ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার বিরোধিতা, বছরে ৯২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির দাবি

ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার বিরোধিতা, বছরে ৯২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির দাবি

ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার বিরোধিতা, বছরে ৯২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির দাবি
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম বন্দরের লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক, আইনজীবী, নাগরিক সমাজ ও ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিরা। ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা দাবি করেছেন, প্রস্তাবিত ইজারা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৯২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের বন্দর পরিচালনা খাত, জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা।

৩০ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা চেষ্টা: নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির রিসার্চ উইং। অনুষ্ঠানে সংগঠনের আহ্বায়ক মুহম্মদ জিয়াউল হক সঞ্চালনা করেন। মূল লিখিত গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের সদস্য সচিব শাহাদাত ফরাজী সাকিব।

আলোচনায় অংশ নেন নৌবাহিনীর সাবেক সহকারী প্রধান ও বিইউপির সাবেক প্রো-ভিসি কমোডর জসীমউদ্দীন, জনতার দলের মুখপাত্র মেজর (অব.) ডেল এইচ খান, দৈনিক ইনকিলাবের সহকারী সম্পাদক ও পার্বত্য নিউজের সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ, আমরা বাংলাদেশীর সমন্বয়ক মমিনুল আমীন, মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফিদা, স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির মুখপাত্র মুহিউদ্দিন রাহাত, জনজোট বিপ্লবী পার্টির মুখপাত্র মোজাম্মেল মিয়াজী এবং বাংলাদেশ মঞ্চের আহ্বায়ক ফুয়াদ সাকিসহ অনেকে।

গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় এনসিটি থেকে বছরে প্রায় ১৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার নিট আয় হচ্ছে। অন্যদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত মডেলে বন্দরের প্রশাসনিক ব্যয় পরিশোধের পর নিট আয় প্রায় ৫৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসতে পারে। এই হিসাবে বছরে প্রায় ৯২ মিলিয়ন ডলার রাজস্বের ব্যবধান তৈরি হবে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।

গবেষণায় আরও দাবি করা হয়, জার্মান প্রতিষ্ঠান এইচপিসির প্রাক্কলিত সক্ষমতার তুলনায় দেশীয় অপারেটররা বর্তমানে বছরে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। বিপরীতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চার বছর পরের সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টিইইউ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির মতে, এতে টার্মিনালের সক্ষমতা ও পরিচালন দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

নিরাপত্তা ও কৌশলগত ঝুঁকি প্রসঙ্গে গবেষণা প্রবন্ধে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনায় ভারতীয় নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সংগঠনটির দাবি, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রযুক্তিগত তথ্যভান্ডার, কার্গো ও কনটেইনার-সংক্রান্ত তথ্য এবং পরিচালন ব্যবস্থায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রবেশাধিকার তৈরি হলে স্বার্থের সংঘাত ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

গোলটেবিলের আলোচনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের সঙ্গে ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সম্পর্ক নিয়েও বক্তারা বিভিন্ন দাবি ও আশঙ্কা তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্য, চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে শুধু ফিডার পোর্ট হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে বক্তারা যে বিশ্লেষণ ও দাবি উপস্থাপন করেছেন, সেগুলো তাদের নিজস্ব গবেষণা ও রাজনৈতিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে।

কমোডর জসীমউদ্দীন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর ও আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েকে কেন্দ্র করে ঔপনিবেশিক শোষণের ইতিহাস রয়েছে। তার মতে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের সার্বভৌমত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

মেজর (অব.) ডেল এইচ খান বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ যেখানে প্রতি টিইইউতে প্রায় ৬৫ ডলার মার্জিন পায় বলে তারা দাবি করছেন, সেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত মডেলে তা ১৭ ডলারে নেমে আসতে পারে। তিনি এনসিটি ইজারা দেওয়ার আগে স্বাধীনভাবে ‘ভ্যালু ফর মানি’ মূল্যায়ন প্রকাশ এবং জমি, কাস্টমস ও বন্দর নিরাপত্তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে রাখার দাবি জানান।

স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির মুখপাত্র মুহিউদ্দিন রাহাত বলেন, রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত লাভজনক একটি অবকাঠামো পরিচালনার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তিনি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেন।

পার্বত্য নিউজের সম্পাদক ও দৈনিক ইনকিলাবের সহকারী সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর পরিচালনায় যুদ্ধ বা বড় ধরনের দুর্যোগের মতো পরিস্থিতিতে বিদেশি অপারেটরের সম্ভাব্য ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে সরবরাহব্যবস্থা যাতে ঝুঁকির মুখে না পড়ে, সে বিষয়টি আগে থেকেই নিশ্চিত করা জরুরি।

আমরা বাংলাদেশীর সমন্বয়ক মমিনুল আমীন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে বিস্তারিত আলোচনা এবং দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফিদা বলেন, বন্দরের কার্গো তথ্য, কনটেইনার ডেটা ও সাইবার অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে জাতীয় নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষার প্রশ্ন উঠতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

জনজোট বিপ্লবী পার্টির মুখপাত্র মোজাম্মেল মিয়াজীও এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার বিরোধিতা করেন। তিনি দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামো পরিচালনায় দেশীয় সক্ষমতা ও অপারেটরদের গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

গোলটেবিল বৈঠক থেকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিল, লাভজনক রাষ্ট্রীয় টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালনা এবং বন্দর, কাস্টমস ও নিরাপত্তার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন রাখার দাবি জানানো হয়।

এ ছাড়া এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ, স্বাধীন অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনারও দাবি জানানো হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ পরিচালনা কাঠামো নির্ধারণের আগে অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জাতীয় স্বার্থ—সবগুলো বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *