মেয়ের বিয়ের গেইট বানালেন বাবা, আট দিনের শ্রমে নজর কাড়ল নান্দনিকতা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
কক্সবাজারের উখিয়ায় মেয়ের বিয়েকে স্মরণীয় করে রাখতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন ডেকোরেশন ব্যবসায়ী নুরুল হাকিম প্রকাশ নুরু (৪৫)। পেশায় ডেকোরেশন ব্যবসায়ী হলেও নিজের মেয়ের বিয়ের আয়োজনকে অন্যরকম করে তুলতে কোনো কারিগর দিয়ে নয়, নিজের হাতেই তৈরি করেছেন দৃষ্টিনন্দন একটি বিয়ের গেইট। দিনের বেলায় নিজের ডেকোরেশনের ব্যবসার কাজ সামলানোর পর রাতে বাড়িতে ফিরে ছেলের সহযোগিতা নিয়ে প্রায় আট দিনের পরিশ্রমে তৈরি করেছেন গেইটটি। তাঁর তৈরি নান্দনিক গেইটটি এখন বিয়ে বাড়ির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
নুরুল হাকিম উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুপালং এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয়ভাবে তিনি নুরু নামে পরিচিত। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি ‘রাজা মাইক সার্ভিস ও ডেকোরেশন’ নামে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাঁর এক ছেলে ও দুই মেয়ে। দ্বিতীয় মেয়ে তানিয়ার বিয়েকে কেন্দ্র করেই নিজের সৃজনশীলতা ও কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে গেইটটি তৈরি করেছেন তিনি।
তানিয়ার বিয়ে হচ্ছে উখিয়ার হলদিয়া ইউনিয়নের মরিচ্যা এলাকার বাসিন্দা প্রবাসী আজিজুল হকের ছেলে শাকিলের সঙ্গে। মেয়ের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই নুরুল হাকিম সিদ্ধান্ত নেন, বিয়ের গেইটটি অন্য কাউকে দিয়ে তৈরি না করিয়ে নিজ হাতেই বানাবেন।
গেইট তৈরির নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে নির্মাণের বিভিন্ন কাজ নিজ হাতেই করেছেন নুরু। দিনের বেলায় নিজের ডেকোরেশনের ব্যবসার কাজ শেষ করে রাতে বাড়িতে ফিরে পরিবারের সদস্য ও ছেলের সহযোগিতা নিয়ে গেইট তৈরির কাজ চালিয়ে যান। প্রতিদিন রাতে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা করে কাজ করার পর প্রায় আট দিনের পরিশ্রমে শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে গেইটটির নির্মাণকাজ শেষ হয়।
নুরুল হাকিম বলেন, “আমি একজন ডেকোরেশন ব্যবসায়ী। মেয়ের বিয়েকে একটু বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রাখতে নিজের হাতেই গেইটটি তৈরি করার উদ্যোগ নিই। দিনের বেলায় বাইরে ব্যবসার কাজ করেছি, আর রাতে বাড়িতে এসে ছেলের সহযোগিতা নিয়ে দুই-তিন ঘণ্টা কাজ করে গেইটটি তৈরি করেছি। প্রায় আট দিন সময় লেগেছে। পরিবারের সদস্যসহ অনেকে আমাকে সহযোগিতা করেছেন।”
তিনি বলেন, “মেয়ের বিয়েতে নিজের হাতে কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল। তাই অর্থের বিনিময়ে অন্য কাউকে দিয়ে না করিয়ে নিজের কারিগরি অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গেইটটি তৈরি করেছি। মেয়ের বিশেষ দিনে এই গেইটটি আমার ভালোবাসার একটি স্মৃতি হয়ে থাকবে।”
কক্সবাজার-উখিয়া মহাসড়কের পশ্চিম পাশে তৈরি করা গেইটটি ইতোমধ্যে স্থানীয়দের নজর কেড়েছে। বিয়ে বাড়িতে আসা অতিথিদের পাশাপাশি পথচারীরাও গেইটটি দেখতে থামছেন। অনেকে গেইটটির ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, তাঁর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নুরু দীর্ঘদিন ধরে মাইক সার্ভিস ও ডেকোরেশনের ব্যবসা করছেন। মেয়ের বিয়েতে তিনি নিজের হাতে এত সুন্দর একটি গেইট তৈরি করেছেন, যা সত্যিই ব্যতিক্রমী। কক্সবাজার-উখিয়া মহাসড়কের পাশে এত বড় ও সুন্দর গেইট আগে খুব একটা দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, “আমি সরেজমিনে এসে গেইটটি দেখেছি। সত্যিই ভালো লেগেছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। নিজের মেয়ের বিয়েকে স্মরণীয় করে রাখতে একজন বাবা যে নিজের শ্রম ও সৃজনশীলতা দিয়ে এমন কিছু করতে পারেন, এটি তারই একটি সুন্দর উদাহরণ।”
সাধারণত বিয়ের অনুষ্ঠানে গেইট ও মঞ্চ সাজানোর জন্য পরিবারের সদস্যরা ডেকোরেশন প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেন। তবে নুরুল হাকিমের উদ্যোগটি ছিল ভিন্ন। নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে মেয়ের বিয়ের গেইটটি নিজ হাতে তৈরি করেছেন তিনি। ফলে গেইটটি শুধু বিয়ের সাজসজ্জার অংশ হয়ে থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছে একজন বাবার ভালোবাসা, শ্রম ও আবেগের প্রকাশ।
স্থানীয়দের মতে, অর্থ খরচ করে অন্যের মাধ্যমে তৈরি করা গেইটের চেয়ে নিজের হাতে তৈরি করা এই গেইটটির আবেগ আলাদা। কারণ এর প্রতিটি অংশে রয়েছে একজন বাবার শ্রম, সৃজনশীলতা এবং মেয়ের জীবনের বিশেষ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার আকাঙ্ক্ষা।
মেয়ের বিয়েকে ঘিরে নুরুল হাকিমের এই উদ্যোগ এখন স্থানীয়ভাবে প্রশংসা কুড়াচ্ছে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে গেলেও নিজের হাতে তৈরি করা গেইটটি পরিবারটির কাছে তানিয়ার বিয়ের স্মৃতি হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন। একজন বাবার হাতে তৈরি এই নান্দনিক গেইট তাই শুধু একটি প্রবেশদ্বার নয়, হয়ে উঠেছে বাবা-মেয়ের ভালোবাসা, আবেগ ও সম্পর্কের এক অনন্য স্মারক।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।