নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বান্দরবানে পর্যটন বিকাশে কাজ করছে সেনাবাহিনী
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পাহাড়, ঝরনা, নদী আর সবুজের অপার সৌন্দর্যে ঘেরা পার্বত্য জেলা বান্দরবান। প্রকৃতির অপরূপ এই জেলা দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। নীলাচল, মেঘলা, নীলগিরি, চিম্বুক, বগালেক, নাফাখুম ও রেমাক্রির মতো দর্শনীয় স্থানগুলো প্রতিবছরই টানে হাজারো পর্যটককে। তবে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জ, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতার উদ্বেগ এবং দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এ খাতের বিকাশে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা।
এমন পরিস্থিতিতেও বান্দরবানের পর্যটন খাতের উন্নয়ন ও বিকাশে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পর্যটকদের নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, দুর্গম পর্যটন এলাকাগুলোতে যাতায়াতের সুযোগ সৃষ্টি এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টরা।

বান্দরবানের পর্যটনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর বৈচিত্র্য। কোথাও পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা যায় মেঘের সমুদ্র, কোথাও পাহাড়ি ঝরনার কলতান, আবার কোথাও নদী আর পাহাড়ের মিতালি। এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলো ঘিরে গড়ে উঠেছে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পরিবহনসেবা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গাড়িচালক, গাইড, নৌযানচালক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
থানচি যাওয়ার পথে ডাবল হ্যান্ড ভিউ এলাকায় ব্যবসা করেন মহিলা ব্যবসায়ী ক্যপ্রু ম্রো। তিনি বলেন, আমরা পর্যটকদের ওপর নির্ভর করে সড়কের পাশে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করি। আগে বিভিন্ন সময়ে পর্যটন নিষেধাজ্ঞা জারি হলে পরিবার চালানো অনেক কঠিন হয়ে পড়ত। তবে বর্তমানে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের উদ্যোগে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে আমাদের ব্যবসাও ভালো হচ্ছে।

হোটেল ব্যবসায়ী চ হ্লা উ মারমা বলেন, দীর্ঘদিন কেএনএফ ইস্যুর কারণে পর্যটনকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় আমরা অনেক কর্মচারী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছিলাম। অত্যন্ত কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছিল। কেএনএফের তৎপরতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা জোরদারের ফলে বর্তমানে পর্যটনকেন্দ্রগুলো খোলা রয়েছে। এতে গত কয়েক বছর ধরে থানচিতে পর্যটন ব্যবসা ভালো হচ্ছে। আমরা চাই পর্যটন কেন্দ্রে সেনাবাহিনী সব সময় নিরাপত্তা জোরদার করুক। তাহলে কোন অসাধু চক্র আর বাধাগ্রস্থ করতে পারবে না পর্যটন কেন্দ্রে নিরাপত্তা নিয়ে।
তবে জেলার অনেক পর্যটনকেন্দ্র দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। এসব এলাকায় যাতায়াতের জন্য ভালো সড়ক, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় দুর্গম এলাকাগুলোতে নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা না গেলে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন।

পর্যটন ব্যবসায়ী মো. কামাল উদ্দিন বলেন, পার্বত্য জেলা বান্দরবান কিংবা পর্যটন নগরী বান্দরবান। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, আজকের এই পর্যটনকেন্দ্রগুলো গড়ে ওঠার পেছনে অন্যতম ভূমিকা রয়েছে জেলার স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। বিশেষ করে নতুন নতুন পর্যটন গন্তব্যে যাতায়াতের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নির্মিত সড়কগুলো এখন দৃশ্যমান সুফল বয়ে আনছে।
পর্যটকবাহী গাড়িচালক উশৈসিং বলেন,বান্দরবানের রুমা, থানচি, বগালেক, সুংসুংপাড়া, কেউক্রাডং ও তমাতঙ্গীসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা জোরদার এবং সড়ক নির্মাণের ফলে এখন দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসা সম্ভব হচ্ছে। একসময় যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বগালেক, কেউক্রাডং, সুংসুংপাড়া কিংবা তমাতঙ্গী ভ্রমণ অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। সেই কঠিন পথকে সহজ করে বাস্তবে রূপ দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বর্তমানে নিরাপদ পরিবেশ থাকায় আমরাও পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারছি।

এদিকে, পার্বত্য অঞ্চলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নানামুখী তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে পর্যটন খাতও বিভিন্ন সময়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে কোনো কোনো এলাকায় পর্যটকদের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়। এতে পর্যটন ব্যবসার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হন এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত স্থানীয় মানুষ।
এ অবস্থায় পর্যটন বিকাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ও পর্যটনবান্ধব কার্যক্রম এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পর্যটনের টেকসই বিকাশে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগও প্রয়োজন।

পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, বান্দরবানের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু নতুন পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুললেই হবে না; প্রয়োজন নিরাপদ যাতায়াত, পর্যাপ্ত আবাসন, প্রশিক্ষিত পর্যটক গাইড, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং আধুনিক পর্যটনসেবা। পাশাপাশি পাহাড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন হলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে, ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটবে এবং পাহাড়ি জনপদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে এ উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পর্যটনের সুফল আরও বিস্তৃত হবে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ও সম্ভাবনাকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বহুমুখী ভূমিকা পালন করে আসছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে সীমান্ত সড়কসহ বিভিন্ন সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ, পর্যটনকেন্দ্রিক রিসোর্ট ও অবকাশযাপন সুবিধা গড়ে তোলা, পর্যটন স্পটগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পর্যটকদের যাতায়াতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে এ অঞ্চলের পর্যটন বিকাশে অবদান রাখছে সেনাবাহিনী। পাশাপাশি দুর্গম ও সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকাগুলোতে যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এসব উদ্যোগ পার্বত্য অঞ্চলে পর্যটনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, স্থানীয় অর্থনীতির প্রসার এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হচ্ছে।
উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের সমন্বয় ঘটাতে পারলে বান্দরবান হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল। আর সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নে সেনাবাহিনী, প্রশাসন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত উদ্যোগই হতে পারে এগিয়ে যাওয়ার পথ।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।