জুলাই শহীদ মজিদের নামে সড়কের প্রতিশ্রুতি এখনো কাগজে-কলমে, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ

জুলাই শহীদ মজিদের নামে সড়কের প্রতিশ্রুতি এখনো কাগজে-কলমে, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ

জুলাই শহীদ মজিদের নামে সড়কের প্রতিশ্রুতি এখনো কাগজে-কলমে, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র শহীদ মো. মজিদ হোসেনের স্মৃতি বহন করছে খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার একটি গ্রামীণ সড়ক। তৎকালীন জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সড়কটির নামকরণ করা হয়েছিল ‘শহীদ আব্দুল মজিদ সড়ক’। দেওয়া হয়েছিল দ্রুত পিচঢালাই করে চলাচলের উপযোগী করার প্রতিশ্রুতিও। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। আজও ভাঙাচোরা ইট সলিংয়ের ওই সড়ক দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন রসুলপুর, দাতারামপাড়াসহ আশপাশের কয়েক হাজার মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু নামকরণেই সীমাবদ্ধ থেকেছে উদ্যোগ। শহীদের কবর সংরক্ষণ করা হলেও তাঁর বাড়ি ও কবরস্থানে যাওয়ার একমাত্র সড়কটি এখনো সংস্কার হয়নি। বর্ষা এলেই কাদায় পরিণত হওয়া এই সড়কে ছোটখাটো যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে।

রামগড় উপজেলার ২ নম্বর পাতাছড়া ইউনিয়নের নাকাপাস্থ ৩ নম্বর ওয়ার্ডের রসুলপুর গ্রামের বাসিন্দা আমিন মিয়ার মেজো ছেলে মো. মজিদ হোসেন (১৬) ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে শহীদ হন। পরিবারের দারিদ্র্যতা দূর করতে লেখাপড়া ছেড়ে ট্রাকের হেলপার হিসেবে কাজ নিয়েছিলেন তিনি।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে পণ্যবাহী ট্রাকে করে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে যান মজিদ। মালামাল খালাস করে ফেরার পথে হাজীগঞ্জ রেলক্রসিং এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে ট্রাকটিতে অগ্নিসংযোগ করা হলে ভেতরেই গুরুতর দগ্ধ হন তিনি। স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে হাজীগঞ্জ হাসপাতালে এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে যাওয়ায় ২৫ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২৬ জুলাই রসুলপুর গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। তিনিই পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র জুলাই শহীদ হিসেবে স্বীকৃত।

জুলাই শহীদ মজিদের নামে সড়কের প্রতিশ্রুতি এখনো কাগজে-কলমে, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ

জুলাই আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় খাগড়াছড়ির তৎকালীন জেলা প্রশাসক এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একাধিকবার শহীদ মজিদের বাড়ি ও কবর পরিদর্শন করেন। তাঁরা পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি নাকাপা পুলিশ ফাঁড়ির গোলঘরের সামনের খাগড়াছড়ি-ঢাকা আঞ্চলিক সড়ক থেকে শহীদের বাড়ি পর্যন্ত সড়কটি পিচঢালাই করে আধুনিক সড়কে রূপান্তরের আশ্বাস দেন।

একই সঙ্গে সেসময় সকলের সম্মতিতে সড়কটির নামকরণ করা হয় ‘শহীদ আব্দুল মজিদ সড়ক’। পরে সরকারি উদ্যোগে শহীদের কবর পাকা করে সংরক্ষণ করা হলেও সড়ক উন্নয়নের কাজ আর শুরু হয়নি।

এদিকে সময়ের সঙ্গে বদলি হয়েছেন জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা। কিন্তু মানুষের প্রত্যাশার সেই সড়ক এখনো অবহেলায় পড়ে আছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বহু বছর আগে ইট সলিং করা সড়কটির অধিকাংশ স্থান থেকেই ইট উঠে গেছে। ছোট-বড় অসংখ্য গর্তে পানি জমে থাকে। সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কটি কাদাময় ও পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। তখন সিএনজি অটোরিকশা এমনকি মোটরসাইকেলও চলাচল করতে পারে না।

ফলে রসুলপুর, দাতারামপাড়াসহ আশপাশের কয়েক হাজার মানুষ কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়েন। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থীরা। জরুরি রোগী হাসপাতালে নিতে হলে অনেক সময় পিঠে বহন করে কিংবা বাঁশ-কাঠের তৈরি ঝোলায় করে মূল সড়কে আনতে হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এর আগে, গতবছর জেলা প্রশাসক কর্তৃক শহীদ আব্দুল মজিদের কবর জিয়ারতের সময় আগের দিন রাতে তড়িগড়ি করে ইউপি সদস্যের মাধ্যমে ভাঙাচোরা ইট দিয়ে রাতারাতি সড়কটি জেলা প্রশাসক ও প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাদের গাড়ি চলাচলাচলের উপযোগী করা হয়। কিন্তু স্থায়ী সংস্কার আর করা হয় নি।

শহীদ আব্দুল মজিদের বড় ভাই ও পরিবহন শ্রমিক মহিন বলেন, ‘ডিসি স্যার নিজে এসে বলেছিলেন নাকাপা মেইন রোড থেকে আমাদের বাড়ি ও মজিদের কবর পর্যন্ত রাস্তা পিচঢালাই করে দেওয়া হবে। কিন্তু পরে আর কোনো কাজ হয়নি। আমরা সরকারের কাছে দ্রুত এই রাস্তা সংস্কারের দাবি জানাচ্ছি।’

রসুলপুর সমাজ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বহু পুরনো ইট সলিংয়ের এই রাস্তাটি এখন প্রায় চলাচলের অনুপযোগী। বৃষ্টি হলেই কাদায় একাকার হয়ে যায়। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ মানুষ, রোগী—সবাই সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন। শহীদ মজিদের বাড়ি ও কবরস্থানে যাওয়ার এই একমাত্র সড়কটি পিচঢালাই করা এখন সময়ের দাবি।

দীর্ঘদিন ধরে রসুলপুর জামে মসজিদের দেখাশোনা করা বৃদ্ধ তারু মিয়া বলেন, বর্ষাকালে মানুষ ঠিকমতো মসজিদে নামাজ পড়তে আসতে পারে না। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের জন্য রাস্তাটা খুবই কষ্টের। পিচঢালাই হলে সবাই উপকৃত হবে।

জুলাই শহীদ মজিদের নামে সড়কের প্রতিশ্রুতি এখনো কাগজে-কলমে, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ

শহীদ মজিদের বাবা আমিন মিয়া বলেন, আমার ছেলের কবর দেখতে অনেক মানুষ আসে। ডিসি স্যার রাস্তা করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আজও সেই রাস্তার কোনো কাজ হয়নি। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করব, যেন ছেলের স্মৃতির প্রতি সম্মান রেখে অন্তত এই রাস্তাটি করে দেওয়া হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এই সড়কটি শুধু শহীদ মজিদের বাড়ি বা কবরস্থানে যাওয়ার পথ নয়; এটি রসুলপুর ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত, রোগী পরিবহন থেকে শুরু করে ধর্মীয় কার্যক্রম—সবকিছুই এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল।

তাদের অভিযোগ, সময়ের পরিক্রমায় শুধু আশ্বাস মিললেও দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয়নি। ফলে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

এ বিষয়ে রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী শামীম জানান, বিষয়টি নিয়ে খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বিস্তারিত খবর নিয়ে জানানো হবে।

আর খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, রামগড় উপজেলার নাকাপা এলাকায় জেলার একমাত্র জুলাই শহীদ মজিদের সমাধিস্থল ও এলাকাবাসীর যাতায়াতের সুবিধার্থে সড়ক নিমার্ণের কাজ চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন বরাদ্দে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

উল্লেখ্য, একজন জুলাই শহীদের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি সড়ক বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থাকা শুধু একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, এটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্নও। শহীদ মজিদের কবর সংরক্ষণ করা হলেও তাঁর বাড়ি ও কবরস্থানে যাওয়ার একমাত্র সড়কটি এখনো চলাচলের অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। এতে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাচ্ছেন কয়েক হাজার মানুষ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু নামকরণ নয়—’শহীদ আব্দুল মজিদ সড়ক’কে দ্রুত পিচঢালাই করে একটি নিরাপদ ও টেকসই সড়কে রূপান্তর করা হবে, যাতে শহীদের স্মৃতির যথাযথ সম্মান রক্ষার পাশাপাশি এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগেরও অবসান ঘটে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed