পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ‘আদিবাসী’ বিতর্ক: আইনি ভিত্তি ও ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ‘আদিবাসী’ বিতর্ক: আইনি ভিত্তি ও ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ‘আদিবাসী’ বিতর্ক: আইনি ভিত্তি ও ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

বিশেষ প্রতিবেদক, রাঙামাটি

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও নৃ-গোষ্ঠীগুলোর বহুমাত্রিক জীবনযাত্রার জন্য পরিচিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড। তবে পাহাড়ের এই সৌন্দর্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে ভূমি, প্রশাসন, পরিচয়, সাংবিধানিক অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে ঘিরে নানা জটিলতা। সাম্প্রতিক সময়ে এসব বিতর্কের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে একটি শব্দ—‘আদিবাসী’।

পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর একটি অংশ নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি সংগঠনগুলোর একটি অংশ এ দাবিকে ঐতিহাসিক, সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করে। তাদের অবস্থান—রাষ্ট্রের সংবিধান ও প্রচলিত আইনে ব্যবহৃত ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’, ‘জাতিসত্তা’ বা সংশ্লিষ্ট পরিভাষাই সরকারি ও সাংবিধানিকভাবে অনুসরণ করা উচিত।

ফলে ‘আদিবাসী’ শব্দটি এখন শুধু একটি পরিচয়ের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইতিহাসের ব্যাখ্যা, প্রথাগত ভূমির অধিকার, প্রশাসনিক কাঠামো, আত্মপরিচয়, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক আদিবাসী অধিকার-সংক্রান্ত ধারণা।

আইনি বাস্তবতা কোথায়?

ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে ১৯০০ সালের Chittagong Hill Tracts Regulation বা পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনের নাম ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে প্রণীত এই বিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য সমতল অঞ্চলের তুলনায় পৃথক প্রশাসনিক ও ভূমি ব্যবস্থাপনার কিছু কাঠামো রাখা হয়। এর মাধ্যমে পাহাড়ের ভূমি, প্রথাগত ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বিশেষ বিধান কার্যকর ছিল।

পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিতে পাহাড়ের জনগোষ্ঠী ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিষয়ে বিভিন্ন বিধান যুক্ত হয়। চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২৩(ক) অনুচ্ছেদে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, নৃ-সম্প্রদায়, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও সম্প্রদায়’-এর স্বতন্ত্র স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা বলা হয়।

তবে ‘আদিবাসী’ শব্দটি সংবিধানে ব্যবহৃত হয়নি। আর সেই আদিবাসী পরিচয়কে ঘিরেই বর্তমান বিতর্কের সূত্রপাত।

একদিকে পাহাড়ের বিভিন্ন সংগঠন ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, কোনো আইনে নির্দিষ্ট একটি শব্দ না থাকলেই একটি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দাবি অগ্রাহ্য হয়ে যায় না। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের যুক্তি, রাষ্ট্রীয় আইন ও সাংবিধানিক কাঠামোয় যে পরিভাষা নির্ধারিত রয়েছে, সরকারি কার্যক্রমে সেটিই অনুসরণ করা উচিত।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির প্রশ্ন

‘আদিবাসী’ পরিচয়ের বিতর্কটি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে Indigenous Peoples বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আলোচনা ও নীতিমালা রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন ঘোষণাপত্র ও আন্তর্জাতিক আলোচনায় ভূমি, সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য, আত্মপরিচয় ও অংশগ্রহণের অধিকার গুরুত্ব পেয়েছে।

এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রথাগত ভূমি, সাংস্কৃতিক অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও আলোচিত হয়। এ কারণেই বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে শব্দটি নিয়ে বিতর্কটি অন্য অনেক পরিচয়গত বিতর্কের তুলনায় বেশি রাজনৈতিক ও সংবেদনশীল।

ফলে বিষয়টি নিয়ে আবেগের পরিবর্তে সংবিধান, আন্তর্জাতিক আইন, ঐতিহাসিক দলিল এবং বাংলাদেশের বাস্তব রাজনৈতিক কাঠামো, ভৌগলিক অবস্থান সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পাহাড়ি নেতৃত্বের বক্তব্য: ‘আদিবাসী’ পরিচয় আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ি সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের বক্তব্য, ‘উপজাতি’ কিংবা ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ পরিভাষা তাদের আত্মপরিচয় ও ঐতিহাসিক অস্তিত্বকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে না। তাদের মতে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাহাড়ে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক এবং সামাজিক কাঠামো রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর আলোকে তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।

তাদের আরও বক্তব্য, ১৯০০ সালের রেগুলেশন কিংবা ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিতে ‘আদিবাসী’ শব্দটি না থাকলেও সময়ের সঙ্গে পরিচয় ও অধিকার নিয়ে নতুন দাবি উত্থাপিত হতে পারে। তাদের মতে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক বা আইনি দলিলে ব্যবহৃত শব্দ দিয়ে কোনো জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের ভবিষ্যৎ দাবি চিরতরে নির্ধারণ করা যায় না।

