লামা-নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ, ড্রেজারের থাবায় হুমকিতে পরিবেশ ও জনপদ
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বান্দরবানের লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার ও সেলো মেশিন ব্যবহার করে বিভিন্ন ছড়া ও জলাশয় থেকে বালু উত্তোলন করছে। এতে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি, বসতবাড়ি, সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর তদারকির অভাবে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় বালু উত্তোলন দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে লাইল্যারমার পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশের খুটাখালী ছড়ায় একাধিক ড্রেজার ও সেলো মেশিন বসিয়ে দিন-রাত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লাইল্যারমার পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই পাশে খুটাখালী ছড়ায় প্রায় নয়টি সেলো ও ড্রেজার মেশিন বসানো হয়েছে। এসব মেশিনের মাধ্যমে ছড়ার তলদেশ থেকে বালু তুলে দীর্ঘ পাইপের সাহায্যে আশপাশের এলাকায় স্থানান্তর করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, কোনো কোনো স্থানে রাতদিন অবিরাম বালু উত্তোলন করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে ছড়ার তলদেশ গভীর হয়ে যাচ্ছে এবং দুই পাশের মাটি ধসে পড়ছে। এতে ছড়ার তীরবর্তী কৃষিজমি ও বসতবাড়ি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। একই সঙ্গে বালু ও কাদা পানির সঙ্গে আশপাশের কৃষিজমিতে গিয়ে জমা হওয়ায় জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশেও চলছে বালু উত্তোলন
লাইল্যারমার পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে বালু উত্তোলনে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, ড্রেজার ও সেলো মেশিনের বিকট শব্দে বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের আশপাশের মাটি ও ছড়ার পাড় ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ছড়া থেকে অতিরিক্ত বালু তুলে নেওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে পানির গতিপথ ও প্রবাহের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়বে কৃষি, বসতি ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর।
ভারী যানবাহনে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-ব্রিজ
বালু উত্তোলনের পর তা পরিবহনে ব্যবহৃত ভারী যানবাহনের কারণে স্থানীয় সড়ক ও অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অতিরিক্ত ওজনের ট্রাক চলাচলের কারণে নির্মাণাধীন ও গ্রামীণ সড়কে বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ও খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কালভার্ট ও ছোট ব্রিজও।
এতে একদিকে যেমন সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন চলাচলেও দুর্ভোগ বাড়ছে।
ইজারা ছাড়াই বালু উত্তোলনের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাইশারী ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ইজারা ছাড়াই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ফকিরাখোলা, অংসাঝিরিসহ বিভিন্ন এলাকায়ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
এ কাজে কয়েকটি স্থানীয় সিন্ডিকেট জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাগজিখোলা এলাকার মুবিনুল হক ও আজিজুল হক, ১ নম্বর ওয়ার্ডের রিয়াদসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে বালু উত্তোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ইসমাইল, শাহজাহান, মুমিন, রাসেল, আবু, আরমান, হুমায়ুন, শুক্কুর, ধলা মিয়া ও সাইফুল মিস্ত্রীসহ আরও কয়েকজনের নাম স্থানীয়দের অভিযোগে উঠে এসেছে।
তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে করা অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
জব্দ করা বালু নিলামে বিক্রি নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযানে বিভিন্ন সময় অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু জব্দ করা হলেও পরে তা নিলামে বিক্রি করা হয়। তাদের দাবি, এভাবে জব্দ করা বালু নিলামে বিক্রি করার প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, এতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীরা সামান্য জরিমানা বা নিলামের অর্থ পরিশোধের পর আবারও একই কর্মকাণ্ডে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের নিলাম আইন ও প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া প্রয়োজন।
পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পাহাড়, ছড়া ও বনভূমিবেষ্টিত লামা-নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তবর্তী এলাকার পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। অপরিকল্পিতভাবে ছড়া ও নদী থেকে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে পানিপ্রবাহ, মাটির গঠন, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাদের দাবি, শুধু বালু উত্তোলনের স্থান নয়, বালু পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহন, সংশ্লিষ্ট ড্রেজার ও সেলো মেশিন এবং উত্তোলনের বৈধতা—সবকিছু একসঙ্গে যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু বাইশারী বা লাইল্যারমার পাড়া নয়, পুরো লামা উপজেলায় প্রায় দুই শতাধিক বালু পয়েন্ট সক্রিয় রয়েছে। তবে এই সংখ্যার স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
যৌথ অভিযান ও কঠোর ব্যবস্থা দাবি
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে খুটাখালী ছড়াসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন বাইশারী ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের বাসিন্দারা। একই সঙ্গে অবৈধ ড্রেজার ও সেলো মেশিন জব্দ, বালু উত্তোলনের বৈধতা যাচাই এবং আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি কৃষিজমি, সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুল হাসান সজীবের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়রা আশা করছেন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি বালু উত্তোলনের বৈধতা, পরিবেশগত ক্ষতি এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা যাচাই করে প্রকৃত চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরা হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।