এবার পার্বত্য চট্টগ্রামে ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য ব্রিটিশদের দায়ী করল ইউপিডিএফ
![]()
জার্নাল ডেস্ক
১৮৬০ সালের ১ আগস্ট পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক প্রশাসনিক জেলা হিসেবে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আনার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রথমবারের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন কথিত সংকটের ঐতিহাসিক ভিত্তির জন্য সরাসরি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকে দায়ী করেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন সংগঠনটির এই অবস্থানকে তাদের পূর্ববর্তী বাস্তবতাবিবর্জিত বক্তব্যের তুলনায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) ইউপিডিএফের সভাপতি প্রসিত খীসার দেয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, ১৮৬০ সালে ব্রিটিশরা স্বাধীন পার্বত্য রাজ্যকে জেলায় রূপান্তরের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা করে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ওই ঔপনিবেশিক শাসনের ফলেই পাহাড়ি জনগণের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়েছে এবং তাদের জাতীয় পরিচিতি ও অস্তিত্ব সংকটের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের নিরন চাকমা কর্তৃক স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে প্রসিত খীসা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে নব্য-উপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেতে জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে তিনি সরকারের কাছে সকল জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের “বিশেষ মর্যাদা” পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
তবে ইউপিডিএফের সর্বশেষ এই বক্তব্য তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সংগঠনটি অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন কথিত বৈষম্য, ভূমি বিরোধ, জাতিগত পরিচয়ের সংকট ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নীতি, প্রশাসন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়ে এসেছে। কিন্তু এবারের বিবৃতিতে প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক দায়’র কেন্দ্রবিন্দুতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউপিডিএফের এই বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে। একদিকে সংগঠনটি ব্রিটিশদের পার্বত্য চট্টগ্রামে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা এবং পাহাড়ি জনগণের সংকটের জন্য দায়ী করছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে তারা ব্রিটিশ আমলে প্রণীত সিএইচটি রেগুলেশন, ১৯০০ বা পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন বহাল রাখার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে।
উল্লেখ্য, অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন-১৯০০-এর বিভিন্ন বিধান বাতিল বা সংশোধনের উদ্যোগের বিরোধিতা করে ইউপিডিএফসহ কয়েকটি আঞ্চলিক সংগঠন আন্দোলন করেছে। তাদের দাবি ছিল, এই আইন পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্য ও ভূমি সুরক্ষার অন্যতম ভিত্তি।
এ অবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কঠোর সমালোচনা, অন্যদিকে একই শাসনামলে প্রণীত একটি আইনকে বহাল রাখার দাবিতে আন্দোলন—এই দুই অবস্থানের মধ্যে দৃশ্যমান একটি নীতিগত বৈপরীত্য রয়েছে। তাদের ভাষ্য, ইউপিডিএফের উচিত এই দুই অবস্থানের সম্পর্ক স্পষ্ট করা, যাতে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়।
ইউপিডিএফ তাদের সর্বশেষ বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করেছে যে, “পার্বত্য চট্টগ্রামকে জেলায় উন্নীতকরণ” শব্দবন্ধটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের উদ্ভাবিত ইতিহাস বিকৃতির অংশ। একই সঙ্গে তারা সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে এই ভাষ্য ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছে।
সমালোচদের মতে, এতদিন পাহাড়িদের জাতিস্বত্তা ও অস্তিত্ব হুমকির কথা বলে সরকার ও নিরাপত্তাবাহিনীকে দায়ী করলেও এখন আবার এই প্রেস বিজ্ঞপ্তির মা্ধ্যমে তারা বলছে, বৃটিশদের কারনেই তাদের জাতিস্বত্তা ও অস্তিত্ব হুমকির মুখে। এতে করে প্রমাণ হলো, তারা এতদিন নিজেদের স্বার্থ ও অবৈধ সন্ত্রাস টিকিয়ে রাখতে সরকার ও নিরাপত্তাবাহিনীকে জড়িয়ে অপপ্রচারে লিপ্ত ছিলো।
সর্বশেষ, এই বিবৃতির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার এবং বর্তমান রাজনৈতিক দাবিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে ইউপিডিএফ। তবে সংগঠনটির এই নতুন ব্যাখ্যা ভবিষ্যতে তাদের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক বক্তব্য ও অবস্থানের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, সে প্রশ্ন এখন আলোচনায় উঠে এসেছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।