বাঙালি সংগঠনগুলোর অবস্থান: সার্বভৌমত্ব ও সমঅধিকার

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদসহ বিভিন্ন বাঙালি সংগঠনের অবস্থান ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদের বসতি বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডের বাইরে ভারত ও মিয়ানমারে বিস্তৃত ছিল। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার, ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরামসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সঙ্গে মানুষের চলাচল ও বসতি পরিবর্তনের ইতিহাস রয়েছে।

এই পক্ষের নেতারা মনে করেন, এই ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার নিয়ে সতর্কভাবে আলোচনা প্রয়োজন। তাদের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে Indigenous Peoples-এর জন্য প্রযোজ্য কিছু অধিকারকে বাংলাদেশের বাস্তবতায় সরাসরি প্রয়োগের চেষ্টা করলে ভবিষ্যতে ভূমি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

‘পরিচয়ের পরিবর্তন কেন?’

পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য হাবীব আজম বলেন, বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ‘আদিবাসী’ শব্দচয়নের বিষয়টি এক করে দেখার সুযোগ নেই।

তার দাবি, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বসতি এ ভূখণ্ডে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। তিনি বলেন, বিভিন্ন জনগোষ্ঠী পার্শ্ববর্তী বার্মা, ভারতের তিব্বত, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মঙ্গোলীয় ও চীনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধ, সংঘাত ও অন্যান্য কারণে বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এসে বসতি স্থাপন করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ‘আদিবাসী’ বিতর্ক: আইনি ভিত্তি ও ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ

হাবীব আজমের দাবি, চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের কিছু লেখক ও গবেষকের লেখাতেও তাদের জনগোষ্ঠীর অভিবাসন ও বসতি পরিবর্তনের ইতিহাসের উল্লেখ রয়েছে। তার ভাষায়, ‘তারা আদিবাসী নয়’—এমন বক্তব্য বিভিন্ন লেখায় ও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।

‘আদিবাসী’ শব্দকে ঘিরে রাজনৈতিক আশঙ্কা

‘আদিবাসী’ শব্দটির একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাহাড়ের রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করেন হাবীব আজম। তার অভিযোগ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতি পরিচয়কে ‘খাটো’ বা ‘অপমানজনক’ হিসেবে উপস্থাপন করে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের স্বীকৃতির আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে উসকে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি মনে করেন, এর পেছনে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে। এমনকি তিনি এটিকে রাষ্ট্র ভাগ করার ষড়যন্ত্র হিসেবেও দেখছেন এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

১৯০০ সালের রেগুলেশন নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা

১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য রয়েছে।

হাবীব আজম বলেন, এই বিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় রাখা হয়েছিল। পাহাড়ের বাইরে থেকে মানুষের যাতায়াত ও বসতি স্থাপন, প্রথাগত আইন এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিষয়ে বিশেষ বিধান ছিল। তার মতে, পাহাড়ের কিছু পক্ষ এসব ঐতিহাসিক বিধান বহাল রাখার দাবি করলেও একই বিধানের অন্যান্য অংশ—বিশেষ করে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রশাসনের ক্ষমতা—নিয়ে আপত্তি জানায়।

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত নেতৃত্বকে ঐতিহাসিকভাবে ‘সার্কেল চিফ’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বর্তমানে তাদের ‘রাজা’ হিসেবে অভিহিত করার প্রবণতা রয়েছে। তার মতে, এ বিষয়টিও ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

হাবীব আজমের ভাষ্য, ১৯০০ সালের বিধানের বিভিন্ন ধারায় সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে এবং বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু বিধান বহাল রাখার দাবি করছে। তার দৃষ্টিতে এটি একটি ‘স্ববিরোধী’ অবস্থান।

অন্যদিকে পাহাড়ি নেতাদের বক্তব্য, ১৯০০ সালের রেগুলেশন পাহাড়ের ঐতিহাসিক প্রথাগত প্রশাসন ও ভূমি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাদের মতে, এই বিধানের সঙ্গে ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিরও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে রেগুলেশনের প্রশ্নটি উপেক্ষা করা হলে শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

ব্রিটিশ আমলের প্রশাসন ও বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা

হাবীব আজমের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় রাখার পেছনে ঔপনিবেশিক শাসকদের নিজস্ব প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল। ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল এবং কোথাও ‘নন-রেগুলেটেড এরিয়া’, কোথাও ‘প্রিন্সলি স্টেট’ কিংবা অন্যান্য বিশেষ কাঠামো কার্যকর ছিল।

তার মতে, ব্রিটিশ শাসনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক প্রশাসন ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা। ফলে তৎকালীন প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে স্বাধীন বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা উচিত নয়।

তিনি বলেন, ভারত স্বাধীনতার পর ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থার আওতায় বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য বিশেষ সাংবিধানিক ব্যবস্থা করেছে এবং সময়ের সঙ্গে সেসব ব্যবস্থার পরিবর্তনও ঘটেছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারতের ৩৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।

হাবীব আজমের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও একইভাবে ঔপনিবেশিক আমলের আইনকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

‘এক দশমাংশ ভূখণ্ড’ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন

বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ—প্রায় এক দশমাংশ এলাকা। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন জেলা নিয়ে গঠিত অঞ্চলটির ভৌগোলিক অবস্থানও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী হওয়ায় অঞ্চলটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

