পাহাড়ের ছায়ায় নীল সমুদ্র, মুগ্ধতার অন্য নাম ইসিবি নির্মিত মেরিন ড্রাইভ সড়ক

পাহাড়ের ছায়ায় নীল সমুদ্র, মুগ্ধতার অন্য নাম ইসিবি নির্মিত মেরিন ড্রাইভ সড়ক

পাহাড়ের ছায়ায় নীল সমুদ্র, মুগ্ধতার অন্য নাম ইসিবি নির্মিত মেরিন ড্রাইভ সড়ক
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

তারেকুর রহমান, কক্সবাজার

এক পাশে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি, অন্য পাশে সবুজ পাহাড়ের সারি। মাঝখানে আঁকাবাঁকা সড়ক, কোথাও ঝাউবনের ছায়া, কোথাও পাথুরে সৈকত, আবার কোথাও দিগন্তজোড়া সমুদ্রের হাতছানি। পাহাড় আর সমুদ্রের এমন অপূর্ব মিতালি খুব কাছ থেকে উপভোগ করার সুযোগ তৈরি করেছে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার্স কোরের (ইসিবি) নির্মিত প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক শুধু যোগাযোগের পথ নয়, নিজেই যেন এক দীর্ঘ পর্যটন আকর্ষণ। সড়ক ধরে এগোতে এগোতে প্রকৃতি বদলে দেয় তার রং, আর প্রতিটি বাঁকে উন্মোচিত হয় সমুদ্রের ভিন্ন ভিন্ন সৌন্দর্য।
কক্সবাজারের কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত এই সড়কের এক পাশে সমুদ্র, অন্য পাশে পাহাড়ের সবুজ ঢাল। কখনো পাহাড় নেমে এসেছে সমুদ্রের কাছে, কখনো ঢেউ আছড়ে পড়ছে সৈকতের পাথরে। দূরে মাছ ধরার নৌকা, তীরে জেলেদের ব্যস্ততা, ঝাউবনের ফাঁক দিয়ে বয়ে আসা সাগর বাতাস—সব মিলিয়ে মেরিন ড্রাইভের যাত্রা হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা।
কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে সমুদ্রসৈকত প্রধান আকর্ষণ হলেও মেরিন ড্রাইভ সেই অভিজ্ঞতায় যোগ করে নতুন মাত্রা। এখানে শুধু সৈকতে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখা নয়, বরং সমুদ্রের পাশ দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। ভোরের আলো, দুপুরের নীল জলরাশি কিংবা বিকেলের সোনালি রোদ—সময়ভেদে সড়কটির সৌন্দর্যও বদলে যায়।
ইসিবির নির্মাণে বদলে যাওয়া উপকূলীয় যোগাযোগ
কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রের কোল ঘেঁষে সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৯৯০-এর দশকে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার্স কোরের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ধাপে এর নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রের ভাঙন ও প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে নির্মাণকাজে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। ২০১৭ সালে সড়কটির নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর এটি পর্যটন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ হয়ে ওঠে।
পাহাড়ের ছায়ায় নীল সমুদ্র, মুগ্ধতার অন্য নাম ইসিবি নির্মিত মেরিন ড্রাইভ সড়ক
মেরিন ড্রাইভের গুরুত্ব শুধু এর সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। কক্সবাজার শহর থেকে উখিয়া ও টেকনাফের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করার পাশাপাশি সড়কটি স্থানীয় পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে। পথের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে খাবারের দোকান, পর্যটকদের বিশ্রামের জায়গা এবং স্থানীয় পণ্য বিক্রির ছোট ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
হিমছড়ি থেকে ইনানী, প্রতিটি বাঁকে ভিন্ন সৌন্দর্য 
মেরিন ড্রাইভের যাত্রায় অন্যতম আকর্ষণ হিমছড়ি। পাহাড়ের পাদদেশ, সবুজ প্রকৃতি ও ঝরনার জন্য পরিচিত এ এলাকায় সমুদ্রের দৃশ্যও পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। পাহাড়ের উঁচু স্থান থেকে বিস্তৃত সমুদ্রের দিকে তাকালে প্রকৃতির বিশালতা সহজেই অনুভব করা যায়।
এরপর আসে ইনানী সৈকত। প্রবাল ও পাথরের উপস্থিতি, স্বচ্ছ জল এবং সৈকতের ভিন্ন ভূপ্রকৃতি ইনানীকে অন্য সৈকত থেকে আলাদা করেছে। জোয়ার-ভাটার সময় পাথরের বিন্যাস ও পানির বিস্তৃতি বদলে যায়। পর্যটকেরা এখানে সমুদ্রের দৃশ্য উপভোগ করেন, ছবি তোলেন এবং সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটান।
আরও দক্ষিণে পাটুয়াটেকের পাথুরে সৈকত। তুলনামূলক নিরিবিলি পরিবেশ ও পাথরের ওপর ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার দৃশ্য জায়গাটিকে আলাদা আকর্ষণ দিয়েছে। এরপর শামলাপুর ও শাপলাপুরের উপকূলীয় জনপদ পেরিয়ে সড়ক এগিয়ে গেছে টেকনাফের দিকে। পথে সমুদ্রের পাশাপাশি জেলেপাড়া, মাছ ধরার নৌকা এবং উপকূলীয় মানুষের জীবনযাত্রাও পর্যটকদের সামনে উঠে আসে।
সড়কের শেষ প্রান্তে সাবরাং ও টেকনাফের উপকূলীয় এলাকার দৃশ্য ভ্রমণে যোগ করে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। তবে যাত্রাপথে নির্ধারিত নিরাপদ স্থানে গাড়ি থামানো, সৈকতে নামার আগে স্থানীয় নির্দেশনা মানা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাথুরে এলাকায় সতর্ক থাকা জরুরি।
পর্যটকদের চোখে মেরিন ড্রাইভ 
