পাহাড়ে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়িয়ে জাতিগত সংঘাত, অভিযোগ অপপ্রচারের

পাহাড়ে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়িয়ে জাতিগত সংঘাত, অভিযোগ অপপ্রচারের

পাহাড়ে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়িয়ে জাতিগত সংঘাত, অভিযোগ অপপ্রচারের
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

পার্বত্য চট্টগ্রামে গুজব, অপপ্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি ছড়িয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির অভিযোগ উঠেছে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে। নারী ও স্কুলগামী শিশুদেরও নাশকতায় ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব কৌশলে পরিকল্পিতভাবে এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে।

বিশেষ করে গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে খাগড়াছড়ি, গুইমারা ও আশপাশের এলাকায় সংঘটিত ধারাবাহিক ঘটনাগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, একটি বিচ্ছিন্ন অভিযোগ কেন্দ্র করে শুরু হওয়া উত্তেজনা দ্রুত বিক্ষোভ, অবরোধ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা, গুলি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রূপ নেয়। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলে প্রশাসনকে ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ঘটনাগুলোর নেপথ্যে সশস্ত্র সংগঠনের সদস্য ও তাদের সহযোগীদের পরিকল্পিত তৎপরতা, বহিরাগতদের ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক অপপ্রচারের যোগসূত্র রয়েছে। ফলে এসব ঘটনা শুধু স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের স্বার্থের জন্য জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের মতো অধিবেশনে অংশ নিয়ে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে একটি গোষ্ঠী। এছাড়া বিদেশি ফান্ড নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ডকুমেন্টারি তৈরি করে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থানরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। এতে পার্বত্য অঞ্চলে ফের অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে।

যা ঘটেছিল গত বছর

গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালা এলাকায় এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ইউপিডিএফের দাবি অনুযায়ী সন্দেহভাজন শয়ন শীলকে পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করে সেনাবাহিনী। পরে তাকে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও ইউপিডিএফের অঙ্গসংগঠন পিসিপির নেতা উখ্যানু মারমা ‘জুম্ম ছাত্র জনতার’ ব্যানারে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের ডাক দেন।

পাহাড়ে সংঘাতপাহাড়ে সহিংসতার প্রতিবাদে পাহাড়িদের মানববন্ধন/ফাইল ছবি

২৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় ২৫ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফের আহ্বানে অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়। একই সময়ে দেশি-বিদেশি কিছু ব্লগার ও পার্বত্য অঞ্চলের কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি অনলাইনে বাঙালিদের উদ্দেশ্য করে অপপ্রচার চালায়।

২৬ সেপ্টেম্বর উখ্যানু মারমার নেতৃত্বে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উসকানিতে খাগড়াছড়িজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অবরোধ চলাকালে ইউপিডিএফের প্ররোচনায় টহলরত সেনাদলের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়, এতে তিনজন সেনা সদস্য আহত হন। সেনাবাহিনী সংযম দেখিয়ে বলপ্রয়োগ না করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখে।

পরদিন ২৭ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফ কর্মীরা পুনরায় দাঙ্গা-হাঙ্গামার চেষ্টা চালায়। খাগড়াছড়ি পৌরসভা এলাকায় বাঙালি ও সাধারণ মানুষের ওপর গুলি, ভাঙচুর, অ্যাম্বুলেন্সে আক্রমণ এবং রাস্তা অবরোধ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটায়। পরিস্থিতি পাহাড়ি-বাঙালির দাঙ্গায় রূপ নিলে জেলা প্রশাসন খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় ১৪৪ ধারা জারি করে। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত তৎপরতায় সেদিন রাতেই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে আসে।

পরদিন ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল থেকেই ইউপিডিএফ কর্মীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে গুইমারা উপজেলার রামসু বাজারে অবরোধ গড়ে তোলে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইউপিডিএফ কর্মীরা বাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় জড়ায় এবং সেনাবাহিনীর ওপর দেশীয় অস্ত্র, ইট-পাটকেল ও গুলতি নিয়ে হামলা চালায়। এতে সেনাবাহিনীর তিন কর্মকর্তা ও ১০ সদস্য আহত হন। একই সময়ে রামগড়ে বিজিবির গাড়ি ভাঙচুর ও সদস্যদের আহত করার ঘটনাও ঘটে।

পাহাড়ে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়িয়ে জাতিগত সংঘাত, অভিযোগ অপপ্রচারের পাহাড়িদের মিছিল/ফাইল ছবি

২৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে বিজিবির কাপ্তাই ব্যাটালিয়নের একটি চেকপোস্টে ইউপিডিএফের পরিবহন করা বিপুল দেশীয় অস্ত্র জব্দ করা হয়।

গত বছরের ১৯ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খাগড়াছড়ি ও গুইমারা এলাকায় বিভিন্ন ঘটনা পুঁজি করে আইনের আশ্রয় না নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলকে অস্থিতিশীল ও দাঙ্গা সংগঠনের বিষয়টি একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে প্রতীয়মান। এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রমাণাদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

হত্যা ও অপহরণ

গত এক বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে ১০৫টি সংঘর্ষে প্রাণ গেছে ২৬ জনের। একই সময়ে অপহরণের শিকার হয়েছেন ৪৮ জন। নিহতদের মধ্যে ২৪ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ও দুজন বাঙালি। আহতদের মধ্যে ১৬ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ও ২৩ জন বাঙালি।

চাঁদা আদায় ও সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কেন্দ্র করে অপহরণের ঘটনা বাড়ছে। গত এক বছরে ৪৮ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এবং ২৯ জন বাঙালি। অপহৃতদের মধ্যে ব্যবসায়ী, বাগান ব্যবস্থাপক, নির্মাণশ্রমিক, মোবাইল টাওয়ার মেকানিক ও গাড়িচালকও রয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো খুবই তৎপর। তারা প্রায়ই মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পার্বত্য অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ। এসব মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর ফলে জাতিগত সংঘাত তৈরি হয়।

জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের অধিবেশন ঘিরে পাহাড়ি সংগঠনের অপতৎপরতা

পাহাড়ে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়িয়ে জাতিগত সংঘাত, অভিযোগ অপপ্রচারের পাহাড়ে জাতিগত সংঘাত/ফাইল ছবি

বাংলাদেশ সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী দেশে কোনো ‘আদিবাসী’ নেই। এরপরও বাংলাদেশের পাহাড়ি সংগঠন ও ব্যক্তিদের উল্লিখিত সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়। দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ব্যক্তিরা এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশবিরোধী অপপ্রচার চালায়। জেএসএস সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার কানাডা প্রবাসী নাতনি অগাস্টিনা চাকমা এর মধ্যে অন্যতম।

এছাড়াও ছনছনা চাকমা, প্রীতিবিন্দু চাকমা, খোকন চাকমা, বিজুবি চাকমা, পল্লব চাকমা ও টনি চিরান গত ২০ এপ্রিল থেকে ১ মে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশনে অংশ নেন এবং মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে।

সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় ও তার স্ত্রী ইয়েন ইয়েনের বিরুদ্ধে অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ব্যারিস্টার দেবাশীষের বাবা ত্রিদিব রায় একজন নেতৃস্থানীয় রাজাকার ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান এবং আমৃত্যু মন্ত্রী মর্যাদায় সেখানে অবস্থান করেন। ব্যারিস্টার দেবাশীষের আন্তর্জাতিক মহলে যোগাযোগ রয়েছে। এই যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি সর্বদা দেশবিরোধী প্রচারণা চালান।

তার স্ত্রী ইয়েন ইয়েন ইউএনডিপি, ইউনিসেফ, ডিএএনআইডিএসহ বাংলাদেশে অবস্থিত অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স ও নর্ডিক দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। এসব সংস্থা ও দূতাবাসের মাধ্যমে তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হন। এছাড়া তাদের সহায়তায় তিনি দেশে-বিদেশে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সস্প্রতি বাংলাদেশ সরকার এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে লিখিতভাবে সতর্ক করে। গত ৬ এপ্রিল রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে রানি ইয়েন ইয়েনকে সতর্ক করা হয়।

পাহাড়ে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়িয়ে জাতিগত সংঘাত, অভিযোগ অপপ্রচারের দেবাশীষ রায়ের স্ত্রী ইয়েন ইয়েন

চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, ইয়েন ইয়েন পাহাড়ি সংগঠনগুলোর সদস্যদের সংগঠিত করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত, যা পার্বত্য অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

জেলা প্রশাসক জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ভিত্তিতেই তিনি এই চিঠি পাঠিয়েছেন এবং নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে চিঠি পাঠানোর ঘটনার প্রতিবাদ জানায় ইউপিডিএফ।

প্রশাসনের অভিযোগ, রানি ইয়েন ইয়েনের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। তবে পাহাড়ের স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেওয়া যে কোনো বক্তব্য যে বাড়তি উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে সে বিষয়ে প্রশাসন স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে বলা যায়।

সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও সংগঠনের নীরব ভূমিকা

সম্প্রতি বাংলাদেশ ভয়াবহ একটি বন্যা মোকাবিলা করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা এ বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশ সরকার এবং সেনাবাহিনী ও বিজিবি এই দুর্যোগ মোকাবিলায় সর্বদা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের পাশে ছিল। বন্যাদুর্গতদের উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ, পর্যটকদের উদ্ধার ও ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারে তারা প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন।

