জান্তা সরকারের দেয়া পরিচয়পত্র প্রত্যাখ্যান থাইল্যান্ডে অবস্থানরত ২০ লাখ মিয়ানমার শ্রমিকের
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
থাইল্যান্ডে অবস্থানরত মিয়ানমারের ২০ লাখের বেশি অভিবাসী শ্রমিক জান্তা সরকারের নতুন পরিচয়পত্র গ্রহণের প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁরা সমান্তরাল সরকার হিসেবে পরিচিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের (এনইউজি) মাধ্যমে পরিচয়পত্র ইস্যুর দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে পরিচালিত একটি অনলাইন জরিপে অংশ নিয়ে তাঁরা এনইউজিকে নিজেদের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও থাই সরকারের কাছে তুলে ধরতে চান।
থাইল্যান্ডে বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে আনুমানিক ৪০ লাখ মিয়ানমারের শ্রমিক বসবাস করেন। অভিবাসী শ্রমিকদের সংগঠনগুলোর হিসাবে, চলতি দফায় তাঁদের মধ্যে অন্তত ৬ লাখ শ্রমিককে জান্তা সরকারের নতুন পরিচয়পত্র ‘সার্টিফিকেট অব আইডেন্টিটি’ (সিআই) গ্রহণের জন্য আবেদন করতে হবে। তবে নতুন কর ও রেমিট্যান্স-সংক্রান্ত নিয়মকে চাঁদাবাজির মতো বলে সমালোচনা করে অধিকাংশ শ্রমিকই জান্তা সরকারের সদ্য চালু করা সিআই কেন্দ্রগুলো এড়িয়ে চলছেন।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পরিচয়পত্রের জন্য আবেদন করতে হলে শ্রমিকদের প্রমাণ দিতে হবে যে তাঁরা নিজেদের বেতনের ২৫ শতাংশ জান্তা সরকারের নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে দেশে পাঠিয়েছেন এবং বার্ষিক আয়ের ২ শতাংশ কর পরিশোধ করেছেন। শ্রমিকদের বড় অংশই এ শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এ অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে জান্তা সরকারের যুদ্ধ পরিচালনায় অর্থায়ন হবে এবং একই সঙ্গে সামরিক শাসনকে রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়া হবে।
এদিকে থাইল্যান্ডের বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা ও শ্রম অধিকার সংগঠনগুলো দেশটির সরকারকে সিআই কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা অথবা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, এসব কেন্দ্রের কার্যক্রম থাইল্যান্ডের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে।
জান্তা সরকারের পরিচয়পত্র গ্রহণে শ্রমিকদের ব্যাপক অনাগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে থাইল্যান্ডে মিয়ানমার অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতিনিধি সমন্বয় কমিটি (এমএমডব্লিউআরসিসিটি) আয়োজিত এক সপ্তাহব্যাপী অনলাইন জরিপে। রোববার শুরু হওয়া এ জরিপে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের বড় অংশ জান্তা সরকারের সিআই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছেন। অনেকেই সিআই ছাড়াই তাঁদের কাজের অনুমতি ও বসবাসের বৈধ কাগজপত্র দেওয়ার জন্য থাই কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এমএমডব্লিউআরসিসিটির খিন সোয়ে সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতীকে বলেন, জরিপের ফলাফল অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য এনইউজির ব্যবস্থাপনায় বিকল্প পরিচয়পত্র প্রক্রিয়া চালুর প্রতি ব্যাপক সমর্থনের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, “জান্তা সরকারের সিআই প্রক্রিয়া বৈদেশিক মুদ্রা আদায় এবং সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের জন্য তথ্য সংগ্রহের একটি ফাঁদ। শ্রমিকেরা বিষয়টি জানেন, তাই তাঁরা আবেদন করতে চান না।”
খিন সোয়ে জানান, শ্রমিকদের পরিচয়পত্র ইস্যুর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য জরিপের ফলাফল এনইউজির শ্রম বিভাগে পাঠানো হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের পক্ষ থেকে পরিচালিত পৃথক একটি অনলাইন আবেদনের ফলাফল থাই সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, “থাই সরকার যুক্তি দিতে পারে যে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিআই প্রক্রিয়ায় জান্তা সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের কাছে আবেদন জানাচ্ছি। পরিচয়পত্র ইস্যুর জন্য যদি বিকল্প কোনো কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন হয়, তাহলে এই জরিপের ফলাফল দেখাচ্ছে যে লাখ লাখ শ্রমিক এনইউজির মাধ্যমে তা চান। থাইল্যান্ডের আইনের অধীনে বসবাসকারী অতিথি হিসেবে আমরা কোনো দাবি চাপিয়ে দিচ্ছি না; বরং সম্মানের সঙ্গে একটি অনুরোধ হিসেবে এই ফলাফল উপস্থাপন করছি।”
গত ১৮ অক্টোবর শুরু হওয়া এই প্রচারাভিযান ও অনলাইন আবেদনে চারটি দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সিআই ছাড়াই থাইল্যান্ডে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার অধিকার অন্যতম। থাইল্যান্ডের শ্রম অধিকার সংগঠন ও রাজনীতিকদেরও সমর্থন পেয়েছে এ উদ্যোগ।
সমর্থনকারীদের মধ্যে রয়েছেন দেশটির বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সংসদ সদস্য আনুসন তামাজাই। তিনি সিআই কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা অথবা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যথাযথ তদারকি ছাড়া এসব কেন্দ্র পরিচালিত হলে তা থাইল্যান্ডের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।
থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে অভিবাসী শ্রমিকদের অপরিহার্য ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, পরিচয়পত্র দেওয়ার বিনিময়ে রেমিট্যান্স পাঠানো ও কর পরিশোধ বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি থাই আইনের লঙ্ঘন কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি ‘থাইল্যান্ড মাইগ্রেশন রিফর্ম’ নামের একটি সংগঠন সতর্ক করে বলেছে, অভিবাসী শ্রমিকদের নিবন্ধন কার্যক্রম নেপিদোর নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া হলে তা থাইল্যান্ডের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করবে এবং দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে। সংগঠনটি অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য আগের ‘পিংক কার্ড’ পদ্ধতি পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছে।
শুক্রবার বিদেশি শ্রমিক ব্যবস্থাপনা নীতিবিষয়ক কমিটির বৈঠক শেষে থাইল্যান্ডের শ্রমমন্ত্রী জুলাপুন অমরনভিভাত সাংবাদিকদের বলেন, অভিবাসী শ্রমিকদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য তাঁদের নিজ নিজ দেশের সরকার সিআই চেয়ে থাকে। তবে এ পরিচয়পত্র দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া থাইল্যান্ডের ভূখণ্ডের মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি জানান, বাধ্যতামূলক রেমিট্যান্স পাঠানোর নীতির বিরোধিতা করে তাঁর মন্ত্রণালয় জান্তা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠাবে। তাঁর মতে, এ নীতি অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে, শ্রমিকদের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে আর্থিক সংকটে থাকা জান্তা সরকার বিদেশে কর্মরত স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আদায়ের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করেছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া শ্রমমন্ত্রী মং মিন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কর ও রেমিট্যান্স পাঠানোর শর্ত পূরণ না করলে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাঁদের দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে।
তবে জান্তা সরকারের এমন হুমকিতেও শ্রমিকদের বয়কট কর্মসূচি দুর্বল হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গত ১৪ অক্টোবর থাইল্যান্ডের পাঁচটি স্থানে সিআই কেন্দ্র চালু হওয়ার পর থেকে সেখানে আবেদনকারীর সংখ্যা খুবই কম বলে জানা গেছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।