হাবীব আজম বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে ফেডারেল বা প্রাদেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিধান নেই। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলের জন্য এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো গ্রহণ করা যায় কি না, যেখানে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বাইরে আলাদা স্বায়ত্তশাসনের ধারণা কার্যকর হবে—এটি গভীরভাবে বিবেচনা করা দরকার।

তার মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘এক্সক্লুডেড’ বা ‘নন-রেগুলেটেড’ এলাকার ঐতিহাসিক কাঠামোতে ফিরিয়ে নেওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি আরও বলেন, ১৯০০ সালের বিধানকে অন্য সাধারণ আইনের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তার ভাষায়, এর সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। তাই ঔপনিবেশিক আমলের আইন স্বাধীন রাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়, সেটিই হওয়া উচিত আলোচনার বিষয়।

পাহাড়ি পক্ষের পাল্টা বক্তব্য

‘আদিবাসী’ ফোরাম রাঙামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইন্টু মনি চাকমা অবশ্য বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখছেন।

তিনি বলেন, সরকার সমতলের জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং তাদের দাবির প্রেক্ষিতে বিজন সরকারকে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর দাবির বিষয়ে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ‘আদিবাসী’ বিতর্ক: আইনি ভিত্তি ও ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ

ইন্টু মনি চাকমার ভাষ্য, তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য চেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত সাড়া পাননি। তার মতে, সরকার পাহাড়ের বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। তবে তিনি বলেন, তারা এখনও আশাবাদী এবং সরকারের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ প্রত্যাশা করছেন।

১৯০০ সালের সিএইচটি রেগুলেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই বিধানকে সামনে রেখেই পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাই সরকার যদি ১৯০০ সালের রেগুলেশনের ঐতিহাসিক কাঠামোকে অস্বীকার করে, তাহলে শান্তিচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হবে।

তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের প্রথাগত আইন ও প্রশাসনিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়েই শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল। তাই বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন।

দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে শুধু একটি শব্দ নয়

বিশ্লেষকদের মতে, ‘আদিবাসী’ বনাম ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ বিতর্ককে শুধু একটি শব্দের লড়াই হিসেবে দেখলে পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল বাস্তবতা বোঝা কঠিন হবে। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভূমি ব্যবস্থাপনা, ঐতিহ্যগত অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতা, প্রশাসনিক কাঠামো, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

একদিকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ মনে করে, তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও ঐতিহাসিক অধিকারের যথাযথ স্বীকৃতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। অন্যদিকে বাঙালি সংগঠনগুলো মনে করে, বিশেষ কোনো পরিচয়ের ভিত্তিতে অতিরিক্ত রাজনৈতিক বা ভূমিগত অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা রাষ্ট্রের সমঅধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

এ কারণে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির প্রশ্নটি সমাধানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আবেগের পরিবর্তে ইতিহাস, সংবিধান, আন্তর্জাতিক আইন, শান্তিচুক্তি এবং বাংলাদেশের জাতীয় ও ভৌগলিক নিরাপত্তা—সবকিছুকে একই সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থানও এই বিতর্ককে বিশেষভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছে। অঞ্চলটি একদিকে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম, অন্যদিকে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত ভূ-রাজনৈতিক বলয়ের কাছাকাছি অবস্থান এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে ঐতিহাসিকভাবে অঞ্চলটি নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংঘাত, সশস্ত্র আন্দোলন, সীমান্তপারের যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা হয়েছে। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সশস্ত্র সংঘাতের অবসানের একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হলেও ভূমি, পরিচয় ও প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রশ্ন পুরোপুরি সমাধান হয়নি।

এই বাস্তবতায় ‘আদিবাসী’ পরিচয়কে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হলে তা যেন কোনোভাবেই পাহাড়ি-বাঙালি বিভাজন বাড়িয়ে না দেয়—এ বিষয়ে রাষ্ট্রের সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ।

সমাধান কোথায়?

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিতর্কের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত এখানেই—রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পাহাড়ের জনগোষ্ঠীগুলোর সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা।

‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দেওয়া হবে কি না, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ পরিভাষাই বহাল থাকবে কি না, ১৯০০ সালের রেগুলেশনের কোন কোন বিধান বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির কোন কোন অংশ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক উত্তেজনা দিয়ে নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার, ভূমির নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

কারণ পরিচয়ের প্রশ্ন যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, শেষ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তি নির্ভর করবে সেখানে বসবাসকারী সব জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার ওপর।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান, অতীতের সশস্ত্র সংঘাত, সীমান্তবর্তী বাস্তবতা এবং দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে পরিচয়-রাজনীতির যেকোনো নতুন মেরুকরণকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাহাড়ের জনগোষ্ঠীগুলোর সাংস্কৃতিক ও নাগরিক অধিকার নিয়ে বৈধ দাবিগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগও জরুরি। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে— কোনো দাবির আড়ালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কার্যক্রমের সুযোগও না দেওয়া।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *