হেমা চাকমার সংবিধান সংশোধন প্রস্তাব ও পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন বিতর্ক
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, ভাষা, ঐতিহ্য, ভূমির অধিকার ও উন্নয়নের প্রশ্ন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ের মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূর করা এবং দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হওয়া প্রয়োজন—এ নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। কিন্তু অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি যখন সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, রাষ্ট্রের পরিচয়, জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব এবং একটি অঞ্চলের বিশেষ রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্নে পৌঁছায়, তখন সেটিকে আবেগের আড়ালে রেখে আলোচনা করার সুযোগ নেই। সেখানে প্রয়োজন যুক্তি, স্বচ্ছতা, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং সর্বোপরি সব নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা।
গত ৩রা নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য হেমা চাকমা উত্থাপিত সংবিধান সংশোধনের ছয়টি প্রস্তাব নতুন করে সেই বিতর্ক সামনে এনেছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলার পাশাপাশি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষাকে সমান রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া, সংবিধানে ‘বাঙ্গালি’ জাতিসত্তার পরিচয়সংক্রান্ত বিধান পরিবর্তন, পার্বত্য অঞ্চলে প্রথাগত ও সামষ্টিক ভূমির মালিকানা স্বীকৃতি, ‘আদিবাসী’ শব্দ সংযোজন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা থেকে চারটি সংরক্ষিত সংসদীয় আসন নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।
প্রস্তাবগুলোকে কেবল সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সাধারণ দাবি হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক তাৎপর্য আড়াল থেকে যায়। কারণ, এগুলো রাষ্ট্রের পরিচয়, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা, ভূমির মালিকানা, সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব এবং কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে একটি অঞ্চলের সম্পর্ককে সরাসরি স্পর্শ করে। ফলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—এই প্রস্তাবগুলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও নাগরিকদের অধিকার কীভাবে সংরক্ষিত হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সব জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা কোথায়?
সাংবিধানিক অধিকার, নাকি রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাব?
বাংলাদেশের সংবিধানের ১ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশকে একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ৩ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রভাষা বাংলা এবং ৬ অনুচ্ছেদের ২ উপধারায় জাতি ও নাগরিকত্বের পরিচয় নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৩ক অনুচ্ছেদে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, জাতিসত্তা, নৃ-সম্প্রদায় ও সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।

হেমা চাকমার প্রস্তাবে এসব অনুচ্ছেদের একাধিক জায়গায় পরিবর্তনের কথা এসেছে। বিশেষ করে ৬ অনুচ্ছেদের ২ উপধারা থেকে ‘বাঙ্গালি জাতি’ পরিচয় বাদ দেওয়া, ২৩ক অনুচ্ছেদে ‘আদিবাসী’ শব্দ প্রতিস্থাপন এবং ১ অনুচ্ছেদের অধীনেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল করার প্রস্তাব—এসবের সাংবিধানিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর।
এখানে সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদও গুরুত্বপূর্ণ। ওই অনুচ্ছেদে সংবিধানের প্রথম ভাগসহ নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক বিধান সংশোধন-অযোগ্য বলে উল্লেখ রয়েছে। ফলে ১ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের প্রস্তাব কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়; এটি সরাসরি সংবিধানের সংশোধন-সীমা ও সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। ৬ অনুচ্ছেদ প্রথম ভাগে এবং ২৩ক অনুচ্ছেদ দ্বিতীয় ভাগে থাকায় সেগুলোর ক্ষেত্রেও ৭খ অনুচ্ছেদের বিধান বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। অতএব, প্রস্তাব উত্থাপনকারীদের কাছে জানতে চাওয়া প্রয়োজন—এই প্রস্তাবগুলো বিদ্যমান সংবিধানের কোন বিধান ও কোন সংশোধন-পদ্ধতির অধীনে বাস্তবায়নযোগ্য বলে তাঁরা মনে করেন?
সংবিধানের আলোচনায় আবেগ, পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক স্লোগান যথেষ্ট নয়। প্রতিটি প্রস্তাবের সাংবিধানিক ভিত্তি, বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং তার পরিণতি ব্যাখ্যা করতে হবে।
ছাত্রলীগের সাংস্কৃতিক উপসম্পাদক থেকে ডাকসুতে বামজোটে হেমা চাকমা
বাঙ্গালি পরিচয় বাদ দেওয়ার প্রস্তাব: অন্তর্ভুক্তি কি পরিচয় মুছে ফেলার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে?
বাংলাদেশে বাঙ্গালি ছাড়াও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস রয়েছে। তাঁদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান থেকে বাঙ্গালি জাতিসত্তার পরিচয়সংক্রান্ত বিধান বাদ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কোথায়—এ প্রশ্নের জবাবও প্রস্তাবকদের পরিষ্কার করা দরকার।
একটি রাষ্ট্রে একাধিক জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় থাকতে পারে। নাগরিকত্বের অভিন্ন পরিচয়ের পাশাপাশি নিজস্ব জাতিসত্তা, ভাষা ও ঐতিহ্য ধারণের অধিকারও থাকতে পারে। একটি পরিচয়ের স্বীকৃতি অন্য পরিচয়ের বিলুপ্তি দাবি করে না। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলতে গিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক পরিচয় বাদ দেওয়ার প্রস্তাব কতটা প্রয়োজনীয়, তা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা জরুরি।
বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকে স্বতন্ত্র সাংবিধানিক পরিচয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’—এই পরিভাষাগুলো ব্যবহার করে তাদের স্বতন্ত্র স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। একইভাবে ২০১০ সালের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনেও ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র এসব জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে অস্বীকার করেনি; বরং বিদ্যমান সাংবিধানিক ও আইনগত কাঠামোর মধ্যেই তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা রেখেছে। তাই ‘আদিবাসী’ শব্দের সাংবিধানিক স্বীকৃতি না থাকাকে তাদের অস্তিত্ব বা অধিকার অস্বীকারের সমার্থক হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়। হেমা চাকমার প্রস্তাবের মূল প্রশ্নটি হলো—বিদ্যমান সাংবিধানিক পরিভাষা পরিবর্তন করে নতুন একটি পরিচয় সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা ও তার আইনগত তাৎপর্য কী?
বিশেষ স্বায়ত্তশাসন: ক্ষমতার সীমা ও জবাবদিহি কোথায়?
পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ঘোষণার প্রস্তাবটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। কারণ, স্বায়ত্তশাসন বলতে কেবল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা বা স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বোঝায় না। এর সঙ্গে আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা, বিচারিক ক্ষমতা, রাজস্ব এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা বণ্টনের প্রশ্ন জড়িত।
প্রস্তাবিত বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের আইনসভা বা প্রতিষ্ঠান কী ধরনের আইন করতে পারবে? জাতীয় আইন ও আঞ্চলিক আইনের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে কোনটি প্রাধান্য পাবে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব কতটুকু থাকবে? ভূমি, বন, খনিজ সম্পদ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও উন্নয়ন প্রকল্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কে নেবে? আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নাগরিকরা কোন আদালতে প্রতিকার চাইবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু ‘বিশেষ স্বায়ত্তশাসন’ শব্দ ব্যবহার করে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক প্রস্তাব তৈরি করা যায় না।
হেমা চাকমাও চাইলেন ভোট, তবে সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থানও এ আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং মিয়ানমারের সীমান্তসংলগ্ন এই অঞ্চল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি কৌশলগত ভূখণ্ড। এই বাস্তবতায় আঞ্চলিক প্রশাসনিক ক্ষমতার কাঠামো নির্ধারণের সময় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি কি আলোচনার বাইরে?
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রস্তাবনাতেই বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় থেকে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, চুক্তির মূল কাঠামোতে একদিকে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য ও অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার রয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক কাঠামোর স্বীকৃতিও রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, চুক্তির বাস্তবায়ন, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং চুক্তির আওতায় অধিকার প্রতিষ্ঠার অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন না করে নতুন করে বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের সাংবিধানিক কাঠামো প্রস্তাব করার প্রয়োজনীয়তা কী? চুক্তির কোন কোন বিধান বাস্তবায়িত হয়নি, কোথায় প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক বাধা রয়েছে এবং কোন আইনি পরিবর্তন প্রয়োজন—সেসব বিষয় নির্দিষ্ট করে আলোচনা হওয়া দরকার।
হেমা চাকমার রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডের প্রশ্ন
হেমা চাকমার সাংবিধানিক প্রস্তাবগুলো মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতাও আলোচনায় আসা স্বাভাবিক। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে তিনি বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর জোট ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ থেকে সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং নির্বাচিত হন। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রলীগের সাংস্কৃতিক উপ-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। এ বিষয়ে হেমা চাকমার বক্তব্যও সংবাদমাধ্যমে এসেছে; তিনি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথাও স্বীকার করেছিলেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য পাঁচ শতাংশ কোটা বহালের দাবিতে তাঁর সক্রিয়তার কথাও কেউ ভুলে যায় নি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমার পক্ষে হেমা চাকমার প্রকাশ্য ভোট চাওয়ার ঘটনা। ধর্ম জ্যোতি চাকমার প্রতি পাহাড়ের সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফের সমর্থন জানিয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দেওয়া হয়েছিল। এরপর ধর্ম জ্যোতি চাকমার নির্বাচনী প্রচারণার ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে হেমা চাকমাকে ঘোড়া প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতে দেখা যায়।
পানছড়িতে ডাকসু সদস্য হেমা চাকমার পিতার চিকিৎসার দায়িত্ব নিল সেনাবাহিনী, নগদ সহায়তা প্রদান
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। কারণ, একজন ডাকসু সদস্য হিসেবে হেমা চাকমা কেবল শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নন; তাঁর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনাতেও প্রভাব ফেলে। তিনি যে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন, সেই প্রার্থীর প্রতি ইউপিডিএফের আনুষ্ঠানিক সমর্থনের বিষয়টি প্রকাশ্য। ফলে তাঁর এই রাজনৈতিক অবস্থান এবং এখন এসে উত্থাপিত সাংবিধানিক প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কোনো রাজনৈতিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
হেমা চাকমার পিতা অনীল চন্দ্র চাকমা প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফের সাবেক সশস্ত্র সদস্য। যিনি, ইউপিডিএফের সহায়তায় একসময় খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গী ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয়েছিলেন। হেমা চাকমাও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার প্রতিটি বক্তব্যে সেনাবাহিনী, বাঙ্গালি জনগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য দিয়ে থাকেন।
সংসদীয় প্রতিনিধিত্বে এক জনগোষ্ঠীর একচেটিয়া ভোটাধিকার কেন?
প্রস্তাবিত চারটি সংরক্ষিত সংসদীয় আসনের মধ্যে একটি নারী আসন রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এসব আসনের ভোটার হিসেবে শুধু পাহাড়ি বা ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীকে নির্ধারণের প্রস্তাবটি নতুন সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু একটি জনগোষ্ঠীর বসবাসের অঞ্চল নয়। সেখানে পাহাড়ি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাঙ্গালি জনগোষ্ঠীরও বসবাস রয়েছে। তাদেরও ভোটাধিকার, ভূমির অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন রয়েছে। একটি অঞ্চলের জন্য বিশেষ প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করতে হলে সেখানে বসবাসরত সব জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা আগে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত আসন রাখার প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু সেই আসনের নির্বাচনে একই অঞ্চলের অন্য নাগরিকদের ভোটাধিকার সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব কতটা ন্যায়সংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের উদ্দেশ্য যদি জনগণের মতামত তুলে ধরা হয়, তাহলে একই ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসকারী নাগরিকদের মধ্যে ভোটাধিকারভিত্তিক বিভাজনের যুক্তি কী?
সামষ্টিক ভূমির মালিকানা: অধিকার রক্ষার পাশাপাশি বিরোধ নিষ্পত্তির নিশ্চয়তা কোথায়?
পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সামষ্টিক মালিকানার ঐতিহাসিক বাস্তবতা রয়েছে। এ অঞ্চলের ভূমি সমস্যা দীর্ঘদিনের এবং এর সমাধানে স্থানীয় রীতি, প্রথা ও ঐতিহ্যকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সামষ্টিক ভূমির মালিকানা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবের সঙ্গে একাধিক বাস্তব প্রশ্ন জড়িত।
কোন ভূমি সামষ্টিক মালিকানার আওতায় আসবে? প্রথাগত মালিকানা নির্ধারণের কর্তৃপক্ষ কারা হবেন? একই জমির ওপর একাধিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দাবি থাকলে বিরোধ নিষ্পত্তি হবে কীভাবে? ভূমিহীন পরিবার, দীর্ঘদিনের বসতি, বৈধ দলিলধারী এবং স্থানীয় প্রথাগত দাবিদারদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে কোন আইনে তার সমাধান হবে? নারী ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে?
এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ছাড়া সামষ্টিক মালিকানার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে গেলে নতুন বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে যেন কোনো জনগোষ্ঠীর বৈধ নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
হেমা চাকমার ছয় দফা প্রস্তাবের প্রতিটি বিষয়ে তাই প্রকাশ্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন। বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতার সীমা কী হবে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক কর্তৃত্ব কীভাবে অক্ষুণ্ন থাকবে, বাঙ্গালি ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে, ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তি কোন কাঠামোয় হবে এবং সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনে ভোটাধিকার কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব প্রশ্নের জবাব না দিয়ে শুধু পরিচয় ও অধিকারের স্লোগান দিয়ে বিতর্ক শেষ করা যায় না।
একইভাবে, ডাকসুর মতো একটি ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে হেমা চাকমারও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া এবং তাঁর প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা প্রয়োজন। তাঁর রাজনৈতিক অতীত, প্রকাশ্য একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পক্ষে নির্বাচনী অবস্থান ও বর্তমান সাংবিধানিক প্রস্তাব নিয়ে জনপরিসরে প্রশ্ন উঠলে সেগুলোর উত্তর দেওয়া উচিত।
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক সমাধান, যেখানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও ন্যায্য অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, একই সঙ্গে বাঙ্গালি ও অন্য সব নাগরিকের সমান মর্যাদা, ভোটাধিকার, ভূমির অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও থাকবে। কোনো এক পক্ষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে অন্য পক্ষের অধিকার সংকুচিত করা হলে তা স্থায়ী সমাধান আনবে না।
রাষ্ট্রের অখণ্ডতা, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো এবং নাগরিকের সমান অধিকার—এগুলো কোনো দলীয় বা গোষ্ঠীগত বিতর্কের বিষয় নয়; এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে কোনো প্রস্তাবের বিচার হতে হবে স্বচ্ছতা, সাংবিধানিক বৈধতা, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং সব জনগোষ্ঠীর অধিকার বিবেচনায় রেখে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।