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কক্সবাজারে আসা পর্যটকদের কাছে মেরিন ড্রাইভের অন্যতম আকর্ষণ হলো একই যাত্রায় পাহাড় ও সমুদ্র দেখার সুযোগ। খোলা জিপ বা চাঁদের গাড়িতে ভ্রমণের সময় সাগরের বাতাস, পাহাড়ি পথ এবং উপকূলীয় জনপদের দৃশ্য যাত্রাকে আনন্দময় করে তোলে।
ঢাকা থেকে আসা ইশমাম চৌধুরী বলেন, ‘কক্সবাজারে এসে মেরিন ড্রাইভে ঘুরতে বের হলে একসঙ্গে পাহাড় ও সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। রাস্তার এক পাশে নীল সমুদ্র, অন্য পাশে সবুজ পাহাড়—দৃশ্যটি সত্যিই অসাধারণ। পুরো পথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভ্রমণকে অন্য রকম অভিজ্ঞতা দেয়।’
শরীয়তপুর থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মুনতাহিনা আক্তার বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভের সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো, পথ চলতে চলতেই প্রকৃতির নানা রূপ দেখা যায়। কোথাও পাথুরে সৈকত, কোথাও পাহাড়, আবার কোথাও দিগন্তজোড়া সমুদ্র। পর্যটকদের জন্য সড়কের পাশে নিরাপদে গাড়ি থামানো, পরিচ্ছন্নতা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো গেলে ভ্রমণটি আরও উপভোগ্য হবে।’
পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে প্রত্যাশা 
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা সাউথইস্ট এশিয়া জার্নালকে বলেন, মেরিন ড্রাইভ কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের অন্যতম বড় সম্পদ। এক পাশে সমুদ্র, অন্য পাশে পাহাড়—প্রকৃতির এমন অনন্য সমন্বয় পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
পাহাড়ের ছায়ায় নীল সমুদ্র, মুগ্ধতার অন্য নাম ইসিবি নির্মিত মেরিন ড্রাইভ সড়ক
তিনি আরও বলেন, ‘এই সড়ককে ঘিরে পরিকল্পিত পর্যটনসেবা গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ আরও বাড়বে। তবে উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মেরিন ড্রাইভের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই এটিকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মেরিন ড্রাইভকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত পর্যটনসেবা গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ আরও বাড়তে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত স্থাপনা, যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা, সড়কে অনিরাপদভাবে গাড়ি থামানো এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
যাতায়াত ও ভ্রমণ পরিকল্পনা 
কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকা থেকে মেরিন ড্রাইভে যাত্রা শুরু করা যায়। পর্যটকেরা দল ও ভ্রমণ পরিকল্পনা অনুযায়ী জিপ, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে পারেন। খোলা ছাদের জিপ বা চাঁদের গাড়িতে ভ্রমণ অনেকের কাছে আকর্ষণীয় হলেও যাত্রার আগে চালকের দক্ষতা, গাড়ির নিরাপত্তা ও ভাড়ার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
যানবাহন ও ভ্রমণের দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া পরিবর্তিত হতে পারে। তাই যাত্রার আগে ভাড়া, অপেক্ষার সময় এবং কোন কোন স্থানে থামা হবে, তা ঠিক করে নেওয়া ভালো। পর্যটন মৌসুমে হোটেল ও রিসোর্টে থাকার পরিকল্পনা থাকলে আগাম বুকিং করাও সুবিধাজনক।
মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভোরে যাত্রা শুরু করলে দিনের আলোয় বিভিন্ন স্থান দেখার সময় পাওয়া যায়। পথের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে বিকেলে ইনানী বা উপযুক্ত কোনো নিরাপদ স্থান থেকে সূর্যাস্ত দেখা যেতে পারে। তবে আবহাওয়া, জোয়ার-ভাটা ও স্থানীয় নিরাপত্তা নির্দেশনা বিবেচনায় রেখে ভ্রমণ পরিকল্পনা করা উচিত।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেরিন ড্রাইভের প্রকৃত আকর্ষণ এর স্বাভাবিক পরিবেশে নীল সমুদ্র, সবুজ পাহাড়, পাথুরে সৈকত এবং উপকূলীয় জনজীবনের সম্মিলনে। পর্যটকদের অসচেতন আচরণে বর্জ্য জমা হলে কিংবা পাহাড় ও সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই সৌন্দর্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
তাই ভ্রমণের সময় প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলা, পাহাড়ি ঢাল বা ঝুঁকিপূর্ণ পাথরে ওঠার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা এবং সামুদ্রিক পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীদের সমন্বিত উদ্যোগে মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনা দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা সম্ভব।
ইসিবি নির্মিত মেরিন ড্রাইভ বাংলাদেশের উপকূলীয় প্রকৃতির এক অনন্য দৃশ্যপট।  পরিকল্পিত পর্যটনসেবা ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য আরও বেশি পর্যটককে আকৃষ্ট করবে, আর উপকূলীয় জনপদের অর্থনীতিতেও তৈরি হবে নতুন সম্ভাবনা বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *