চীন সীমান্তে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলেও সংবেদনশীল: ভারতীয় সেনাপ্রধান
![]()
নিউজ ডেস্ক
ভারত ও চীনের মধ্যকার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) বা ডি ফ্যাক্ট সীমান্ত পরিস্থিতি বর্তমানে স্থিতিশীল হলেও বেশ সংবেদনশীল বলে জানিয়েছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী। সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি’র সিনিয়র এক্সিকিউটিভ এডিটর আদিত্য রাজ কাউলকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন।
দেশকে আশ্বস্ত করে উপেন্দ্র দ্বিবেদী বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল অর্থ এই নয় যে সেনাবাহিনী আত্মতুষ্টিতে ভুগছে; যে কোনো হুমকি মোকাবিলা ও আকস্মিক পরিস্থিতির দ্রুত জবাব দিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী সীমান্তে শক্তিশালী ও জোরালো মোতায়েন অবস্থান বজায় রেখেছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) অবসরে যেতে যাওয়া এই সেনাপ্রধান বলেন, উত্তর সীমান্তে ভারত ও চীনের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে এবং উভয় পক্ষই এখন একে অন্যের উদ্বেগের প্রতি আরও বেশি সাড়া দিচ্ছে ও সংবেদনশীলতা দেখাচ্ছে।
জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, উত্তর সীমান্তের পরিস্থিতি স্থিতিশীল কিন্তু সংবেদনশীল। সেনা প্রত্যাহারের (ডিসএনগেজমেন্ট) চুক্তিগুলো মাঠে স্থিতিশীলতা বাড়িয়েছে এবং উভয় পক্ষই এখন একে অপরের উদ্বেগের প্রতি বৃহত্তর সাড়া ও সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করছে। গত এক বছরে নতুন করে শুরু হওয়া কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পৃক্ততা উত্তেজনা কমাতে, রুটিন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান করতে ও এক ধরণের পারস্পরিক আস্থা তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
তিনি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার ইতিবাচক সূচক হিসেবে একগুচ্ছ কূটনৈতিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে- সীমানা নির্ধারণের বিকল্পগুলো খোঁজার জন্য ডব্লিউএমসিসি-এর অধীনে একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন, কৈলাশ মানস সরোবর যাত্রা ও সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু করা, তিনটি গিরিপথ বা পাস দিয়ে সীমান্ত বাণিজ্যের বিষয়ে ঐকমত্য ও ভিসা শিথিলকরণ প্রক্রিয়া।
সামরিক স্তরেও নিয়মিতভাবে অনেক আস্থা বৃদ্ধির মহড়া চালানো হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, উভয় পক্ষের মধ্যে বার্ষিক ১ হাজার ১০০টিরও বেশি মাঠ-পর্যায়ের মিথস্ক্রিয়া বা গ্রাউন্ড-লেভেল ইন্টারঅ্যাকশন ঘটে থাকে। এটি হটলাইন, পতাকা বৈঠক ও কমান্ডার-পর্যায়ের সম্পৃক্ততার মতো প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যাগুলো সমাধান করতে সহায়তা করে।
তবে সেনাপ্রধান স্পষ্ট করে বলেন যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী আত্মতুষ্টিতে ভুগছে না এবং যে কোনো অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কর্মকাণ্ডকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তিনি বলেন, স্থিতিশীলতা মানে আত্মতুষ্টি নয়। যে কোনো হুমকি ঠেকাতে ও যে কোনো পরিস্থিতির জবাব দিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী একটি শক্তিশালী মোতায়েন অবস্থান বজায় রাখা অব্যাহত রেখেছে। উত্তর সীমান্ত বরাবর অবকাঠামো উন্নয়ন, নজরদারি, লজিস্টিকস, গতিশীলতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি আমাদের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র হিসেবে রয়েছে। রুটিন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে যে কোনো অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ, আমরা সম্পূর্ণ পরিসরজুড়ে প্রস্তুত রয়েছি।
সেনাবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও কাশ্মীর প্রসঙ্গ
সাক্ষাৎকারে সেনাপ্রধান তার বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলও রূপরেখা আকারে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি কৌশল স্পষ্ট: শান্তি ও প্রশান্তি বজায় রাখা, আলোচনার মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যার সমাধান করা এবং স্থিতিশীলতা রক্ষা করা, পাশাপাশি আমাদের প্রস্তুতি, অবস্থান এবং অবকাঠামো যেন নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর থাকে তা নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি তিনি পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে চীনের ক্রমবর্ধমান অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি আমাদের স্পষ্ট ও ধারাবাহিক জাতীয় অবস্থান।
তিনি আরও যোগ করেন, আমরা এই অঞ্চলের বৃহত্তর কৌশলগত তাৎপর্য সম্পর্কেও সচেতন, যার মধ্যে বহিরাগত সামরিক ও অবকাঠামোগত তৎপরতা রয়েছে, যা ভারতের নিরাপত্তার জন্য প্রভাব ফেলে। ভারতীয় সেনাবাহিনী এই ধরণের সব ঘটনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে ও যে কোনো পরিস্থিতির জবাব দিতে প্রস্তুত থাকে। সেই অনুযায়ী আমাদের মোতায়েন, নজরদারি, গোয়েন্দা গ্রিড ও আভিযানিক প্রস্তুতি বজায় রাখা হয়।
ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের পটভূমি
ভারত ও চীন পূর্ব লাদাখে দীর্ঘ চার বছর ধরে সামরিক অচলাবস্থায় লিপ্ত ছিল। সীমান্তের এই বৈরিতা গালওয়ান উপত্যকায় এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের রূপ নেয়, যেখানে দেশের জন্য কর্তব্যরত অবস্থায় ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। সেই সাথে এক নৃশংস হাতাহাতি যুদ্ধে অনির্দিষ্ট সংখ্যক চীনা সেনাও মারা যায়।
কয়েক বছরের কূটনৈতিক ও সামরিক আলোচনার পর, দুই পক্ষ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার বেশ কয়েকটি বিরোধপূর্ণ পয়েন্ট থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ভারত ও চীন পূর্ব লাদাখের সর্বশেষ দুটি বিরোধপূর্ণ পয়েন্ট- দেমচক ও ড্যাপসাং থেকে সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করে।
এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের চুক্তির ঠিক কয়েকদিন পরই রাশিয়ার কাজানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন।
পরে ২০২৫ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী মোদী সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে চীন সফর করেন। সেই সম্মেলনেভাগের ফাঁকে তিনি চীনা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন এবং পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে চীনের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে নয়াদিল্লির প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দেন।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।