দুর্গাপূজার ছুটিতে অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের গন্তব্য হতে পারে আলীকদমের সাইংপ্রা ঝর্ণা

দুর্গাপূজার ছুটিতে অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের গন্তব্য হতে পারে আলীকদমের সাইংপ্রা ঝর্ণা

দুর্গাপূজার ছুটিতে অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের গন্তব্য হতে পারে আলীকদমের সাইংপ্রা ঝর্ণা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা, চারপাশে ঘন সবুজ বন, খাড়া পাহাড় আর বিশাল পাথরের সারি। কোথাও ঝিরির কলতান, কোথাও পাহাড়ের গভীর নীরবতা। দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে প্রকৃতির এমন মনোমুগ্ধকর রূপের দেখা মেলে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার সাইংপ্রা ঝর্ণায়। পর্যটকদের কাছে তুলনামূলক কম পরিচিত এই ঝর্ণা যেন পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক প্রাকৃতিক বিস্ময়। দুর্গাপূজার ছুটিতে প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে ভিন্ন স্বাদের ভ্রমণ ও রোমাঞ্চকর ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা নিতে চান, এমন অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য সাইংপ্রা হতে পারে ব্যতিক্রমী গন্তব্য। তবে এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে শুধু প্রকৃতিপ্রেমী হলেই চলে না; প্রয়োজন শারীরিক সক্ষমতা, যথাযথ প্রস্তুতি এবং দুর্গম পাহাড়ি পথে চলার মানসিকতা।

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার পূর্বদিকে চিম্বুক রেঞ্জের কির্সতং পাহাড়ের কাছাকাছি সাইংপ্রা ঝর্ণার অবস্থান। প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের মতো এখানে সহজে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পাহাড়ি ট্রেইল, খাড়া ঢাল ও বড় বড় পাথর পেরিয়ে যেতে হয় ঝর্ণাটির কাছে। চার থেকে পাঁচটি ধাপে নেমে আসা ঝর্ণাটির প্রতিটি স্তরেই রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়া পানির শব্দ, চারপাশের সবুজ প্রকৃতি এবং নির্জন পরিবেশ মিলে তৈরি করেছে এক ভিন্ন আবহ। নগরজীবনের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে চাওয়া ভ্রমণকারীদের কাছে এই পরিবেশ হয়ে উঠতে পারে বিশেষ আকর্ষণ।

সাইংপ্রা ঝর্ণায় যাওয়ার অন্যতম পথ হলো কির্সতং ও রংরাং পাহাড় অভিযান শেষে খেমচং পাড়া হয়ে যাওয়া। মেনিয়াংক পাড়া থেকে রংরাং ও কির্সতং পাহাড় সামিটের পরিকল্পনার সঙ্গে ঝর্ণাটিকে যুক্ত করলে ভ্রমণসূচিতে বাড়তি একটি দিন রাখা যেতে পারে। তবে পুরো পথের দুর্গমতা বিবেচনায় নিয়েই ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে হবে।

খেমচং পাড়া থেকে সাইংপ্রা ঝর্ণার ট্রেকিং শুরু হয়। প্রথমেই খাড়া পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে হয়। এরপর সামনে পড়ে বড় বড় পাথরে ভরা পিচ্ছিল ও অসমতল পথ। কোথাও পাথর আঁকড়ে এগোতে হয়, কোথাও পা ফেলার জায়গা খুঁজে নিতে হয় সতর্কভাবে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামার পর একপর্যায়ে আবার শুরু হয় ওপরে ওঠার পালা। পাথুরে পথ ধরে দীর্ঘক্ষণ এগিয়ে যাওয়ার পর দেখা মেলে সাইংপ্রা ঝর্ণার। দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য পথ পেরিয়ে চোখের সামনে ঝর্ণার জলধারা ভেসে ওঠার মুহূর্তটি অভিযাত্রীদের কাছে হয়ে উঠতে পারে বিশেষ প্রাপ্তি। ঘন বন, কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়, পাথুরে পথ ও নির্জন পাহাড়ি জনপদ মিলিয়ে পুরো যাত্রাই হয়ে ওঠে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। তবে বর্ষাকালে কিংবা বৃষ্টির পর পাথুরে পথ আরও পিচ্ছিল হয়ে ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ঢাকা থেকে সাইংপ্রা ঝর্ণায় যেতে প্রথমে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় পৌঁছাতে হবে। সরাসরি আলীকদমগামী বাস পাওয়া গেলে যাত্রা সহজ হয়। সরাসরি বাস না পেলে কক্সবাজারগামী বাসে চড়ে চকরিয়া নেমে সেখান থেকে স্থানীয় পরিবহনে আলীকদম যাওয়া যায়। আলীকদম পৌঁছে পানবাজার এলাকা থেকে স্থানীয় গাইডের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এরপর মোটরসাইকেল অথবা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত চান্দের গাড়িতে করে ১৩ কিলো এলাকায় যেতে হয়। সেখান থেকে দুসরী বাজার হয়ে ট্রেকিং করে মেনকিউ পাড়া ও মেনিয়াংক পাড়ার দিকে এগোতে হয়। ভ্রমণের আগে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত স্থানের নাম, যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং পথের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সড়ক ও পরিবহন পরিস্থিতি অনুযায়ী যাত্রার সময় ও ব্যয় পরিবর্তিত হতে পারে।