পাহাড়ে শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর। যারা আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করার চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।-খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত

তবে পাহাড়ি সংগঠন ও ব্যক্তিদের বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, তার স্ত্রী ইয়েন ইয়েন, আঞ্চলিক সংগঠন ও এনজিওগুলোর বন্যাকালীন নীরব ভূমিকা পার্বত্যবাসীর জন্য তাদের মনোভাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী-বাঙালিদের যৌক্তিক চাহিদার ভিত্তিতে শান্তিচুক্তির পুনর্মূল্যায়নের দাবি উঠেছে। এ দাবি পূরণ হলে পাহাড়ে শান্তির বাতাস বইবে বলে মনে করছেন এক শ্রেণির মানুষ। পাহাড়ি-বাঙালি বিভেদ ভুলে গিয়ে ‘আমরা সবাই বাংলাদেশি’ এই দর্শনকে প্রকৃতভাবে ধারণ করতে পারলে পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘আদিবাসী’ নয় ‘অধিবাসী’ হওয়ার আহ্বান

বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে বসবাসকারী সব নাগরিকের সাংবিধানিক পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’ এবং কোনো ভুল বা বিভ্রান্তিকর প্রশ্নের পেছনে না ছুটে দেশের সবাইকে ‘আদিবাসী’ না হয়ে ‘অধিবাসী’ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

গতকাল (১১ আগস্ট) ‘আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির দাবিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত আন্দোলন জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলে সৃষ্ট ঐতিহাসিক বিভেদ ও ষড়যন্ত্রের পেছনে ভিনদেশি উসকানি এবং আন্তর্জাতিক মহলের স্বার্থ রয়েছে। তবে আমরা সবাই বাংলাদেশের ‘অধিবাসী’ হবো, ‘আদিবাসী’ কেউ হবো না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ও ভূ-রাজনীতি নিয়ে সতর্ক করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলে অতীতে যেমন ভিনদেশি উসকানি ছিল, তেমনই এখনো বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্ত ও আশপাশের অঞ্চলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল নিজেদের স্বার্থে ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা করছে।

কোনো পাতানো ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না

অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের জাতিসত্তা কোনো বহিরাগত অভিবাসী জনগোষ্ঠীর দখল ও উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠেনি। বরং দীর্ঘ নৃতাত্ত্বিক বিবর্তন, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে এ দেশের জনগোষ্ঠী ও জাতিসত্তার বিকাশ ঘটেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো একক বা একমাত্রিক নৃতাত্ত্বিক পরিচয় নেই। হাজার বছরের ইতিহাসে নানান জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ ও সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ দেশের সমাজ ও জাতিসত্তা গড়ে উঠেছে। এই বহুত্বের মধ্য দিয়েই একটি অভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয় গড়ে উঠেছে।

‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দিলে রাষ্ট্রীয় অধিকার হারানোর আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অধিকার হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। একটি বিশেষ মহল পরিকল্পিতভাবে এ জায়গায় ‘আদিবাসী’ শব্দটি টেনে আনার চেষ্টা করছে।

অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, আদিবাসী হিসেবে যদি আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যারা আছেন তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হয় সমস্যাটা হচ্ছে যে প্রথমত তারা আদিবাসী না। কারণ এই ভূখণ্ডে বাঙালি যারা আছেন তারা এসেছেন চার হাজার বছর আগে আর চাকমারা যারাই বলেন, এদের আগমনের ইতিহাস ৩০০ থেকে ৪০০ বছর আগে। এখন ৪০০ বছর আগে যে এসেছে তাকে যদি আমি আদিবাসী বলি, তাহলে চার হাজার বছর আগে যে এসেছে তাকে আমি কী বলবো?

রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিক সমান

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিক সমান। পাহাড় কিংবা সমতল যেখানেই বসবাস করুক না কেন, কোনো জনগোষ্ঠীকে শব্দের মাধ্যমে ক্ষুদ্র বা অন্য কোনোভাবে চিহ্নিত করা হলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও মনস্তাত্ত্বিক হীনম্মন্যতা তৈরি হতে পারে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

পার্বত্য অঞ্চলের ‘আধিপত্য বিস্তার’ ও ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি’ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জাগো নিউজকে বলেন, ‘পাহাড়ে শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর। যারা আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করার চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ বা তথ্য পাওয়া মাত্রই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথ অভিযান পরিচালনা করে বলেও জানান তিনি।

– জাগো নিউজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *