আত্মপরিচয়ের টানাপোড়েন: রাখাইন-চাকমাদের পরিচয় ঘিরে আদিবাসী বিতর্ক
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক, কক্সবাজার
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে আবারও আলোচনায় এসেছে দেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। বিশেষ করে কক্সবাজারের রাখাইন জনগোষ্ঠী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন মহলে মতপার্থক্য ও আলোচনা দেখা দিয়েছে। চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যাসহ অনেক জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে, কক্সবাজারের রাখাইনদের একটি অংশ বলছেন, তারা নিজেদের পরিচয় ‘ ‘রাখাইন’ হিসেবেই তুলে ধরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন; তাদের কাছে এই পরিচয়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে, ১৭৮৪ সালে বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) আরাকান রাজ্য দখলের পর কিংবা তার কিছু আগে-পরে বহু রাখাইন বর্তমান বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন। বর্তমানে কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনাসহ কয়েকটি জেলায় তাদের বসবাস রয়েছে।
একইভাবে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যাসহ পার্বত্য অঞ্চলের কয়েকটি জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদেরও বিভিন্ন সময়ে বর্তমান মিয়ানমারের অঞ্চল থেকে আগমনের ঐতিহাসিক তথ্য রয়েছে বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এসব জনগোষ্ঠী নিজেদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছে। এ অবস্থায় একই ধরনের ঐতিহাসিক উৎস থাকা সত্ত্বেও রাখাইনদের অবস্থান ভিন্ন হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কক্সবাজারের রাখাইন সম্প্রদায়ের একাধিক ব্যক্তি বলেন, তারা নিজেদের পরিচয় ‘রাখাইন’ হিসেবেই দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাদের কাছে জাতিগত পরিচয়ই প্রধান; ‘আদিবাসী’ পরিচয় ব্যবহার করা বা না করা তাদের জন্য মুখ্য বিষয় নয়।
আদিবাসী ফোরাম কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মংথেহ্লা রাখাইন বলেন, “রাখাইন সম্প্রদায়ের একটি অংশ নিজেদের শুধু রাখাইন পরিচয়ে থাকতে চান এবং আদিবাসী স্বীকৃতির দাবি করেন না। আমার মতে, তারা হয়তো আন্তর্জাতিক পরিসরে আদিবাসীদের অধিকার ও এ–সংক্রান্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে পর্যাপ্তভাবে অবগত নন। তবে যারা এ বিষয়ে সচেতন ও অবহিত, তারা আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের তাৎপর্যের সঙ্গে একমত।”
তিনি বলেন, “আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারের কাছে আমাদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানাই। একই সঙ্গে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও অধিকার সুরক্ষায় একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনেরও জোর দাবি জানাই। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবে আমরা নানা ক্ষেত্রে অধিকারবঞ্চনার শিকার হই। আমরা সেই বৈষম্যের অবসান চাই এবং অন্যান্য নাগরিকের মতো সমান অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করি।”
আদিবাসী ফোরাম কক্সবাজার জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক আলো চাকমা বলেন, “আমরা প্রতিবছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করে আসছি। এ উপলক্ষে কক্সবাজারের উখিয়া, রামু, চৌফলদণ্ডীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ৯ আগস্ট কক্সবাজার শহরে একত্রিত হবো। সেখানে আমরা আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ন্যায্য অধিকার নিয়ে নিজেদের দাবি তুলে ধরবো। অন্যান্য বছরের মতো এবারও আমরা সরকারের কাছে আমাদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানাব।”
বিশ্লেষকদের মতে, ‘আদিবাসী’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ কিংবা ‘জাতিগত জনগোষ্ঠী’ এসব পরিচয় শুধুমাত্র ভাষাগত নয়; এর সঙ্গে ইতিহাস, আন্তর্জাতিক আইন, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়ও জড়িত। ফলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে ভিন্নমত থাকাটা স্বাভাবিক হলেও এ বিষয়ে তথ্যভিত্তিক ও সংবেদনশীল আলোচনা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে যখন আদিবাসী স্বীকৃতির দাবিতে কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, তখন কক্সবাজারের রাখাইন সম্প্রদায়ের অবস্থান এবং চাকমাসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর দাবির পার্থক্য বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
‘আদিবাসী’ ও ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ এর মধ্যে পার্থক্য, বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিকভাবে একটি জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে বিবেচনার মানদণ্ড সম্পর্কে মতামত জানতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী ড. নাসির উদ্দিনের কাছে ই-মেইলে (rnu.cu.bd@gmail.com) বক্তব্য চাওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
আদিবাসী ফোরাম কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মংথেহ্লা রাখাইন বলেন, কক্সবাজারে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নাচ-গানসহ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা আয়োজন ও সমন্বয়ের জন্য ফোরাম কাজ করে যাচ্ছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।