ইউএনওদের দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার সঙ্গে কাজ করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা প্রত্যেকের জন্য মানুষের সেবা করার সুযোগ একটি বড় আমানত ও আল্লাহর নিয়ামত। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে যেতে হবে।
শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে নিজ কার্যালয়ে বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ইউএনওদের সঙ্গে আয়োজিত এক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আমরা আছি, কাল থাকব না। আসুন, আমরা সবাই মিলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ রেখে যাওয়ার চেষ্টা করি, যেখানে সবাই একটু ভালো থাকবে।
মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জনগণ ও সরকারের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনরত উপজেলা হয়তো সংশ্লিষ্ট ইউএনওর নিজ এলাকা নয়, কিন্তু সেটি বাংলাদেশেরই একটি অংশ। সেখানে বসবাসকারী মানুষও নিজের এলাকার মানুষের মতোই আপন। তাই দেশের প্রতিটি মানুষকে নিজের মানুষ মনে করে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, আপনি যে উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছেন, সেটি হয়তো আপনার নিজের উপজেলা নয়। কিন্তু সেই উপজেলা তো আপনার দেশেরই একটি অংশ। সেখানে যে মানুষগুলোকে দেখছেন, তারা হয়তো আপনার এলাকার মানুষ নন; কিন্তু আপনার সেই আপনজনদের মতোই মানুষ। ছোট একটি দেশ—এই দেশটাকে ঠিকঠাক করতে হলে আমাদের সবাইকে মিলেই চেষ্টা করতে হবে।
শুধু আইন করে সমাজের সব সমস্যা সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান করা যায়। তিনি ইউএনওদের নিজ নিজ এলাকায় জনসচেতনতা তৈরিতে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।
পরিবেশ রক্ষায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন দূষণের দিক থেকে ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ শহরগুলোর তালিকায় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এই ইতিবাচক প্রবণতাকে আরও এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, উপজেলা ও পৌরসভাগুলোতে অনেক মানুষ নিজেদের উদ্যোগে গাছ লাগাতে চান। আপনাদের মতো সরকারি কর্মকর্তারা তাদের উৎসাহ দিলে একজন যেখানে ১০টি গাছ লাগাতেন, সেখানে ৫০টি গাছ লাগাতে পারেন।
খেলাধুলার প্রসারেও ইউএনওদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠনকে উৎসাহিত করলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত তরুণদের মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়।

তিনি বলেন, খেলাধুলার আয়োজনের জন্য শুধু বিজয় দিবস বা স্বাধীনতা দিবসের মতো জাতীয় দিবসের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। স্থানীয়ভাবে ভালো যে কোনো বিষয়, এমনকি কোনো স্থানীয় ব্যক্তির জন্মদিন উপলক্ষেও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে।
সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের মধ্যে দিন দিন দয়া-মায়া কমে যাচ্ছে এবং নিষ্ঠুরতা বাড়ছে। বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও সামাজিক চাপ এর অন্যতম কারণ হতে পারে। এই প্রবণতা বাড়তে থাকলে সমাজের শান্তি নষ্ট হবে। তাই মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা বাড়াতে ইউএনওদের উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, “সৃষ্টির সেরা জীব যদি আমরা হয়ে থাকি, তাহলে শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও ভাবতে হবে।” শুধু মানুষের প্রতি নয়, পশুপাখি ও প্রকৃতির প্রতিও যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে শিশুদের এ বিষয়ে সচেতন করার পরামর্শ দেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, এবার থেকে প্রাথমিক স্তর থেকেই শিশুদের মধ্যে মানবিকতা, পরিবেশ সচেতনতা এবং পশুপাখির প্রতি মমত্ববোধের বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, একসময় পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের মাধ্যমে মানুষকে সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তোলা হতো। বর্তমানে সেই মূল্যবোধ অনেকটাই অনুপস্থিত। এগুলো ফিরিয়ে আনতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
সভায় বিভিন্ন উপজেলায় খাল খনন প্রকল্পের কাজ সততার সঙ্গে সম্পন্ন করে উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ায় ইউএনওদের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আপনারা সরকার ও জনগণের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাতে আমার বিশ্বাস, আপনারা জনগণের জন্য আরও অনেক ভালো কাজ করতে পারবেন।
ইউএনওরা সভায় নিজ নিজ উপজেলায় খাল পুনঃখননের ফলে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও জনজীবনে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন।
তারা জানান, যেসব এলাকায় আগে বছরে দুই ফসল হতো, সেখানে এখন তিন ফসল উৎপাদন হচ্ছে। খাল পুনঃখননের ফলে পানি নিষ্কাশন, সেচব্যবস্থা ও কৃষিকাজে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দিন দিন আমাদের পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। এর মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বন্যপ্রাণী ও পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুর না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ হোক সব প্রাণী ও প্রাণের জন্য নিরাপদ একটি দেশ।
সভায় খাল খনন প্রকল্পের উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া ৮৩টি উপজেলার ইউএনও ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।