ইউপিডিএফ নেতা উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমার স্ত্রী থাকেন ভারতে, বেতন নেন বাংলাদেশ থেকে!

ইউপিডিএফ নেতা উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমার স্ত্রী থাকেন ভারতে, বেতন নেন বাংলাদেশ থেকে!

“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

মোঃ সাইফুল ইসলাম

উঁচু-নিচু অজস্র ঢেউ খেলানো পাহাড়, আর সাদা মেঘের অপূর্ব মিতালির অপরূপ সৌন্দর্যভূমি খাগড়াছড়ি। যদিও সীমান্তবর্তী প্রান্তের এ জেলায় দীর্ঘকাল তেমন সুদৃষ্টি না থাকায় পিছিয়ে থাকতে হয় পাহাড়ি জনপদকে। তবে এখন অতীত সেই সব দিন। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে এখন বদলের ছোঁয়া, সীমাহীন সম্ভাবনা। গত প্রায় দেড় দশকে নানামুখী পরিকল্পনার ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান এক সময়ের অবহেলিত জনপদে। পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়িতে বর্তমান সরকারের গত প্রায় ১৪ বছরে লেগেছে দিন বদলের হাওয়া। শিক্ষা, সংস্কৃতি, সড়ক, বিদ্যুৎসহ অবকাঠামো খাতে সাধিত হয়েছে ব্যাপক উন্নয়ন। উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সমতলের চেয়ে কোন অংশেই এখন আর পিছিয়ে নেই এক সময়ের পিছিয়ে পড়া জনপদ হিসেবে খ্যাত এই খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা। এক সময় যা ছিল পিছিয়ে পড়া জনপদ, সেই পাহাড়ি এলাকা এখন এগিয়ে চলার বড় উদাহরণ। অন্যান্য সব সেক্টরের মতো পাহাড়ে গত ২ দশকে শিক্ষা বান্ধব কর্মসূচীর আওতায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। প্রায় প্রতিবছরই জেলা পরিষদের মাধ্যমে শূন্য পদের বিপরীতে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। এছাড়া দুর্গমতা ভেদ করে উন্নয়নের স্রোত লেগেছে প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। বেসরকারী আর অবহেলিত প্রায় সব বিদ্যালয়ই জাতীয়করণ করা হয়েছে। কাঁচা মাটির মেঝে আর টিন-বেড়ার ঘরের পরিবর্তে সু-উচ্চ ইট পাথরের দালানে রুপান্তর হয়েছে বিদ্যালয়গুলো। বৈদ্যুতিক সুবিধাসহ শতভাগ বিনামূল্যে বই দেয়ার মাধ্যমে এ জনপদে শতভাগ শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে রয়েছে নানা পরিকল্পনা। পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে এগিয়ে চলছে এসব কর্মপরিকল্পনা। বেড়েছে বিদ্যালয় আর শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। এ জেলার শিক্ষাখাতে সরকারের এতসব কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হলেও অতিদুর্গমতা ও সীমান্তবর্তী বেশ কিছু এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের এসব অনিয়মের কারণে রয়েছে শিক্ষার হার কমে যাওয়ার শঙ্কা, সরকারের শিক্ষা মহাপরিকল্পনায়ও পড়তে পারে এর প্রভাব।

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে বর্তমানে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা পৌঁছেছে ৫৯৩টিতে। আর বর্তমানে এ জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮৯ হাজার ১২০ জন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির হার প্রায় শতভাগ। শতভাগ প্রাথমিকের শিক্ষার্থীই এসেছে উপকৃত্তির আওতায়। পড়ালেখার পাশাপাশি খেলা-ধুলা ও বিনোদনের জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিজস্ব মাঠ, খেলাধুলার সরঞ্জামসহ সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে কমেছে এ জেলায় প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, বর্তমানে পুরো জেলা জুড়ে ৫৯৩ টি (পিটিআই ভুক্ত ১টি ছাড়া) সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৫৯৩ জন প্রধান শিক্ষক ও ৩ হাজার ১৬ জন সহকারী শিক্ষকের অনুমোদন থাকলেও প্রায় ২শতাধিক প্রধান শিক্ষক ও ৪ শতাধিক সহকারী শিক্ষকের পদ শূণ্য রয়েছে। এসব শূন্য পদে প্রতিবছরই জেলা পরিষদের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সরকারী বিধি অনুযায়ী প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকসহ ৫জন করে শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও জেলা সদরসহ উপজেলাগুলোতে মানা হচ্ছেনা এসব নিয়ম। দুর্গমতার দোহাই ও এ এলাকার আঞ্চলিক বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব খাটিয়ে দিনের পর দিন নিয়োগপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ে পাঠদান না করে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর জালিয়াতি করে বেতর-ভাতা উত্তোলনের ঘটনা ঘটছে। এছাড়া উপজেলা শিক্ষা অফিস কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ে যোগদান না করে নিজ এলাকা ও বাড়ির পাশের বিদ্যালয়ে সংযুক্ত থেকেও বছরের পর বছর চাকুরি করে চলেছেন এসব শিক্ষকরা। ফলে শিক্ষক নিয়োগপ্রাপ্ত বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ছাড়াই কোন মতে চলছে পাঠদান, অন্যান্য শিক্ষকরাও অতিরিক্ত শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শারিরীক ও মানসিক ভাবে। এতে করে শিক্ষার হার যেমন কমতে পারে, তেমনি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ে হারও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, খাগড়াছড়িতে ৫৯৩ টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে জেলার সদর উপজেলায় ৮০টি, দীঘিনালায় ১১২টি, পানছড়িতে ৭৯টি, লক্ষ্মীছড়িতে ৪০টি, মাটিরাঙ্গায় ৯০টি, গুইমারায় ৩৭টি, রামগড়ে ৪৭টি, মানিকছড়িতে ৪৭টি ও মহালছড়িতে ৬২টি রয়েছে। প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, জেলা সদরের প্রায় সবগুলো বিদ্যালয়ই পৌরসভা প্রধান সড়ক সংলগ্ন এবং সদর উপজেলায় হওয়ায় মহালছড়ি, পানছড়ি ও দীঘিনালার জেলা সদর সীমান্তবর্তী এলাকার শিক্ষকদের প্রথম পছন্দ জেলা সদর। জানা যায়, দীঘিনালার ১১২টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৫০টি বিদ্যালয়ই দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত। পানছড়ির ৭৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৪০টি বিদ্যালয়ই দুর্গম ও ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত হওয়ায়। লক্ষ্মীছড়ির ৪০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৩০টি বিদ্যালয়ই অতি দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। মাটিরাঙ্গার ৯০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় অধিকাংশই দুর্গম এলাকায় অবস্থিত এবং প্রায় ৩৫টি বিদ্যালয় ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। গুইমারার ৩৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ১৫টি বিদ্যালয়ই দুর্গম এলাকায়। রামগড়ের ৪৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ২০টি বিদ্যালয়ই দুর্গম ও কিছু বিদ্যালয় ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। একই চিত্র মানিকছড়ি ও মহালছড়িরও।

সূত্র বলছে, ৫৯৩ টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শুন্যপদ ব্যতিত প্রায় তিন হাজার প্রধান ও সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার মধ্যে অন্তত দেড় হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা নিজেদের নিয়োগপ্রাপ্ত বিদ্যালয় ছেড়ে জেলা শহর বা উপজেলা শহরের নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে ডেপুটিশনে সংযুক্ত রয়েছেন। এদের অনেকেই স্বামীর বাড়ি বা স্ত্রীর বাড়ির সুবাধে কিংবা নিজের এলাকার সুবাদেও সংযুক্ত থেকে বছরের পর বছর দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলোকে রেখেছেন শিক্ষক সংকটে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পানছড়ির দুর্গম এলাকায় অবস্থিত একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা জানান, অনেক পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ায় দুজনেই এক বিদ্যালয়ে চাকরি করতে পারলে নিজেদের সুবিধা হয়, এমন কারণ দেখিয়ে বছরের পর বছর দুৃজনের যেকোন একজন নিজ নিয়োগপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ে পাঠদান না করে স্বামী বা স্ত্রীর চাকরিস্থল বিদ্যালয়ে সংযুক্ত থেকে চাকরি করে চলেছেন। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, চাঁদনি সাওতাল নামের এক সহকারী শিক্ষক পানছড়ির গোলক প্রতিমাছড়ামূখ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও তিনি বহুদিন যাবৎ চাকরি করছেন খাগড়াছড়ি জেলা সদরের একটি বিদ্যালয়ে। অভিযোগ করে তিনি আরো বলেন, বদলী হয়ে নয় বরং উর্ধতন কর্মকর্তাদের টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে পানছড়ির ওই বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় জাল স্বাক্ষর করে সেখান থেকে বেতন নিয়ে তিনি জেলা সদরে ডেপুটিশনে চাকরি করছেন অন্য একটি বিদ্যালয়ে।

তিনি জানান, সহজে শিক্ষা কর্মকর্তার অফিসে গিয়ে কিছু টাকা-পয়সা খরচ করলে ডেপুটিশনে পছন্দের কিংবা নিজ এলাকার বিদ্যালয়ে পাঠদান করার সুযোগ রয়েছে। তবে এতে করে নিয়োগপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকদের নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বাকিদের মিলে ডেপুটিশনে যাওয়া ওই শিক্ষকের শ্রেনী কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। এ বিষয়গুলো নিয়ে অন্যান্য শিক্ষকদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। তবে চাকুরি হারানোর ভয়ে এসব বিষয় নিয়ে কেউই মুখ খুলতে চান না।

দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বেশীর ভা্গই এসব ডেপুটিশনে অন্য বিদ্যালয়ে চলে যাওয়ায় এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কমতে থাকে দিন দিন। যেসব শিক্ষকরা নিজ বিদ্যালয় ছেড়ে ডেপুটিশনে যান না, তারা বছরের পর বছর ওই দুর্গম এলাকায়ই শিক্ষকতা করে যান। আর ডেপুটিশনে যাওয়া শিক্ষকরা নিজ এলাকা বা সদরের বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান করে নানা সুযো-সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ এই শিক্ষিকার।

খাগড়াছড়ির পানছড়িতে একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা ভারতে বসবাস করে বছরের পর বছর বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও সরকারী বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন নিয়মিত, এমন সংবাদের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে নামে সাউথ ইস্ট এশিয়া জার্নাল। অনুসন্ধানে উঠে আসে, পাহাড়ের শিক্ষা খাতে সরকারের বহুমূখী পরিকল্পনা কিভাবে নস্যাৎ করছেন কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ।

বিস্তারিত অনুসন্ধানে উঠে আসে, পানছড়ি উপজেলার ১নং লোগাং ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের রামতনু পাড়া (১৫০০) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। উপজেলা শহর হতে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত এই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে ১ম-৫ম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা অর্ধশত। প্রধান শিক্ষকসহ মোট শিক্ষকের পদ ৫টি। তবে এর বিপরীতে প্রধান শিক্ষকের শূণ্য পদে দীর্ঘদিন ধরে জেলা সদরের এক সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বিদ্যালয়টি। সহকারী শিক্ষকেরও রয়েছে শূণ্যতা। এর মাঝেই এক মহিলা সহকারী শিক্ষক আবার বছরের পর বছর বিদ্যালয়ে পাঠদান না করেই তুলে নিচ্ছেন বেতন-ভাতা, নিচ্ছেন অন্যান্য সরকারী সুযোগ-সুবিধাও। অভিযোগ রয়েছে পাশ্ববর্তী ভারতের আগরতলায় বসবাস করে, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকে এভাবে বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন দীর্ঘদিন। পাহাড়ের আঞ্চলিক একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনের সামরিক শাখা প্রধানের স্ত্রী হওয়ায় ভয়ে অন্যান্য সহকারী শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের হাজিরাও তুলে দেন নিয়মিত।

অনুসন্ধান বলছে, এটি শুধুমাত্র পানছড়ি উপজেলার ১নং লোগাং ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের রামতনু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রই নয়। পাহাড়ের প্রায় সবকটি উপজেলার চিত্রও একই। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর শিক্ষকতা না করেও এসব শিক্ষক-শিক্ষিকারা বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন সরকারী কোষাগার থেকে। দুর্গমতার দোহাই দিয়ে তদারকি না করেই যেন পার পেয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তা-ব্যক্তিরাও।

জানা যায়, খাগড়াছড়ি জেলা সদরের পেরাছড়া এলাকার বাসিন্দা ঊষা চাকমা (৪০), পিতা- চিরঞ্জিত চাকমা, খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের অধীনে পরিচালিত শিক্ষা বিভাগের অধীনে ২০০৮ সালে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে চাকুরি শুরু করেন (নিয়োগপত্র নং- ১৭৫/৫৪ তারিখ- ৩১/০৭/২০০৮)। শুরুতে জেলা সদরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করলেও পরবর্তীতে তাকে স্থায়ী ভাবে জেলা সদরের গাছবান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। বেশ কিছুদিন সেখানে শিক্ষকতা করলেও ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি বিভিন্ন ভাবে তদবির চালিয়ে পানছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা ১নং লোগাং ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের রামতনু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত হয়ে আসেন।

সূত্র আরো জানায়, অভিযুক্ত ঊষা চাকমা (৪০) প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন পাহাড়ের চুক্তিবিরোধী আঞ্চলিক উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় নেতা ও সামরিক শাখার প্রধান উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমার স্ত্রী। আগে থেকেই অবৈধ ভাবে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল উজ্জ্বল-ঊষা দম্পতির। ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর সেনাবাহিনী ও খাগড়াছড়ি সদর থানা পুলিশের অভিযানে পেরাছড়ার একটি বাড়ি থেকে বিপুল পরিমান অবৈধ সামরিক সরঞ্জাম, অস্ত্র ও নগদ টাকাসহ উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা ও তার তিন সহযোগীকে আটক করা হয়। এরপর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জামিনে মুক্তির পর উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে অবৈধ পথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলায় স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। মুলত, এর সুবাধেই সীমান্ত সংলগ্ন রামতনু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত হয়ে যান ঊষা চাকমা। তবে এ নিয়েও রয়েছে নানা কথা। অভিযোগ রয়েছে, জেলা শিক্ষা অফিসের কতিপয় কর্মকর্তাকে ইউপিডিএফ কর্তৃক ফোনে হুমকি দিয়েই ঊষা চাকমাকে রামতনু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এরপর থেকে তিনি কখনোই নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতেন না। মাঝে-মাঝে বিদ্যালয়ে আসতেন, আবার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যেতেন। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সরকারী ঘোষনা অনুযায়ী মহামারীর কারনে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত রামতনু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও শ্রেণী কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২০ সালে ফের শ্রেণী কার্যক্রম শুরু হলেও গত কয়েক বছরে আর কখনোই বিদ্যালয়ের পাঠদানে সক্রিয় ভাবে অংশ নেন নি ঊষা চাকমা। দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থাকলেও নিয়মিত হাজিরা খাতায় তার নামের অংশে স্বাক্ষর করে রেখেছেন অন্যান্য শিক্ষকরা। বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় দেখা যায়, সরকারী ছুটি ব্যতিত প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ ঊষা চাকমা নামে স্বাক্ষর করে নিয়মিত বিদ্যালয়ে হাজির দেখিয়েছেন তাকে। ঊষা চাকমার নামে সেনালী ব্যাংক, খাগড়াছড়ি শাখার হিসাব নম্বর ৭৫১ (জিপিএফ নংঃ- ১৬৩) এ নিয়মিত মাস শেষে জমা হচ্ছে সরকারী বেতনের টাকাও।

তবে যার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ সেই ঊষা চাকমা জানান, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে একটি মহল। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করে সফল হয় নি। নতুন করে তারা আবার সেই পুরনো ষড়যন্ত্র করছে।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে সংরক্ষিত মে, জুন ও জুলাই-২০২৩ মাসের উক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাসিক কার্যবিবরণী ও দৈনিক উপস্থিতির তালিকায়ও উক্ত শিক্ষিকা ছুটির দিন ব্যতীত নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন দেখানো হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রামতনু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক (যিনি বর্তমানে জেলা সদরে একটি বিদ্যালয়ে কর্মরত) তন্তু চাকমা জানান, উক্ত শিক্ষিকা ইউপিডিএফ (প্রসীত) দলের কেন্দ্রীয় নেতার স্ত্রী। তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না। যদিও কোন সময় আসেন, হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যান। তিনি করোনা মহামারীর পর হতে এ পর্যন্ত বিদ্যালয়ে কয়েকবার এসছিলেন বলেও জানান তিনি। তবে হাজিরা খাতায় নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত দেখানোর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, স্থানীয় আঞ্চলিক দলের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সুপারিশ ছিল বিধায় তাকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে হাজির দেখানো হয়েছিল।

সেসময়কার পানছড়ি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সুজিত মিত্র চাকমা ঊষা চাকমা বিষয়ে কোন সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, করোনা মহামারীর পরে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললেও (ছুটি বতিত) সকল শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকে ক্লাস নেওয়ার কথা। উক্ত শিক্ষিকা বর্তমানে কোন ছুটিতে নেই। সে হিসেবে উনার বর্তমানে বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকার কথা। তিনি বলেন, উক্ত বিদ্যালয়টি দুর্গম এলাকায় হওয়ায় সেখানে মোটরসাইকেল ব্যতীত অন্য কোন যানবাহন চলাচল করে না। যার কারণে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস কর্তৃক নিয়মিত ভাবে বিষয়গুলো মনিটরিং করা সম্ভব হয়ে উঠে না। তবে উক্ত শিক্ষিকা সম্পর্কে তারা খোঁজ-খবর নিবেন বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

সূত্র বলছে, উক্ত বিদ্যালয়টি ইউপিডিএফ (প্রসীত) অধ্যুষিত এবং দুর্গম এলাকা হওয়ায় প্রশাসন এবং শিক্ষা অফিস কর্তৃক নিয়মিত মনিটরিং করা হয় না। বর্তমানে উক্ত বিদ্যালয়ে ১ম-৫ম শ্রেণী পর্যন্ত মাত্র অর্ধশত শিক্ষার্থী অধ্যায়নরত রয়েছে। এসব বিষয়ে জানতে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি মেরিন চাকমার সাথে একাধিক মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।

এমতাবস্থায় সীমান্তবর্তী এসব উপজেলা সমূহের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের চাকুরি নিয়ে শ্রেণী কার্যক্রমে অংশ না নেয়ার অভিযোগ উঠছে অহরহ। এমনকি আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর নেতা-কর্মীদের আত্নীয়-স্বজনরা সহকারী শিক্ষকের পদে চাকুরি নিয়ে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিস কর্তৃক নিয়োগকৃত বিদ্যালয়ে যোগদান না করে শিক্ষা অফিসকে ভয়-ভীতি ও জিম্মি করে নিজেদের সুবিধামতো বিদ্যালয়গুলোতে ডেপুটিশনে সংযুক্ত হবার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। এছাড়া আঞ্চলিক দলের প্রভাব খাটিয়ে অনেকেই বিদ্যালয়ে পাঠদান না করেও ভুয়া স্বাক্ষর দেখিয়ে নিয়মিত তুলে নিচ্ছেন বেতন-ভাতা।

সচেতন মহল বলছেন, এমনিতেই পাহাড়ে দুর্গমতা ও নানা পারিপাশ্বিক অবস্থার কারণে বিদ্যালয়গুলোতে যেতে অনীহা রয়েছে শিক্ষার্থীদের। যার কারণে শিক্ষার দিক দিয়ে অন্যান্য এলাকার চাইতে পিছিয়ে পাহাড়ের উপজাতি সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি আঞ্চলিক উপজাতি সংগঠনের প্রভাব দেখিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের এহেন অনুপস্থিতি বিদ্যমান থাকলে পাহাড়ের উপজাতি সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে শিক্ষার আলো থেকে আরো দূরে সরে যাবে। এছাড়া, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকে স্বাক্ষর জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বেতন-ভাতা তুলে নেয়ার ঘটনাগুলোও বিরূপ প্রভাব ফেলবে অন্যান্য সাধারণ শিক্ষকদের মাঝে। আর এতে করে সরকারের একটি মহৎ কর্মপরিকল্পনা অসম্পূর্নই থেকে যাবে এ অঞ্চলে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

You may have missed