রাষ্ট্রীয় অবস্থান উপেক্ষা করে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার, দীপেন দেওয়ানের উদ্দেশ্য কী?
![]()
মোঃ সাইফুল ইসলাম
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ানের আজকের (৭ নভেম্বর ২০২৬) একটি ফেসবুক পোস্ট নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গত ৬ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুর-১৩ নম্বরের শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার প্রাঙ্গণে আয়োজিত একটি খাদ্যশস্য মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানের প্রচারমূলক পোস্টে তিনি মেলাটিকে ‘আদিবাসী খাদ্যশস্য মেলা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য হয়েও তিনি কেন রাষ্ট্রের প্রচলিত সাংবিধানিক পরিভাষা উপেক্ষা করে এমন একটি বিতর্কিত শব্দ ব্যবহার করলেন?
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১০ সালের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনেও ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র এসব জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিচয়কে অস্বীকার করেনি; বরং সংবিধান ও প্রচলিত আইনে তাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণের কথা বলেছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিভাষার বাইরে গিয়ে ‘আদিবাসী’ পরিচয়কে প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়।
বিশেষ করে গত ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসকে কেন্দ্র করে সরকারের একাধিক মন্ত্রী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের সাংবিধানিক অবস্থান ও পরিভাষা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে রাষ্ট্রীয় অবস্থান সম্পর্কে অবগত থাকার কথা একজন সাবেক মন্ত্রীর। এরপরও তাঁর ফেসবুক পোস্টে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহারকে নিছক শব্দচয়নের ভুল বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কতটুকু? তিনি কি বুঝে-শুনেই এমন পরিচয় ব্যবহার করেছেন, নাকি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক বয়ানের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন?
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি দেখছি, রাষ্ট্রের অবস্থান পরিষ্কার। গত ১১ আগস্ট রাজধানীর একটি গোলটেবিলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশে সব নাগরিকের একটিই পরিচয়, “বাংলাদেশি”, এখানে কোনো “আদিবাসী” গোষ্ঠী নেই। তাঁর পাশে তথ্যমন্ত্রীও একই সুরে কথা বলেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, জুলাই জাতীয় সনদে সর্বসম্মতিক্রমে সবার পরিচয় “বাংলাদেশি” হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। সংবিধানেও ‘আদিবাসী’ শব্দটির স্বীকৃতি নেই, সেখানে ব্যবহৃত হয়েছে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ পরিভাষা।

এখানে পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন, পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, খাদ্যাভ্যাস ও স্বতন্ত্র সামাজিক পরিচয় উদ্যাপনে কোনো আপত্তি নেই। তাদের অধিকার, মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে ব্যবহার করে বিতর্কিত রাজনৈতিক পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা হলে তার বিরোধিতা ও সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। একটি খাদ্যশস্য মেলার নামকরণেও যখন সেই পরিচয়কে সামনে আনা হয়, তখন সেটিকে নিছক সাংস্কৃতিক আয়োজনের বিষয় বলে পাশ কাটানো যায় না।
প্রশ্ন তাই সোজা। যে মানুষ এই সরকারেরই দলীয় সংসদ সদস্য, যিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া পর্যন্ত পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন, তিনি কেন সরকারের ঘোষিত অবস্থানের উল্টো শব্দ ব্যবহার করছেন? এটা কি অসতর্কতা? নাকি সরকারি নীতির সঙ্গে প্রকাশ্য অসহযোগিতা? পাহাড়ের সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে, যেখানে পরিচয়ের রাজনীতি সংঘাতের রসদ জোগায়, সেখানে একজন জনপ্রতিনিধির এমন শব্দচয়ন কার স্বার্থ রক্ষা করে?
দীপেন দেওয়ান শুধু একজন সাধারণ নাগরিক নন; তাঁর প্রতিটি বক্তব্য ও শব্দচয়নের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের প্রশ্ন জড়িত। তিনি যদি ব্যক্তিগতভাবে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারের পক্ষে থাকেন, তাহলে তাঁর সেই অবস্থানের সাংবিধানিক ও আইনগত ভিত্তি জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করা উচিত। কিন্তু রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করা একজন জনপ্রতিনিধি একদিকে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করবেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রের প্রচলিত সাংবিধানিক পরিভাষাকে পাশ কাটিয়ে বিতর্কিত রাজনৈতিক পরিচয় প্রচার করবেন—এমন দ্বৈত অবস্থান গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এখন ঘুরে ফিরে একটি প্রশ্নই সামনে আসে, এই শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তিনি কাদের রাজনৈতিক বয়ানকে শক্তিশালী করছেন? পাহাড়ের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কি রাষ্ট্রীয় পরিভাষা উপেক্ষা করা অপরিহার্য? নাকি সাংস্কৃতিক অধিকারের আড়ালে এমন একটি রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে, যার সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে?
দীপেন দেওয়ানের কাছে এসব প্রশ্নের জবাব থাকা উচিত। কারণ, একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব কেবল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হওয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো নয়; তাঁর দায়িত্ব রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো ও নাগরিকদের মধ্যে দায়িত্বশীল অবস্থান বজায় রাখা। রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান সম্পর্কে অবগত থেকেও যদি তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্কিত পরিভাষা ব্যবহার করেন, তাহলে সেটি নিছক ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় থাকে না; তা জনপরিসরে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বিবেচিত হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।