লামার মিরিঞ্জায় পর্যটনের হাতছানি, উন্নত সড়ক ও নিরাপত্তার দাবি ট্যুরিস্ট ব্যবসায়ীদের
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বুজ অরণ্যে ঘেরা সারি সারি পাহাড়, পাহাড়ের বুকজুড়ে মেঘের ভেলা আর দিগন্তজোড়া সবুজের চাদর—প্রকৃতির এমন মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ হচ্ছেন পর্যটকেরা। ভোরের আলো ফুটতেই পাহাড়ের ঢালে জমে থাকা মেঘ ধীরে ধীরে সরে গিয়ে সূর্যের আলোয় বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। আর প্রকৃতির এই মায়াবী রূপের টানে দিন দিন পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে বান্দরবানের লামা উপজেলার মিরিঞ্জা পাহাড়ে।
গত কয়েক বছরে মিরিঞ্জাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি রিসোর্ট, কটেজ ও পর্যটনকেন্দ্র। সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, মেঘ ও পাহাড়ের নান্দনিক মেলবন্ধন এবং নিরিবিলি পরিবেশ পর্যটকদের কাছে মিরিঞ্জাকে করে তুলেছে আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য। পর্যটনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড ঘিরে স্থানীয় পরিবহন, খাবারের দোকান, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসাতেও তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা।
তবে সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের যাতায়াতের সড়কব্যবস্থা ও নিরাপত্তাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন পর্যটক, পরিবহনচালক ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, সড়ক যোগাযোগ উন্নত করার পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে মিরিঞ্জা হয়ে উঠতে পারে বান্দরবানের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য।
মিরিঞ্জাগামী গাড়িচালক মো. আব্দুল মালেক বলেন, মিরিঞ্জা যাওয়ার বিভিন্ন অংশের সড়ক দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও খানাখন্দ, কোথাও ভাঙাচোরা রাস্তা। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। এতে পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সড়কটি দ্রুত সংস্কার করা হলে পর্যটকদের যাতায়াত আরও সহজ ও নিরাপদ হবে।
ঢাকা থেকে মিরিঞ্জায় বেড়াতে আসা পর্যটক মো. করিম ও মো. ছাবের বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে লামা উপজেলার মিরিঞ্জা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তবে এখানকার যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন। সড়কের মান ভালো না হলে পরিবার নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক পর্যটকই আগ্রহ হারাতে পারেন।
তারা আরও বলেন, শুধু সড়ক যোগাযোগ নয়, পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা, নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড, জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং পর্যটন পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মিরিঞ্জা ভ্যালি রিসোর্টের ম্যানেজার মো. রাহাতুল আলম ও রয়েল হিল রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, মিরিঞ্জায় পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে শুধু রিসোর্ট ব্যবসাই নয়, আশপাশের গ্রামের মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগও বাড়বে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফলমূল, সবজি, জুমের পণ্য ও বিভিন্ন হস্তশিল্প পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তবে পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা। তাদের ভাষ্য, মিরিঞ্জায় পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাগড়াছড়ির সাজেক কিংবা বান্দরবানের নীলাচলের মতো ট্যুরিস্ট পুলিশ বা পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হলে পর্যটকদের আস্থা আরও বাড়বে। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিরিঞ্জায় পর্যটকদের আগমন আরও বাড়তে পারে।
লামা রিসোর্ট ও কটেজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সাদেকুল মাওয়া (ইরাক) বলেন, মিরিঞ্জার পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে চারপাশে দেখা যায় বিস্তীর্ণ সবুজ পাহাড় আর মেঘের খেলা। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যই হতে পারে লামার অন্যতম বড় পর্যটনসম্পদ।
তিনি বলেন, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক রিসোর্ট মালিক ও ব্যবসায়ীকে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কটেজ, রিসোর্ট কিংবা জুমঘরে রাতযাপনকারী পর্যটকদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য রেজিস্টার সংরক্ষণের বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অ্যাডভোকেট সাদেকুল মাওয়া আরও বলেন, মিরিঞ্জার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্প আরও এগিয়ে যাবে। এজন্য পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন বলেন, মিরিঞ্জায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য জমি নির্ধারণ করা হয়েছে এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মিরিঞ্জার সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের জন্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সড়ক উন্নয়নের কাজ শুরু করা হবে।
ইউএনও বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা, যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ—এই তিনটি বিষয় সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করা গেলে মিরিঞ্জার পর্যটন সম্ভাবনা আরও বিকশিত হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মিরিঞ্জার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে যে পর্যটন অর্থনীতি গড়ে উঠতে শুরু করেছে, তা পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। উন্নত সড়ক যোগাযোগ, নিরাপদ পর্যটন পরিবেশ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে মিরিঞ্জা শুধু স্থানীয় পর্যটকদের নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছেও আরও জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।