হাওর ও পার্বত্য অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা ও দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান
![]()
নিউজ ডেস্ক
হাওর ও চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, জীবিকা সুরক্ষা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত ‘হাওর বেসিন ও চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলভিত্তিক পারিবারিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ (হাউজহোল্ড ইকোনমি অ্যানালাইসিস-এইচইএ) প্রতিবেদন’ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. আবদুস সালাম এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কোকো উশিয়ামা। এছাড়া খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিট (এফপিএমইউ), এফএও, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, মানবিক সংগঠন, গবেষক, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
ভূমিমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি ও তীব্রতা বাড়ছে। ফলে শুধু দুর্যোগের পর প্রতিক্রিয়া জানানো নয়, বরং আগাম প্রস্তুতি, পূর্বাভাসভিত্তিক কার্যক্রম এবং জীবিকার বহুমুখীকরণের মাধ্যমে ঝুঁকি কমাতে হবে।
তিনি বলেন, এই প্রতিবেদন কেবল একটি গবেষণা দলিল নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণভিত্তিক তথ্যভান্ডার, যা ঝুঁকি ও বিপদাপন্নতা বোঝা, আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবিকা সুরক্ষায় কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।
মন্ত্রী জানান, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সুরক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে। হাওর অঞ্চলের মানুষ প্রতিবছর আকস্মিক বন্যার মুখোমুখি হচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠী ভূমিধস, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মতো বহুমাত্রিক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, হাওর অঞ্চলের প্রায় ৫৮ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের জীবিকা সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দরিদ্র ও অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রধান আয়ের উৎস দিনমজুরি, আর তাদের খাদ্যের বড় অংশই বাজার থেকে কিনে সংগ্রহ করতে হয়। ফলে দুর্যোগের সময় এ শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নারীর অর্থনৈতিক অবদানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাওর ও পার্বত্য উভয় অঞ্চলে অতি দরিদ্র পরিবারের মোট আয়ের প্রায় ৮ দশমিক ৬ থেকে ৯ দশমিক ২ শতাংশ আসে নারীদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে। কিন্তু দুর্যোগের কারণে এসব আয় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি খাদ্য নিরাপত্তা ও দুর্যোগ সহনশীলতা বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভূমিমন্ত্রী বলেন, হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা প্রায়ই বোরো ধান কাটার মৌসুমে আঘাত হানে। এতে কৃষকদের বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফসল মুহূর্তেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধস ও অতিবৃষ্টি কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করার পাশাপাশি বাজার ও সেবায় মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত করে দেয়।
তিনি জানান, সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, জলাশয় দখল ও দূষণ রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার ‘সরকারি জলমহাল আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে। খসড়া আইনে জলমহাল দখল, ভরাট, দূষণ, প্রাকৃতিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি এবং জলজ সম্পদ বিনষ্টের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের নদী, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড় ও অন্যান্য সরকারি জলমহাল শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এগুলো পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ সম্পদ রক্ষায় সরকার যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি ‘জাল যার, জলা তার’ নীতির বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রকৃত জেলেদের অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে সহনশীলতা গড়ে তুলতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি উন্নয়ন সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার এবং কমিউনিটির মধ্যে আরও শক্তিশালী অংশীদারিত্ব প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ভূমিমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে হাওর বেসিন ও চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের পারিবারিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ (এইচইএ) প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।