মেনিয়াংক পাড়া থেকে রংরাং ও কির্সতং পাহাড় অভিযানের পর খেমচং পাড়া হয়ে সাইংপ্রা ঝর্ণার পথে যাওয়া যায়। দুর্গম ট্রেইল এবং যাতায়াতের সময় বিবেচনায় খুব সকালে যাত্রা শুরু করা প্রয়োজন। একই দিনে ঝর্ণা দেখে নিরাপদে ফিরে আসা সম্ভব কি না, তা আবহাওয়া, দলের শারীরিক সক্ষমতা এবং স্থানীয় গাইডের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত। অন্ধকার নামার আগে নিরাপদ স্থানে ফেরার পরিকল্পনা রাখা জরুরি।

সাইংপ্রা ঝর্ণার আশপাশে পর্যটকদের জন্য প্রচলিত হোটেল বা রিসোর্টের ব্যবস্থা সীমিত। ফলে রাতযাপনের জন্য স্থানীয় পাহাড়ি পাড়ার বাসিন্দাদের সহযোগিতা নিতে হয়। মেনিয়াংক পাড়াসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় থাকার পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই পাড়ার কারবারির সঙ্গে যোগাযোগ করা ভালো। স্থানীয় মানুষের বাড়িতে অতিথি হিসেবে থাকার ব্যবস্থা হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে পাড়ার মানুষের সম্মতি, স্থানীয় রীতিনীতি ও সামাজিক শিষ্টাচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি। খাবারের ব্যবস্থাও আগে থেকে আলোচনা করে নেওয়া উচিত। এসব দুর্গম এলাকায় খাবারের দোকান ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সহজে পাওয়া যায় না। তাই প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, পর্যাপ্ত পানি এবং জরুরি সরঞ্জাম সঙ্গে রাখা প্রয়োজন।

সাইংপ্রা ঝর্ণার ট্রেকিং সহজ কোনো ভ্রমণ নয়। দীর্ঘ সময় হাঁটা, খাড়া পাহাড়ে ওঠানামা এবং পিচ্ছিল পাথুরে পথ অতিক্রম করার জন্য শারীরিক প্রস্তুতি থাকা দরকার। সঙ্গে নিতে হবে উপযুক্ত ট্রেকিং জুতা, ভালো মানের ব্যাগ, বৃষ্টির পানি থেকে জিনিসপত্র রক্ষার জন্য রেইনকভার, পানির বোতল, শুকনো খাবার, স্যালাইন, গ্লুকোজ, প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী ও হেডল্যাম্প। পাহাড়ি পথে দীর্ঘক্ষণ হাঁটার সময় শরীর থেকে প্রচুর পানি বেরিয়ে যেতে পারে। তাই পর্যাপ্ত পানীয় জল সঙ্গে রাখা জরুরি। মশা ও অন্যান্য পোকামাকড় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থাও নিতে হবে। এলাকাটি ম্যালেরিয়াপ্রবণ হওয়ায় ভ্রমণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

কির্সতং ও রংরাং অভিযানের পথে অভিজ্ঞতা না থাকলে স্থানীয় গাইডের সহায়তা নেওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পথ হারানো, পাথরে পিছলে পড়ে যাওয়া কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায় আটকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই দলের সদস্যদের সক্ষমতা অনুযায়ী পরিকল্পনা করা, স্থানীয় গাইডের নির্দেশনা মেনে চলা এবং পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে অভিযান সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। ভ্রমণের আগে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা ও এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কেও খোঁজ নেওয়া উচিত।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশের কারণে সাইংপ্রা ঝর্ণা ভবিষ্যতে অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। কির্সতং ও রংরাং পাহাড় অভিযানের সঙ্গে ঝর্ণাটি যুক্ত হলে একই ভ্রমণে পাহাড়ের চূড়া, পাথুরে ট্রেইল, ঘন বন ও জলধারার সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ তৈরি হয়। এতে আলীকদমের প্রচলিত পর্যটন আকর্ষণের বাইরেও নতুন গন্তব্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।

তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশের ওপর চাপ তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে। প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্য পাহাড়ে ফেলে রাখলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ঝর্ণার প্রাকৃতিক পরিবেশ। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও অধিকারকে সম্মান করা এবং তাদের সম্মতি ছাড়া কোনো এলাকায় প্রবেশ না করাও দায়িত্বশীল পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং নিরাপদ ভ্রমণব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সাইংপ্রা ঝর্ণার আকর্ষণ শুধু এর স্বচ্ছ জলধারায় নয়; বরং সেখানে পৌঁছানোর দুর্গম পথ, পাহাড়ের নীরবতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে যাওয়ার অভিজ্ঞতায়। যারা পাহাড়কে কাছ থেকে অনুভব করতে চান এবং প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে নতুন কোনো অভিযানের স্বাদ নিতে আগ্রহী, তাঁদের কাছে দুর্গাপূজার ছুটিতে সাইংপ্রা ঝর্ণা হতে পারে ব্যতিক্রমী এক গন্তব্য। তবে এই সৌন্দর্য উপভোগের আগে প্রয়োজন যথাযথ প্রস্তুতি, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা, নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *