২০০১ সালে ৩ বিদেশী প্রকৌশলী অপহরণ: পাহাড়ে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ইউপিডিএফের জঙ্গিপনার দলিল!
ছবি সম্পাদনা- সিএইচটি এক্সপোজ।
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
২০০১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি পার্বত্য জেলার নানিয়ারচরে তিন বিদেশি প্রকৌশলীকে অপহরণের ঘটনাটি তৎকালীন সময়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করেছিল। তৎকালীন সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরোধিতা করা আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এই অপহরণের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।
ডেনমার্কের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ড্যানিডার (DANIDA) অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণ প্রকল্প (Kampsax প্রকল্পের অধীনে) চলমান ছিল। ২০০১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে নানিয়ারচর উপজেলার গুনিয়াপাড়া এলাকায় এই প্রকল্পের পরামর্শক দল পরিদর্শনে যান। সে সময় অস্ত্রধারী উপজাতীয় সন্ত্রা’সীরা তাদের গাড়ি থামিয়ে অ’স্ত্রের মুখে জিম্মি করে।
অ’পহরণকারীরা মোট ৫ জনকে প্রথমে আটকে রেখেছিল। তবে তারা বাংলাদেশি চালক এবং ডেভিড ওয়েস্টন নামে এক ব্রিটিশ নাগরিককে কিছুক্ষণ পরেই অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দেয়। বাকি তিন বিদেশি প্রকৌশলীকে নিয়ে সন্ত্রা’সীরা গহীন জঙ্গলে গা ঢাকা দেয়। অপহৃত ব্যক্তিরা ছিলেন ডেনমার্কের নাগরিক টোরবেন মিকেলসেন (৪৮) ও নিলস হুলগার্ড (৬৪) এবং ব্রিটিশ নাগরিক টিম সেলবি (২৮)।
অপহরণের পর সন্ত্রাসীরা জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে ৯ কোটি টাকা (প্রায় ১২ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড) মুক্তিপণ দাবি করে। তবে বাংলাদেশ সরকার এবং ঢাকাস্থ ব্রিটিশ ও ডেনমার্ক দূতাবাস অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেয় এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে স’ন্ত্রাসীদের কোনো প্রকার মুক্তিপণ দেওয়া হবে না।
বিদেশি নাগরিকদের অপহরণের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের ওই অঞ্চলে বিশাল তল্লাশি ও ঘেরাও অভিযান শুরু করে। তৎকালীন সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী কল্পরঞ্জন চাকমা অপহৃতদের মুক্ত করতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
দীর্ঘ ১ মাস ধরে সেনাবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান এবং চারপাশ থেকে জঙ্গল ঘেরাও করে রাখার ফলে অপহরণকারীরা প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ে। অবশেষে সেনাবাহিনীর চূড়ান্ত কমান্ডো অভিযানের মুখে টিকতে না পেরে অপহরণকারীরা জিম্মিদের ফেলে পালিয়ে যায়।
২০০১ সালের ১৭ মার্চ (অপহরণের ঠিক এক মাস পর) তিন বিদেশি নাগরিককে রাঙামাটির দুর্গম পাহাড় থেকে সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর তাদের প্রথমে রাঙামাটি সেনা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে তারা নিজ নিজ দেশে ফিরে যান।
এই ঘটনার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশি দাতাসংস্থা ও উন্নয়ন কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয় এবং সাময়িকভাবে ওই অঞ্চলে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড স্থগিত রাখা হয়েছিল। মূলত পাহাড়ি স’ন্ত্রাসীদের লক্ষ্য ছিলো এটাই যে, ভয়ভীতি ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে পাহাড়ে বিদেশী সংস্থার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ বন্ধ করে দেওয়া। যাতে সন্ত্রাসীরা নির্বিঘ্নে দেশবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারে।
ইউপিডিএফ এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী মাইকেল চাকমার ভূমিকা
এই রোমহর্ষক অপহরণের মূল হোতা ও নির্দেশদাতা হিসেবে পরিচিত তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম বিতর্কিত সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করে জন্ম নেওয়া এই সংগঠনটি শুরু থেকেই পাহ্নে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি এবং অপহরণের সাথে যুক্ত ছিল। বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করে আন্তর্জাতিক মহলে চাপ সৃষ্টি এবং মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায় করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।
এই পুরো সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের অন্যতম চালিকাশক্তি এবং ইউপিডিএফের সেকেন্ড ইন কমান্ড ও শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিলেন মাইকেল চাকমা। পাহাড়ে সশস্ত্র তৎপরতা পরিচালনা, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন অপহরণ ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতেন।
নানিয়ারচরের এই বিদেশি প্রকৌশলী অপহরণকাণ্ডের পেছনেও তার প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও নেতৃত্ব ছিল বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি এড়িয়ে আত্মগোপনে থাকা মাইকেল চাকমা ও তার সহযোগীরা পাহাড়ি অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেও মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।