ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের রিপোর্ট- রাতের আঁধারে হাজারো মুসলিমকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের রিপোর্ট- রাতের আঁধারে হাজারো মুসলিমকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের রিপোর্ট- রাতের আঁধারে হাজারো মুসলিমকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

রাতের আঁধারে সীমান্ত দিয়ে জোর করে হাজারো মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে ভারতের বিরুদ্ধে। দেশটির পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ ধরনের ‘পুশ-ইন’ বেড়েছে। বাংলাদেশে পাঠানো এসব মানুষের অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বলছে, কোনও আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ছাড়াই এসব মানুষকে সীমান্ত পার করে দেয়া হচ্ছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস বলছে, বিশ্বের দীর্ঘতম স্থলসীমান্তগুলোর একটি হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। আর এই সীমান্তেরই একটি অংশের জলাভূমি এলাকায় মেগাফোনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের উদ্দেশে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) সদস্যরা বারবার একটি ঘোষণাই দিচ্ছেন। আর তা হলো—‘মানুষকে জোর করে এপারে পাঠাবেন না।’

বিজিবির ল্যান্স করপোরাল মাহমুদ মাসুদ বলেন, ‘তারা (বিএসএফ) অন্ধকার নামার অপেক্ষা করে। তারপর স্পটলাইট বন্ধ করে সুযোগ বুঝে মানুষকে সীমান্ত পার করে দেয়’। তিনি অভিযোগ করেন, নয়াদিল্লি যাদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বলছে, তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করছে।

ভারত ও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর এ ধরনের ‘পুশ-ইন’ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে হাজার হাজার মানুষকে বাংলাদেশে জোর করে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। আর এসব মানুষের বেশিরভাগই বাঙালি মুসলিম।

এসব ‘পুশ-ইন’-এর ক্ষেত্রে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না। যাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে, তাদের অনেকেই কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে থাকেননি, এমনকি কেউ কেউ কখনোই এখানে (বাংলাদেশে) বসবাসও করেননি।

বিজিবির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, ‘ভারতের সীমান্তের গেট খুলে মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। সেখানে নারী ও শিশুও আছে। এসব অসহায় মানুষ সীমান্তের ‘জিরো লাইনে’ আটকা পড়ে যাচ্ছেন।’

তিনি দুই দেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ আটকে থাকা বহু মানুষের কথা উল্লেখ করে এই মন্তব্য করেন।

আর ভারত থেকে মানুষকে জোর করে বিতাড়নের এই ঘটনা দুই দেশের নাজুক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। পাশাপাশি হিন্দু জাতীয়তাবাদ নিয়ে উদ্বেগ এবং পশ্চিমবঙ্গসহ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর লাখো মুসলিমের মধ্যে অনিশ্চয়তার অনুভূতি আরও বাড়িয়েছে।

ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে। মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও রয়েছে। দুই দেশের মানুষের মধ্যে ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও অভিবাসনের দীর্ঘ ইতিহাসও রয়েছে। তবে বহু বছর ধরে বিজেপি বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। একসময় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাদের ‘উইপোকা’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সরকার অভিযান শুরু করে। এ সময় প্রধানত কাগজপত্রবিহীন বাংলাদেশি এবং মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের আটক ও বিতাড়নের জন্য ‘হোল্ডিং সেন্টার’ গড়ে তোলা হয়। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৯ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই মুসলিম। সমালোচকদের অভিযোগ, মুসলিম সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার বিষয়ে বিজেপির যে রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে, সেটিই এই বিতাড়ন অভিযানের পেছনে কাজ করছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপ্রধান মীনাক্ষী গাঙ্গুলী অভিযোগ করেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিষ্ঠুরভাবে বেশিরভাগ মুসলিম পরিবারকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রেখে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ভারত সরকারের উচিত অবৈধভাবে মানুষকে বিতাড়ন বন্ধ করা, আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করা এবং মুসলিমদের প্রতি এই বৈরী মনোভাবের অবসান ঘটানো।’

ভারতের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘চিহ্নিত করুন, তালিকা থেকে বাদ দিন এবং বিতাড়ন করুন’—এই নীতির আওতায় ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের’ সীমান্ত পার করে দেয়া হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গত জুন মাসে কলকাতায় বলেন, দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে প্রায় ১০ হাজার অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীকে বিতাড়ন করা হয়েছে। আরও ১ হাজার ৮০০ জন বিতাড়নের অপেক্ষায় রয়েছেন।

উত্তর-পূর্ব ভারতের আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, বাংলাদেশি মুসলিমদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশের’ বিরুদ্ধে তার রাজ্য নিরলস অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, তাদের উপস্থিতি ভারতের জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলে দেয়ার হুমকি তৈরি করছে। তার ভাষায়, ‘একজন অবৈধ অভিবাসীকেও ছাড় দেয়া হবে না। তাদের যেখানে থাকার কথা, সেখানে ফেরত পাঠানো হবে।’

আর ভারতের এই নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার। ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়ার পরও তিনি এখনও ভারত সফর করেননি। ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়া বাংলাদেশের পক্ষে ফেরত পাঠানো হাজার হাজার অভিবাসীকে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘তারা এভাবে মানুষকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিতে পারে না’। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, এই ‘পুশ-ইন’ দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে।

ভারতে আশ্রয় নেয়া শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ঢাকার বারবার জানালেও নয়াদিল্লি তাতে সাড়া দেয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারতে অবস্থানকারী অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি জানান, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য ২ হাজার ৬৮০টির বেশি নথি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।

ভারতের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রত্যাবাসনের জন্য যে দেশে পাঠানো হবে, তাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে সেই সহযোগিতা পাওয়া যায় না’। তার দাবি, তাই ভারত বাধ্য হয়ে ‘পুশ-ব্যাক’ নীতি অনুসরণ করছে।

তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে তাকে বন্ধু হিসেবে দেখা হতো। তাই আমরা বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি চাপ দিইনি। কিন্তু এখন তিনি ক্ষমতায় নেই, তাই আমরা আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছি।’

সীমান্তে সেই উত্তেজনার প্রভাবও স্পষ্ট। আর তাই সীমান্তে বাড়তি সদস্য মোতায়েন, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং ড্রোন নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবি।

বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা সিঙ্গিমারী নদীর কাছে কলাবাগানে দেখা হয় আপেল মিয়া নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। কাগজপত্রবিহীন এই বাংলাদেশি অভিবাসী জানান, তিনি এক দশক ভারতে ছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব বাড়তে থাকায় তিনি নিজেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

তার দাবি, পরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা গভীর রাতে তাকে ও তার পরিবারকে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়।

আপেল মিয়া বলেন, ‘আমাদের কাছে কোনও কাগজপত্র ছিল না। একটি মাদ্রাসা থেকে পিকআপ ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আলো নিভিয়ে গেট খুলে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। তারপর বলে, ‘এখন যান, ভয় পাবেন না। আপনারা তো বাংলাদেশি’।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমরা ভয় পেয়েছিলাম। অন্ধকারে কোথায় যাব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।’

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *