পার্বত্য চট্টগ্রামে সবার জন্য অভিন্ন করনীতি চাইল পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ
![]()
নিউজ ডেস্ক
তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে বসবাসরত বাঙালিসহ সকল সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর জন্য একই নীতিতে কর আরোপ অথবা কর মওকুফের দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) সকাল ১১টায় ঢাকার বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা এ দাবি জানান।
এসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী মজিবুর রহমান, শেখ আহমদ রাজু, এডভোকেট পারভেজ তালুকদার, শাহজালাল রানা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক লেখক ও সাংবাদিক এ এইচ এম ফারুকসহ সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে তথাকথিত বিশেষ শাসনব্যবস্থা এবং ১৯৯৭ সালের বিতর্কিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। তাদের দাবি, এর মাধ্যমে একটি বিশেষ জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের মূল ধারার নাগরিকদের তুলনায় অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছে।
সংগঠনটি উল্লেখ করে, গত ২১ জুন দুইজন উপজাতি সংসদ সদস্য, একজন সংরক্ষিত নারী উপজাতি সদস্য এবং খাগড়াছড়ির একজন বাঙালি সংসদ সদস্য যৌথভাবে অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি পাঠান। ওই চিঠিতে আয়কর আইন-২০২৩-এর ৬ষ্ঠ তফসিলের প্রস্তাবিত সংশোধনী বাতিল করে উপজাতিদের জন্য পূর্বের ন্যায় পূর্ণাঙ্গ আয়কর অব্যাহতি বহাল রাখার দাবি জানানো হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের মতে, ওই চিঠিতে বৈষম্যমূলক মানসিকতা, ঐতিহাসিক তথ্যের বিকৃতি এবং রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইলিংয়ের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ৬ষ্ঠ তফসিলের অনুচ্ছেদ ২৭ এবং আয়কর আইন ২০২৩-এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে করমুক্ত সুবিধা ভোগ করছে।
সংগঠনটির দাবি, এই সময়ে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি-বেসরকারি চাকরি এবং ঠিকাদারি খাতের বড় অংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। করমুক্ত সুবিধার সুযোগ নিয়ে অনেক উপজাতি ঠিকাদার লাইসেন্স ভাড়া দিয়ে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।
বক্তব্যে আরও বলা হয়, একই অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিরা নিয়মিত কর প্রদান করলেও সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি আয় করেও উপজাতিদের করের বাইরে রাখা সংবিধানে বর্ণিত সমঅধিকার নীতির পরিপন্থী। সংগঠনটির মতে, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হওয়ার পরও ‘মূল স্রোতধারায় আত্মীকরণ’-এর যুক্তিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর অব্যাহতি দাবি করা যৌক্তিক নয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈষম্য দূর করতে করব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে গত ১৮ জুন জাতীয় সংসদে রাঙামাটি-২৯৯ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
সংগঠনটি সংসদ সদস্যদের দেওয়া তথ্যকে ‘একপেশে, বিভ্রান্তিকর, মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে দাবি করে। তাদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী উপজাতিদের সিংহভাগ এখন আর পিছিয়ে নেই এবং তারা পার্বত্য চুক্তির ৭২টি ধারার অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, উপজাতি কোটা, সরকারি চাকরিতে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ নিয়োগ, দেশি-বিদেশি এনজিওর অনুদান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশেষ বরাদ্দ এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন তহবিলের সুবিধা মূলত উপজাতিরাই পেয়ে থাকে। পাশাপাশি পার্বত্য চুক্তি ও শাসনবিধির অপব্যবহার করে স্থানীয় হেডম্যান, কার্বারি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
সংগঠনটির দাবি, করমুক্ত সুবিধার কারণে উপজাতি ব্যবসায়ীরা ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করছে, অন্যদিকে বাঙালি ব্যবসায়ীরা করের বোঝা বহন করে ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ দাবি করে, উপজাতিরা ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর পরিবর্তে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নির্দেশনা অনুসরণ করেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে রাঙামাটিতে জেএসএস কোণঠাসা হয়ে পড়ায় তারা কৌশলগতভাবে দীপেন দেওয়ান ও বিএনপিকে সমর্থন দেয় বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
সংগঠনটি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলে, শুধুমাত্র উপজাতিদের জন্য কর মওকুফের বিষয়টি ব্যক্তি পর্যায়ের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও কর ফাঁকির সুযোগ সৃষ্টি করবে। তাদের মতে, ফার্ম বা কোম্পানিকে করমুক্ত ঘোষণা করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বড় বড় ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট গড়ে উঠবে, যা জাতীয় রাজস্বনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বাঙালি ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেবে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, রাষ্ট্রের উচিত কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈষম্যমূলক করব্যবস্থার অবসান ঘটানো এবং প্রস্তাবিত সংশোধনী বাস্তবায়ন করা। তাদের মতে, সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
তারা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় বসবাসরত ৫৪ শতাংশ বাঙালিসহ সকল সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর জন্য একই নীতিতে কর আরোপ বা কর মওকুফের দাবি জানান। একই সঙ্গে সবাইকে করের আওতায় আনা হলে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পাবে বলেও মত প্রকাশ করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনের শেষে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ তাদের দাবিগুলো সরকারের দৃষ্টিগোচরে আনতে এবং জনস্বার্থে প্রচারের জন্য সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।