ থেকে ৮শ টাকা, অন্যদিকে রোহিঙ্গারা সেই কাজ ৪ থেকে ৫শ টাকায় করে, তাই স্থানীয়রা কাজ হারাচ্ছে।

কোন পথে আসে রোহিঙ্গারা?

মিয়ানমারের সঙ্গে জেলার নাইক্ষ্যংছড়ির ১১ বিজিবির ব্যাটালিয়ন সীমান্ত ৭১ কিলোমিটার ও জোনের অধীনে ৯৪ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এই জোনের অধীনে নিকুছড়ি থেকে তীরের ডিব্বা পর্যন্ত বর্ডার অবজারবেশন পোস্ট (বিওপি) রয়েছে ১৪টি। আর কক্সবাজারের ঘুমধুম থেকে মনজয়পাড়া পর্যন্ত বিওপি রয়েছে ৮টি। এরপর সীমান্ত পিলার ৫৫ থেকে আলীকদম ৬৮ নম্বর পোয়ামুহুরী পর্যন্ত এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন (অরক্ষিত) রয়েছে, ফলে নাইক্ষ্যংছড়ির আশারতলী, ফুলতলী, লেমুছড়ি, চাকঢালা, ঘুমধুম সীমান্ত; অন্যদিকে আলীকদমের করুক পাতা ও পোয়ামুহুরির বিভিন্ন ঝিরি দিয়ে এই দেশে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করে। এছাড়া কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবির ও ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা পালিয়ে বান্দরবানে কাজের সন্ধানে আসছে।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের বিশেষ প্রতিনিধি নীলিমা আক্তার নীলা বলেন, দেশে এমনিতেই কর্মসংস্থান কম, যেভাবে রোহিঙ্গারা কর্মসংস্থান দখল করছে, তাতে বান্দরবানের মানুষ কর্ম হারাচ্ছে, এই বিষয়ে সবার সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা:

আগে কাজের সন্ধানে জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা ও আলীকদমে রোহিঙ্গারা বেশি অবস্থান করলেও এখন তারা কাজের সন্ধানে বান্দরবান শহর হয়ে পাহাড়ী জনগোষ্ঠি অধ্যূষিত রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচিতে প্রবেশ করছে। গত ৫ই মে রোহিঙ্গা ক্যাম্প হতে পালিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ কালে সদরের রেইচা চেক পোষ্টে একসাথে ২১ জন ও ১২ই মে আরও ৮ রোহিঙ্গা’কে শহরের বাস স্টেশন এলাকা থেকে আটক করা হয়। তাদের প্রথম দলটি কাজের সন্ধানে শহরে প্রবেশ ও অপর দলটি কাজ শেষ করে বান্দরবান শহর ত্যাগ করার সময় আটক হয়।

এই বিষয়ে বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওয়াহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, আমরা রোহিঙ্গাদের আটক করছি, আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে, আপনাদের (সাংবাদিক) কাছে তথ্য থাকলেও আমাদের জানাবেন।

এদিকে যে কোন কাজে রোহিঙ্গাদের নিয়োগ ও বাসা ভাড়া কিংবা আশ্রয় দেওয়া আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই এই বিষয়ে গণ বিজ্ঞপ্তি জারির পাশাপাশি জেলায় রোহিঙ্গা নাগরিক অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পুলিশের তৎপরতা ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হবে এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

-পাহাড় বার্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *