লামায় ৪০টি ইটভাটায় চলছে পাহাড় ধ্বংসের মহোৎসব, নেপথ্যে মোক্তার-নাজু সিন্ডিকেট

লামায় ৪০টি ইটভাটায় চলছে পাহাড় ধ্বংসের মহোৎসব, নেপথ্যে মোক্তার-নাজু সিন্ডিকেট

লামায় ৪০টি ইটভাটায় চলছে পাহাড় ধ্বংসের মহোৎসব, নেপথ্যে মোক্তার-নাজু সিন্ডিকেট
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

বান্দরবানের লামা উপজেলায় আসন্ন ইটভাটার মৌসুমকে সামনে রেখে পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশ আইন ও প্রশাসনের নজরদারিকে উপেক্ষা করে এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের ঢাল কেটে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘মোক্তার-নাজু’ নামে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত। পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তিকে প্রভাবিত বা ‘ম্যানেজ’ করে সিন্ডিকেটটি দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, লামা উপজেলায় প্রায় ৪০টি বা তারও বেশি ইটভাটা সক্রিয় রয়েছে। এসব ভাটার মাটির চাহিদা মেটাতে প্রতিবছরই বিভিন্ন এলাকা থেকে পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ করা হয়। তবে চলতি মৌসুমে পাহাড় কাটার ব্যাপকতা অতীতের তুলনায় বেড়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, বড় বড় পাহাড়ের ঢাল এক্সকাভেটর দিয়ে কেটে খাড়া করে ফেলা হয়েছে। কোথাও পাহাড়ের পাদদেশে জমা করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাটি। এসব মাটি ইটভাটায় পরিবহনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

লামায় ৪০টি ইটভাটায় চলছে পাহাড় ধ্বংসের মহোৎসব, নেপথ্যে মোক্তার-নাজু সিন্ডিকেট

বর্ষার মধ্যেই পাহাড়ের ঢাল এভাবে কেটে ফেলার ফলে অতিবৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে যেকোনো সময় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশে বসতি ও চলাচলের পথ থাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুমে পাহাড় কাটার কারণে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ছে। পাহাড় কেটে ফেলার পর সেখানে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচে নেমে এসে আশপাশের কৃষিজমি ও বসতবাড়িতে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করছে।

স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, লামার ফাইতং ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু ইটভাটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, লোকালয় ও বনাঞ্চলের কাছাকাছি স্থাপন করা হয়েছে। ইটভাটার ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি বাড়ছে।

বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া শিশু ও শিক্ষার্থীদের কাশি, শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা ও অ্যালার্জিসহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে ভোগা ব্যক্তিদের জন্য ইটভাটার ধোঁয়া আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরিবেশ নিয়ে কাজ করা স্থানীয় ব্যক্তিদের মতে, ইটভাটার ধোঁয়া ও বিভিন্ন ধরনের নির্গমন আশপাশের কৃষিজমি ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা হ্রাস, কৃষি উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব এবং পাখি ও ক্ষুদ্র প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

লামায় ৪০টি ইটভাটায় চলছে পাহাড় ধ্বংসের মহোৎসব, নেপথ্যে মোক্তার-নাজু সিন্ডিকেট

পাহাড় কাটা ও অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান চললেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুল হাসান সজীব বলেন, বান্দরবানে যোগদানের পর গত তিন মাসে অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটার দায়ে ২৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে। এ সময়ে পাঁচটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান চলমান রয়েছে।

তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান ও জরিমানার পরও কীভাবে পাহাড় কাটা অব্যাহত রয়েছে—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, শুধু জরিমানা আদায় করলেই কি পাহাড় কাটা বন্ধ করা সম্ভব, নাকি অবৈধভাবে পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও স্থায়ী ব্যবস্থা প্রয়োজন?

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, পাহাড় রক্ষায় কেবল অভিযান ও জরিমানা নয়, পাহাড় কাটার উৎস বন্ধ, অবৈধ মাটি পরিবহন নিয়ন্ত্রণ এবং ইটভাটাগুলোর বৈধতা ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়মিত যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *